Image description

কঠোর নিষেধাজ্ঞার পরেও পুলিশ বাহিনীতে পদোন্নতি, বদলি ও পদায়নে অবাধে চলছে তদবির ও লাখ থেকে কোটি টাকা পর্যন্ত ঘুষ লেনদেন। স্থানীয় পর্যায় থেকে শুরু করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পর্যন্ত বিস্তৃত একটি প্রভাব বলয় তৈরি করেছে এই অনৈতিক চর্চা।

বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ের দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে কনস্টেবল থেকে শুরু করে এসপি পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের বদলি ও পদায়নের সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিক নিয়মে হওয়ার বদলে নাম এবং বিপি নম্বর লেখা অনানুষ্ঠানিক স্লিপের মাধ্যমে হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলেছে এমন ব্যবস্থা। মন্ত্রণালয়কে এখন রাজনৈতিক পরিচয়ে বিভক্ত বিভিন্ন পরস্পরবিরোধী সুপারিশের তালিকা সামাল দিতে হচ্ছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের দাবি, পদোন্নতি ও পদায়নের প্রতিটি সিদ্ধান্ত কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে নেওয়া হয়। তবে বাস্তবে সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রায়ই ব্যবহার হচ্ছে মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নাম। এমনকি ফাইল প্রক্রিয়াকরণের দায়িত্বে থাকা কিছু কর্মী সরাসরি এই লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।

 

সম্প্রতি পুলিশ সপ্তাহে তদবির ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোকে অসহনীয় দুর্নীতি হিসেবে আখ্যায়িত করেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে তিনি পুলিশ সদস্যদের কোনো অন্যায্য সুবিধার জন্য মন্ত্রণালয়ে যাতায়াত করতে নিষেধ করেন। প্রধানমন্ত্রীর সুর মিলিয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরও সতর্ক করে দেন যে, তদবিরের মাধ্যমে পাওয়া যেকোনো পোস্টিং তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল করা হবে।

এ বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে অতিরিক্ত আইজিপি (প্রশাসন) এ কে এম আওলাদ হোসেন টাইমস অব বাংলাদেশ’কে বলেন, তদবির হতেই পারে, এটি একটি স্বাভাবিক বিষয়। তিনি আরও বলেন, প্রত্যেকেই নিজের পছন্দের জায়গায় পদায়ন চান। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত যৌক্তিকতার ওপর ভিত্তি করেই নেওয়া হয়।

অন্যদিকে সাবেক আইজিপি মুহাম্মদ নূরুল হুদা এই পদায়ন বাণিজ্যকে দুঃখজনক, অনাকাঙ্ক্ষিত ও অপ্রত্যাশিত বলে অভিহিত করেন। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, এই ধরনের চর্চা অনিবার্যভাবে পুলিশি সেবার মান কমিয়ে দেবে।

বদলি ও পদোন্নতি হয় যেভাবে

দাপ্তরিক নিয়ম অনুযায়ী, পদমর্যাদা এবং এখতিয়ারের ওপর ভিত্তি করে পুলিশ সদর দপ্তরের প্রশাসনিক শাখা একটি কঠোর ও বহুধাপের বদলি ও পদোন্নতি প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। অতিরিক্ত এসপি পদমর্যাদা পর্যন্ত কর্মকর্তাদের পদায়নের সিদ্ধান্ত আইজিপি, অতিরিক্ত আইজিপি (প্রশাসন), ডিআইজি (প্রশাসন) এবং পার্সোনেল ম্যানেজমেন্ট শাখার ডিআইজিদের নিয়ে গঠিত কেন্দ্রীয় সদর দপ্তর পরিচালনা করে।

অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ পদায়নগুলো স্থানীয়ভাবে রেঞ্জ ডিআইজি, মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার এবং জেলা এসপিরা সামলান। এসপি থেকে শুরু করে অতিরিক্ত আইজিপি পর্যন্ত শীর্ষ নেতৃত্বের পদগুলোর জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হাতে থাকে। আর পুলিশের সর্বোচ্চ পদ অর্থাৎ মহাপরিদর্শক বা আইজিপি সরাসরি সরকারের মাধ্যমে নিযুক্ত হন।

