Image description

পুরান ঢাকায় প্রকাশ্যে ভাঙারিব্যবসায়ী লাল চাঁদ ওরফে সোহাগকে (৩৯) নৃশংসভাবে হত্যার এক বছর পূর্ণ হলো আজ। আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের পর জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তারসহ মামলার বিচার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এক বছরেও বিচার হয়নি।

মামলার সব আসামি এখনো গ্রেপ্তার হয়নি। কেউ কেউ প্রকাশ্যে ঘুরে বেরাচ্ছেন। নতুন করে অপরাধেও জড়াচ্ছেন। লাল চাঁদের পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ানো আসামিরা তাঁদের হত্যার হুমকি দিচ্ছেন। তাঁরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।

গত বছরের ৯ জুলাই পুরান ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (মিটফোর্ড হাসপাতাল) সামনের ব্যস্ত সড়কে লাল চাঁদকে হত্যা করা হয়েছিল। হাসপাতালের কাছের রজনী বোস লেনে ভাঙারির ব্যবসা করতেন তিনি।

পিটিয়ে, ইট-পাথরের খণ্ড দিয়ে আঘাত করে লাল চাঁদের মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন অংশ থেঁতলে দেওয়া হয়। একপর্যায়ে তাঁকে বিবস্ত্র করা হয়। তাঁর শরীরের ওপর উঠে হত্যাকারীদের লাফাতে দেখা যায় সিসিটিভি (ক্লোজড সার্কিট) ক্যামেরার ফুটেজে।

এই হত্যাকাণ্ড সেসময় দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এই হত্যার ভিডিও ঘিরে চাঁদাবাজিসহ পুরান ঢাকার অপরাধচক্র নিয়ে নতুন করে আলোচনা সামনে এসেছিল।

নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের পরদিন গত বছরের ১০ জুলাই নিহতের বড় বোন মঞ্জুয়ারা বেগম রাজধানীর কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন। মামলায় ১৯ জনকে আসামি করা হয়।

অভিযোগপত্র

প্রায় ছয় মাস তদন্ত শেষে গত বছরের ৮ ডিসেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন কোতোয়ালি থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান। অভিযোগপত্র পর্যালোচনা করে তাতে বানান ভুলসহ কিছু ত্রুটি–বিচ্যুতি সংশোধনের নির্দেশ দেন আদালত। এরই মধ্যে তদন্ত কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান শাহবাগ থানায় বদলি হয়ে যান।

এরপর মামলাটির দায়িত্ব পান কোতোয়ালি থানার নতুন ওসি শাহ মো. ফয়সাল আহমেদ। আদালতের নির্দেশের পাঁচ মাস পর ত্রুটি–বিচ্যুতি সংশোধন করে গত জুন মাসে আবার অভিযোগপত্র জমা দেয় পুলিশ।

মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী জিয়াউল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘সংশোধিত অভিযোপত্রটি গ্রহণ করেছেন আদালত। মামলাটি সিএমএম কোর্ট থেকে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে বদলি করা হয়েছে। শুনানির জন্য নতুন তারিখও নির্ধারণ করে দিয়েছেন আদালত।’

লাল চাঁদের পরিবারের অভিযোগ, সংশোধিত অভিযোগপত্রে এক আসামির বাবার নাম পরিবর্তন করা হয়েছে।

আট আসামি পলাতক

হত্যার সঙ্গে প্রত্যক্ষ–পরোক্ষভাবে জড়িত থাকার অভিযোগে মোট ২১ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছেন মামলার বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা শাহ মো. ফয়সাল আহমেদ। আর ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততা না থাকায় ১০ আসামিকে মামলা থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে অভিযোগপত্রে।

