Image description

গাজীপুরে মাদক, ছিনতাই, ডাকাতি, পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও দাম্পত্যকলহ— এসব নানা কারণে বেড়েছে খুনের ঘটনা। এ ছাড়া অন্য জায়গায় খুন করে গাজীপুরে মরদেহ ফেলে রাখার ঘটনাও ঘটছে। ব্যস্ততম ও ঘনবসতির কারণে কোথায় কী হচ্ছে, তা ঠিকমতো নজরদারি করতে পারে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। জেলা ও মহানগরে ৩০টি খুনের ঘটনা ঘটেছে গত মে মাসে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গাজীপুরের অপরাধপ্রবণতা শুধু হত্যাকাণ্ড নয়— ছিনতাই, মাদক ব্যবসা, অস্ত্র ব্যবহার ও অসমাপ্ত নগর প্রকল্প দখল নিয়ে ঘটছে হানাহানি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনের চেষ্টা থাকলেও কিছুতেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না পরিস্থিতি। এলাকাবাসীর দাবি, জেলায় হঠাৎ করেই বেড়ে গেছে খুন। পাশাপাশি দেখা দিয়েছে সামাজিক অবক্ষয়। একের পর এক হত্যার ঘটনায় সাধারণ মানুষের মনে বাড়ছে আতঙ্ক। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও কঠোর দেখতে চান তারা।

জেলার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মাত্র ৩৮ শতাংশ মানুষ বসবাস করেন নিজের বাড়িতে। বাকি সবাই ভাড়া বাসায় থাকেন অন্য জেলা থেকে এসে। টঙ্গীর ১৭টি বস্তি, বিশেষ করে মাজার বস্তি, অপরাধ ও মাদক ব্যবসার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট কিছুদিন পরপর অভিযান চালালেও আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে অপরাধীরা। বস্তিতে নিয়মিত মাদক বিক্রি, অস্ত্র ভাড়া দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া অসমাপ্ত বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্প (বিমানবন্দর-গাজীপুর সড়ক) ভূমিকা রাখছে অপরাধে। উড়াল সেতু, সিঁড়ি ও র‌্যাম্প এলাকায় প্রতিনিয়ত ঘটে ছিনতাই এবং খুনের ঘটনা। বিভিন্ন সূত্রের তথ্য, গাজীপুরে সংঘটিত অপরাধের অধিকাংশই বিআরটি প্রকল্প এলাকা ঘিরে।

 

 

গত মে মাসে (এক মাসের) খুনের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, মহানগরীতে গত মে মাসে খুন হয়েছে ১৭টি। আর একই সময়ে জেলার পাঁচটি উপজেলায় খুন হয়েছে ১৩টি। এ তথ্য নিশ্চিত করেছে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের কার্যালয় এবং জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়।

আলোচিত হত্যার মধ্যে গত ৯ মে কাপাসিয়া উপজেলার রাউৎকোনা গ্রামে নৃশংসভাবে খুন করা হয় একই পরিবারের শিশুসহ পাঁচজনকে। এই হত্যাকাণ্ডে প্রধান অভিযুক্ত ফোরকান মোল্লার মরদেহ উদ্ধার হয়েছে মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার পদ্মা নদী থেকে।

৯ মে সন্ধ্যার দিকে উপজেলার প্রহ্লাদপুর ইউনিয়নের ফাওগান বাজারে শিশু ধর্ষণের অভিযোগে ষাটোর্ধ্ব এক বিএনপি নেতাকে সালিশে ডেকে নিয়ে ইউপি সদস্যের নেতৃত্বে পিটিয়ে গুরুতর আহত করা হয়। মারধরের দুদিন পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় তার।

১০ মে কালিয়াকৈর উপজেলার ফুলবাড়িয়া ইউনিয়নের বাগচালা গ্রামে গরুচোর সন্দেহে তিনজনকে পিটিয়ে হত্যা করে ‘বিক্ষুব্ধ জনতা’। এ সময় তাদের ব্যবহৃত একটি ট্রাকও জ্বালিয়ে দেওয়া হয়।

১২ মে গাজীপুর মহানগরীর গাছা থানার ওঝারপাড়া গ্রামের মহরের বাড়িসংলগ্ন এলাকায় শুভ নামের এক অটোরিকশাচালককে গলা কেটে হত্যার পর অটোরিকশা ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। এ ছাড়া ১৪ মে শ্রীপুরের রাজাবাড়ী ইউনিয়নের ডোয়াইবাড়ি গজারি বনের ভেতর থেকে আসিফ হোসেন (২১) নামে এক অটোরিকশাচালকের গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। একই দিনে টঙ্গী পূর্ব থানার মরকুন পূর্বপাড়া এলাকায় একটি নির্মাণাধীন ভবন থেকে ফারুক হোসেন (৩৭) নামে এক ব্যক্তির ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ।

এদিকে গত ২ জুন গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার তুমুলিয়া ইউনিয়নের বঙ্গবন্ধু বাজারসংলগ্ন সোম এলাকা থেকে ছাইফুল ইসলাম (৪৯) নামে এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই থানার এসআই মজিবুর রহমানের ভাষ্য, ওই ব্যক্তি উপজেলার অলুয়া গ্রামের বাসিন্দা। তাকে অন্য কোথাও হত্যার পর মরদেহ ওই জায়গায় ফেলে রাখা হয়েছে।

গত ৪ জুন গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বরকুল গ্রামের শেখের ঘাট এলাকা থেকে নাঈম (২৭) নামে এক কাঁচামাল ব্যবসায়ীর হাত বাঁধা অবস্থায় মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মরদেহ উদ্ধার হওয়ার আগে তিনি প্রায় ৩০ ঘণ্টা নিখোঁজ ছিলেন।

টঙ্গীর বাসিন্দা রিয়াজ হাসানের মত, ‘মাদকে আসক্ত মানুষই অনেক অপকর্ম করছে। পাশাপাশি অটোরিকশা ছিনতাইকারীও বেড়েছে। এতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি হচ্ছে।’

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) গাজীপুর জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক ইফতেখার শিশিরের ভাষ্য, ‘অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর যদি দ্রুত বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শাস্তির আওতায় আনা হতো, তাহলে অপরাধ অনেকাংশে কমত। এখানে ভাসমান লোক বেশি। কেউ কাউকে চেনে না। তাই অপরাধ করে পার পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।’
গাজীপুর পুলিশ সুপার মো. শরিফ উদ্দীন বললেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে মাঠে কাজ করছে পুলিশ। বিভিন্ন ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’

এ বিষয়ে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মো. বেলায়েত হোসেন জানালেন, ঘনবসতিপূর্ণ গাজীপুরের বিভিন্ন সময় খুনের মতো ঘটনা ঘটে থাকে। তবে এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হচ্ছে পুলিশ। অপরাধ করে কেউ পার পাচ্ছে না। শুধু খুন নয়, সব ধরনের অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে নিরলস কাজ চলছে।