বাস্তবে এই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। টাইমস চারজন ডিআইজি এবং মাঠ পর্যায়ের কয়েকজন এসপির সঙ্গে কথা বলেছে। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত তিন মাসে বিপুল সংখ্যক পদায়ন, পদোন্নতি এবং আগের আদেশ বাতিলের ঘটনা মেধা বা স্বাভাবিক নিয়ম মেনে হয়নি, বরং তদবিরের মাধ্যমে হয়েছে।

পুলিশের সূত্রগুলো জানায়, প্রতিদিন বিভিন্ন মাধ্যমে শত শত তদবিরের স্লিপ সদর দপ্তরে পৌঁছায়। কনস্টেবল থেকে শুরু করে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের পদের জন্য আসা এই অবিরাম তদবিরের অনুরোধ রেঞ্জ ডিআইজি, মেট্রোপলিটন কমিশনার এবং জেলা এসপিদের চরমভাবে হতাশ করছে। এর ফলে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ প্রশাসনিক কার্যক্রম।

রাজনৈতিক পরিচয় নির্ধারণ ও কোন্দল

পুলিশ বাহিনীর ভেতরে অভ্যন্তরীণ মেরুকরণ দিন দিন আরও গভীর হচ্ছে। একাধিক সূত্র জানায়,  পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর) এবং তার ওপরের পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের মধ্যে স্পষ্ট উপদল তৈরি হয়েছে।

এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে বগুড়া জেলা এবং গাবতলী উপজেলার কর্মকর্তাদের কথা বলা যায়, যারা দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। দাপ্তরিক নিয়মকে তোয়াক্কা না করে কিছু কর্মকর্তা সহকর্মীদের একটি তালিকা তৈরি করেছেন বলে জানা গেছে। এই তালিকায় তারা সহকর্মীদের জামায়াত বা আওয়ামী লীগপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করে নিজেদের তদবিরের সুবিধা নিচ্ছেন।

১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর রাজনৈতিক পরিচয় চিহ্নিত করার প্রবণতা আরও বেড়েছে। দেশের সবকটি জেলার এসপিদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা পর্যালোচনা করা হচ্ছে জানা গেছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে জামায়াত সমর্থক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এই রাজনৈতিক বিভাজন শীর্ষ স্তরের পদায়নের ক্ষেত্রেও সরাসরি প্রভাব ফেলছে। র‍্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) ফারুক আহমেদ ডিএমপি কমিশনার পদের দৌড়ে ছিলেন। তবে নিজের জেলার একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাসহ প্রতিদ্বন্দ্বী কর্মকর্তাদের আপত্তির কারণে তাকে এই পদের জন্য বিবেচনা করা হয়নি।

একইভাবে ডিএমপির যুগ্ম পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলামকে সম্প্রতি প্রটেকশন অ্যান্ড ডিপ্লোম্যাটিক সিকিউরিটি বিভাগে বদলি করা হয়েছে। জোরালো গুঞ্জন রয়েছে, নিজের বাহিনীর সদস্যদের রাজনৈতিক প্রোফাইল তৈরিতে ভূমিকা রাখার কারণেই তাকে এই খেসারত দিতে হয়েছে।

পুলিশের মধ্যকার এই ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের জেরে সম্প্রতি ডিআইজি আলী আকবর খান পদত্যাগ করেছেন। গ্রেড-১ ও গ্রেড-২ পদে নিয়োগ এবং পাঁচজন কর্মকর্তাকে অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ প্রকাশ্যে এনে তিনি চাকরি থেকে ইস্তফা দেন।

বদলির খরচাপাতি

পুলিশের একাধিক সূত্র জানায়, মূলত বিশেষ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পরিচালিত হয় এই অবৈধ বদলির বাজার। এই সিন্ডিকেটে জড়িত আছেন কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তারা প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপে তদবির ও ঘুষের টাকা লেনদেন করেন।

অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, পদায়নের জন্য কথিত খরচের পরিমাণ পুরোপুরি একটি ব্যবসায়িক লেনদেনের মতো। এটি পদ ও কর্মক্ষেত্রের ওপর নির্ভর করে কম-বেশি হয়।

পুলিশ সদর দপ্তরের মাধ্যমে একটি বদলি করাতে একজন কনস্টেবলকে ৫০ হাজার থেকে ৮০ হাজার টাকা দিতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে একজন সহকারী উপপরিদর্শককে (এএসআই) প্রায় দেড় লাখ টাকা, একজন উপপরিদর্শককে (এসআই) প্রায় আড়াই লাখ টাকা এবং একজন পরিদর্শককে (ইন্সপেক্টর) প্রায় ৪ লাখ টাকা দিতে হয়।