অভিযোগপত্রভুক্ত আসামিরা হলেন—মাহমুদ হাসান মহিন, সারোয়ার হোসেন টিটু, মঙ্গল মিয়া ওরফে মনির হোসেন, আলমগীর, মনির ওরফে লম্বা মনির, নান্নু ওরফে নান্নু কাজী, সজিব ওরফে সজিব ব্যাপারী, তারেক রহমান, টিটন গাজী, অপু দাস, রিজওয়ান উদ্দিন ওরফে অভিজিৎ বসু ওরফে অভি, জহিরুল ইসলাম, পারভেজ, সাগর, রুমান ব্যাপারী, আবির হোসেন, জহির ওরফে জলিল, ইমরান, শারাফাত ওরফে শফিউল ইসলাম, হোসেন চৌকিদার ও জিয়াউদ্দিন রাজিব।

অভিযোগপত্রভুক্ত ২১ আসামির মধ্যে ১৩ জন গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন। আটজন পলাতক। পলাতক আসামিরা হলেন—সারোয়ার, জহির, ইমরান, শারাফাত, জিয়াউদ্দিন, হোসেন চৌকিদার, মনির ও অপু।

ভাঙারির ব্যবসা নিয়ন্ত্রণসহ এলাকার আধিপত্য বিস্তার নিয়ে আসামি মাহমুদ হাসান ও সরোয়ার হোসেনের সঙ্গে বিরোধের কারণেই লাল চাঁদকে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছে পুলিশ।

আসামির বাবার নাম পরিবর্তনের অভিযোগ

নিহত লাল চাঁদের পরিবারের ভাষ্য, অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার আগে গত ৮ ডিসেম্বর তা তাদের দেখায় পুলিশ। সেখানে আসামি ইমরানের বাবার নাম আব্দুল আজিজ দেখতে পায় তারা। কিন্তু আদালতে জমা দেওয়া অভিযোগপত্রে দেখা যায়, ইমরানের বাবার নাম পরিবর্তন করে নিজাম মাদবর করা হয়েছে। অথচ, তাঁর বাবার নাম আগেরটাই ঠিক।

পুলিশের তালিকায় ইমরান পলাতক। নিহত লাল চাঁদের পরিবারের অভিযোগ, অভিযোগপত্রে বাবার নাম পরিবর্তনের পর ইমরান আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। তিনি পুরান ঢাকায় ‘ইমরান মেটাল’ নামে ভাঙারির দোকান পরিচালনা করছেন। আর লাল চাঁদের রেখে যাওয়া দোকানটি তাঁর পরিবারের অন্য সদস্যরা দেখভাল করছেন। ইমরান বিভিন্ন মাধ্যমে তাঁদের দোকান বন্ধ রাখতে হুমকি-ধামকি দিচ্ছেন।

হত্যায় ইমরানের সম্পৃক্ততার বিষয়ে অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, তিনি অন্য আসামিদের সঙ্গে মারধরে অংশ নিয়ে লাল চাঁদের মৃত্যু নিশ্চিত করেছেন। পরে তাঁর পা টেনেহিঁচড়ে হাসপাতালের ফটকের সামনে নিয়ে আসেন। বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে পৈশাচিক উল্লাস করেন।

লাল চাঁদের পরিবারের পক্ষে মামলাটি চালাচ্ছেন বাদী মঞ্জুয়ারা বেগমের মেয়ে বিথি আক্তার। তিনি অভিযোগ করে বলেন, টাকার বিনিময়ে ইমরানের বাবার নাম পরিবর্তন করেছে পুলিশ। এ জন্য ইমরানের জামিন পাওয়া সহজ হবে। তিনি এখন হুমকি-ধামকি দিচ্ছেন। তিনি বলেছেন, ‘লাল চাঁদকে যেভাবে খাইছি, তোদেরকেও সেভাবে খায়া দেব। বেশি বাড়াবাড়ি করবি না। দোকান বন্ধ রাখবি।’

