উপকূলীয় মানুষকে জলোচ্ছ্বাস ও বাঁধ ভাঙার মহাদুর্যোগ থেকে রক্ষা করতে আসছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিনির্ভর বৈজ্ঞানিক অ্যাপস ‘সার্ফ আইটি’। প্রাথমিক পর্যায়ের এই প্রযুক্তিটি তিন দিন আগেই নিখুঁত পূর্বাভাস দিতে সক্ষম। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
প্রযুক্তিটির বড় সুবিধা হলোÑ সম্ভাব্য জলোচ্ছ্বাসের অবস্থান, পানির উচ্চতা, প্লাবিত এলাকা এবং ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ সম্পর্কে আগাম তথ্য পাওয়া যাবে। এর মাধ্যমে আবহাওয়াবিদ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্টরা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তিটি দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশের সক্ষমতা আরো বাড়াবে এবং ক্ষয়ক্ষতি কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
সূত্র জানায়, দেশে বর্তমানে ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস দেওয়া হলেও জলোচ্ছ্বাসের সুনির্দিষ্ট অবস্থান, সম্ভাব্য পানির উচ্চতা কিংবা প্লাবিত এলাকা নির্ভুলভাবে চিহ্নিত করার সক্ষমতা নেই। এই সীমাবদ্ধতা দূর করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় একটি বৈজ্ঞানিক মডেল তৈরি করা হচ্ছে। দুর্যোগ মোকাবিলায় বেসরকারি সংস্থা ‘উত্তরণ’-এর নেতৃত্বে যৌথভাবে কাজ করছে আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘অ্যাকশন এগেইনস্ট হাঙ্গার’ এবং ‘নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়’। কারিগরি সহায়তায় রয়েছে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর (বিএমডি), বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (এফএফডাব্লিউসি), পানি উন্নয়ন বোর্ড (বিডাব্লিউডিবি) এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর (ডিডিএম)।
প্রকল্পটির অন্যতম লক্ষ্য শুধু বড় ঘূর্ণিঝড় নয়, বরং নিয়মিত ঘটে যাওয়া অতি উচ্চ জোয়ার ও ছোট আকারের জলোচ্ছ্বাসের ক্ষয়ক্ষতিও কমিয়ে আনা। সাধারণত এসব ঘটনায় বড় ধরনের সরকারি সহায়তা না পৌঁছালেও উপকূলীয় জনপদের মানুষের ব্যাপক ক্ষতি হয়। সেই ক্ষতি কমাতেই কাজ করছে প্রকল্পটি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বড় দুর্যোগের পাশাপাশি হঠাৎ অতি উচ্চ জোয়ারের মতো দুর্যোগে গ্রামীণ জনপদের ব্যাপক ক্ষতি হয়। এই ক্ষতি কমাতেই মূলত প্রকল্পটি কাজ করছে। প্রযুক্তির সঙ্গে এখানে যুক্ত করা হচ্ছে স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও লোকজ জ্ঞানকে। এর মাধ্যমে কোন বাঁধ দুর্বল, কোথায় ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি বেশি এবং কোথায় পানি উপচে পড়তে পারে— তা আগেই অধিক নির্ভুলভাবে পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হবে।
এছাড়া বছরের একটা বড় সময় (অক্টোবর থেকে জুন) খুলনা ও সাতক্ষীরাসহ উপকূলীয় এলাকার পুরুষরা জীবিকার তাগিদে ইটভাটাসহ বিভিন্ন কর্মস্থলে এলাকার বাইরে থাকেন। ফলে দুর্যোগকালে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং উদ্ধার ও সাড়াদান কার্যক্রমকে কার্যকর করতে নারীদের নেতৃত্বকে এখানে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের আবহাওয়া পূর্বাভাস ব্যবস্থার অভিজ্ঞতা অনুসরণ করে মডেলটি তৈরি করা হচ্ছে। ‘উত্তরণ’-এর পরিচালক মো. শহিদুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, এটি শুধু জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতাই মাপবে না, বরং উপকূলীয় বাঁধের অবস্থা, লোড বহনের সক্ষমতা এবং কোথায় বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, সেটিও বিশ্লেষণ করে প্লাবিত এলাকার মানচিত্রও তৈরি করবে।
গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মডেলটির পূর্বাভাস প্রায় ৯২ শতাংশ নির্ভুল। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে এর নির্ভুলতা ৯৫-৯৬ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এরপর প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে প্রযুক্তিটি সরকারের কাছে হস্তান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে জাতীয় দুর্যোগ পূর্বাভাস ব্যবস্থায় এটি ব্যবহার করা যায়।
প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তা শাশ্বত জাহিদ আমার দেশকে বলেন, আধুনিক এই মডেলটি বর্তমানে পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে এবং কার্যকারিতা বাড়াতে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত নীতিনির্ধারণী বৈঠক চলছে। এমনকি প্রেজেন্টেশন ও নীতিনির্ধারণী বৈঠক করা হচ্ছে। মডেলটি তিনদিন আগেই দুর্যোগের পূর্বাভাস দিতে সক্ষম বলে জানান এই কর্মকর্তা।
পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ শরীফ জামিল আমার দেশকে বলেন, উপকূলীয় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় শুধু ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস যথেষ্ট নয়; জলোচ্ছ্বাসের অবস্থান, উচ্চতা এবং সম্ভাব্য প্লাবন এলাকা সম্পর্কে নির্ভুল তথ্যই মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই বৈজ্ঞানিক তথ্যনির্ভর এমন প্রযুক্তি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে আগাম মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া, বাঁধ সুরক্ষা এবং স্থানীয় প্রশাসনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ আরো বাস্তবসম্মত হবে।
তিনি বলেন, সরকার যদি এই উদ্যোগ গ্রহণে আন্তরিক হয়, তাহলে গবেষণার সুফল দেশের মানুষ পাবে। অন্যথায় দীর্ঘদিনের গবেষণা ও উদ্ভাবনের সম্ভাবনা কাজে লাগানো কঠিন হবে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে নির্ভুল আগাম পূর্বাভাসভিত্তিক প্রযুক্তি চালু করা গেলে উপকূলীয় মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের সক্ষমতা আরো শক্তিশালী হবে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সাইদুর রহমান খান আমার দেশকে বলেন, এটি একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। বর্তমানে ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হলেও কোন এলাকায় জলোচ্ছ্বাস হবে, কোথায় উচ্চমাত্রার জোয়ার আসবে কিংবা কোন বেড়িবাঁধ ভেঙে যেতে পারে— তা সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায় না। এসব বিষয়ে নির্ভুল পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হলে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় এই প্রযুক্তি যুগান্তকারী ভূমিকা রাখতে পারে।