এর তুলনায় আঞ্চলিক রেঞ্জ এবং মেট্রোপলিটন ইউনিটগুলোর হার কিছুটা কম। সেখানে কনস্টেবল বদলিতে ৩০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা লাগে। তবে এএসআইদের ক্ষেত্রে সদর দপ্তরের মতোই দেড় লাখ টাকা দিতে হয়। এছাড়া সাব-ইন্সপেক্টরদের জন্য ২ লাখ টাকা এবং ইন্সপেক্টরদের জন্য আড়াই লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়।

নেতৃত্বের পর্যায়ে এই আর্থিক লেনদেনের পরিমাণ বহুগুণ বেড়ে যায়। সম্প্রতি গুরুত্বপূর্ণ জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) বদলির ক্ষেত্রে ৩ কোটি থেকে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত বিশাল অঙ্কের দুর্নীতির লেনদেন হয়েছে বলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে অভিযোগ উঠেছে।

কোটি কোটি টাকার এসপি পদায়ন চুক্তির অভিযোগ

সম্প্রতি বেশ কয়েকটি আলোচিত অভিযোগের পর এসপি পর্যায়ের নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্প্রতি মো. রিয়াজুল ইসলামকে মৌলভীবাজারের এসপি হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি সামনে আনা হয়। সেখানে অভিযোগ করা হয়, কোটি কোটি টাকার একটি অবৈধ চুক্তির মাধ্যমে তিনি এই পোস্টিং পেয়েছেন। অবশ্য দায়িত্ব নেওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই ইসলামকে সেখান থেকে প্রত্যাহার করা হয়।

ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া আরেকটি অভিযোগে জানা যায়, মিরপুরের শগুফতা আবাসিক এলাকায় বসবাসকারী একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারকের স্ত্রী তার ভাইয়ের জন্য তদবির করছিলেন। এসপি পদমর্যাদার ওই ভাইয়ের জন্য গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ বা রাজশাহীর মতো লোভনীয় জায়গায় পোস্টিং চেয়ে তিনি ১৫ কোটি টাকার স্ট্যাম্পের মাধ্যমে লেনদেন করেছেন বলে জানা গেছে।

অনলাইনে প্রকাশ হওয়া এসব যাচাইহীন অভিযোগ আসলে একটি বিস্তারিত তথ্যের অংশ, যেখানে অন্তত চারজন জেলা পুলিশ সুপারের পদায়নের সঙ্গে যুক্ত লাভজনক ব্যবসায়িক চুক্তির বিবরণ রয়েছে। এ ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট সব কর্মকর্তাকেই তাদের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

পছন্দের ও কাঙ্ক্ষিত পদায়ন

পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের নিজস্ব আগ্রহ বা পছন্দ একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম হয়। এই ভিন্ন ভিন্ন পছন্দই তদবিরের ধরণ নির্ধারণ করে দেয়।

এপিবিএন, র‍্যাব, এটিইউ, ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ, ট্যুরিস্ট পুলিশ, নৌ পুলিশ, এসপিবিএন, পিবিআই, পুলিশ টেলিকম এবং এমআরটি পুলিশের মতো বিশেষায়িত ইউনিটগুলো সাধারণ সদস্যদের কাছে তেমন জনপ্রিয় নয়। বাহিনীর অনেকেই এই ইউনিটগুলোতে বদলি হওয়াকে নির্বাসন বা শাস্তিমূলক বদলি হিসেবে মনে করেন।

এর বিপরীতে সাধারণ জেলা এবং হাইওয়ে পুলিশে বদলি হওয়ার আগ্রহ সবার বেশি থাকে। এর প্রধান কারণ হলো অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা।

আঞ্চলিক রেঞ্জগুলোর মধ্যে ঢাকার পরেই চট্টগ্রাম রেঞ্জের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। অন্যদিকে কনস্টেবল থেকে শুরু করে ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার কর্মী, যারা ক্যারিয়ারে ভালো আয় ও সুযোগ-সুবিধা চান, তাদের মূল লক্ষ্য থাকে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ এবং গাজীপুর জেলা।