অভিযোগের বিষয়ে গত সোমবার মুঠোফোনে কোতোয়ালী থানার ওসি ফয়সাল আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, কোনো আসামির বাবার নাম পরিবর্তন হওয়ার সুযোগ নেই। যদি সেটি হয়েও থাকে, তাহলে তা তাঁর অগোচরে হতে পারে। মামলার তদন্তের পুরোটা তিনি করেননি। এ কারণে বিষয়টি তিনি স্পষ্ট করে বলতে পারছেন না। তিনি পরে জানাতে পারবেন।

এ বিষয়ে জানতে গতকাল বুধবার ওসি ফয়সাল আহমেদের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হয়। তবে তিনি সাড়া দেননি।

‘মেসেঞ্জারে হত্যার হুমকি’

হত্যাকাণ্ডে আসামিদের ভূমিকা তুলে ধরে অভিযোগপত্রে বলা হয়, মূল পরিকল্পনাকারী মহিন ও সারোয়ার। তাঁরই হত্যায় নেতৃত্ব দেন। তাঁরা ঘটনাস্থলে থেকে সার্বক্ষণিক নির্দেশ দেন। হত্যার পর দুজনেই মৃতদেহের চারপাশে ঘুরে ঘুরে অনুসারীদের নিয়ে স্লোগান দেন। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর লাল চাঁদের বুকের ওপর লাফিয়ে দুই হাত ওপরে তুলে উল্লাস করেন মনির।

লাল চাঁদের পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, পলাতক সারোয়ার নানাভাবে তাঁদের চাপ দিচ্ছেন। তিনি সামাজিক মাধ্যমেও সক্রিয় আছেন। এমনকি তিনি মাঝেমধ্যে রজনী বোস লেনে আসা–যাওয়া করছেন। মামলা নিয়ে বাড়াবাড়ি না করার হুমকিও দিয়েছেন তিনি।

বাদী মঞ্জুয়ারা বেগমের মেয়ে বিথি আক্তার বলেন, সারোয়ার মেসেঞ্জারে হত্যার হুমকি দিচ্ছেন। হুমকি দিয়ে তিনি বলেছেন, ‘বাড়াবাড়ি করিস না। একটা হত্যা আর একাধিক হত্যার সাজা কিন্তু একই।’

আসামিদের হুমকি দেওয়ার বিষয়ে ওসি ফয়সাল আহমেদ বলেন, ‘দুই মাসে এমন কথা কেউ আমাদের জানায়নি। জানলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

পলাতক থেকেও চাঁদাবাজি

লাল চাঁদ হত্যা মামলার অভিযোগপত্রভুক্ত অন্যতম আসামি শারাফাত। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, তিনি পলাতক। তবে গত ২৫ জুন ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে একজন ঝুট ব্যবসায়ীকে জোর করে তুলে নিয়ে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করার অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় তাঁর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা হয়েছে।

দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা-পুলিশ সূত্র জানায়, শারাফাত ছাত্রদলের নেতা পরিচয়ে নানা অপকর্ম করছেন।

পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের (দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ সার্কেল) অতিরিক্ত সুপার জামিলুল হক প্রথম আলোকে বলেন, আলোচিত লাল চাঁদ হত্যা মামলার আসামি শারাফাত। তাঁর বিরুদ্ধে দখল, চাঁদাবাজির নানা অভিযোগ আছে। তিনি একজন দুর্ধর্ষ অপরাধী। তাঁকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

লাল চাঁদ হত্যা মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী জিয়াউল হক প্রথম আলোকে বলেন, হত্যাকাণ্ডের পর সরকার মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে নেওয়ার কথা বলেছিল। কিন্তু পরে সেটি হয়নি। লাল চাঁদের পরিবার চায়, মামলাটি যেন দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে নেওয়া হয়।

বাদী মঞ্জুয়ারা বেগমের মেয়ে বিথি আক্তার বলেন, ‘এক বছরেও বিচার হলো না। এখন উল্টো হত্যার হুমকির জেরে আমারা জীবন নিয়ে শঙ্কায় আছি।’