বিশ্বের প্রায় সব দেশের মতো ফুটবল বিশ্বকাপ এলেই বাংলাদেশেও অসংখ্য ফুটবলপ্রেমী ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সমর্থনে বিভক্ত হয়ে পড়েন। প্রিয় দলকে ঘিরে আনন্দ-উচ্ছ্বাস, তর্ক-বিতর্ক ও বন্ধুত্বপূর্ণ খুনসুটি বহুদিনের ঐতিহ্য।
অন্যদিকে রাজধানীর গেন্ডারিয়া, শ্যামপুর, কমলাপুর, বাসাবো, জুরাইন, মগবাজার, মতিঝিলসহ বিভিন্ন এলাকায় বিশ্বকাপকে ঘিরে গোপনে বসছে বাজির আসর। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, চায়ের দোকান, ক্লাবঘর ও আড্ডাকেন্দ্রের পাশাপাশি অনলাইন বেটিং অ্যাপ, টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে চলছে লাখ লাখ টাকার লেনদেন।
এদিকে গোয়েন্দা পুলিশ বলছে, অনলাইন ও অফলাইন উভয় ধরনের জুয়া দমনে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) একটি ঘটনার অনুসন্ধানে ধানমন্ডির রায়বাজার ও শংকর এলাকায় গিয়ে সাত বন্ধুর একজনের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে বাংলানিউজ। সরকারি চাকরিজীবী এক আত্মীয়ের মাধ্যমে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই শিক্ষার্থীর মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।
তিনি জানান, বিশ্বকাপে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনার প্রথম ম্যাচ উপলক্ষে তার ছেলে ও আরও ছয় বন্ধু এক বন্ধুর বাসায় খেলা দেখার আয়োজন করে। সবাই মিলে চাঁদা তুলে কাচ্চি বিরিয়ানিরও ব্যবস্থা করা হয়।
সাত বন্ধুর মধ্যে তিনজন ছিলেন ব্রাজিলের সমর্থক, আর বাকিরা আর্জেন্টিনার। সবাই প্রায় সমবয়সী। কেউ সদ্য এসএসসি পরীক্ষা শেষ করেছে, আবার কেউ এবার এইচএসসি পরীক্ষার্থী।
শিক্ষার্থীর মা জানান, ম্যাচ শুরুর আগে বন্ধুদের মধ্যে হঠাৎ করেই একটি বাজি ধরা হয়। শর্ত ছিল, মেসি গোল করলে ব্রাজিল সমর্থক দুই বন্ধু সেদিন মাংস ছাড়া শুধু কাচ্চির রাইস খাবে। আর মেসি গোল করতে না পারলে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের একইভাবে মাংস ছাড়া কাচ্চি খেতে হবে। সবাই হাত মিলিয়ে সেই শর্তে সম্মতি দেয়।
প্রথম ম্যাচে আর্জেন্টিনা জয়ের পর শর্ত অনুযায়ী ব্রাজিল সমর্থক বন্ধুদের মাংস ছাড়া কাচ্চি খেতে হয়। মজার ছলে শুরু হওয়া এই বাজিই পরে নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়। এরপর আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, ফ্রান্সসহ আরও কয়েকটি দলের ম্যাচকে কেন্দ্র করে বাজির পরিধি বাড়তে থাকে। প্রথমে খাবার নিয়ে বাজি হলেও পরে তা নগদ অর্থের জুয়ায় রূপ নেয়।
সবশেষ ২৯ জুন রাতে ব্রাজিলের ম্যাচকে কেন্দ্র করে আবারও নগদ অর্থে বাজি ধরা হয়। ব্রাজিলের প্রতিপক্ষ ছিল জাপান। শর্ত ছিল, ব্রাজিল তিন গোলের ব্যবধানে জিতলে অন্য চার বন্ধু মিলে ব্রাজিল সমর্থক তিনজনকে মোট তিন হাজার টাকা দেবে। আর ম্যাচ ড্র হলে ব্রাজিল সমর্থক তিনজন অপর চার বন্ধুকে জনপ্রতি এক হাজার টাকা করে পরিশোধ করবে।
শুধু ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা নয়, ফ্রান্সসহ অন্যান্য দলের ম্যাচ এবং কিলিয়ান এমবাপ্পের মতো খেলোয়াড়দের ঘিরেও বাজি ধরা শুরু হয়।
ওই মা আরও জানান, ছেলের অনুরোধে পরিবারের সদস্যরা ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলো একসঙ্গে দেখার অনুমতি দিলেও অন্য ম্যাচগুলোতে তা দিতেন না। কিন্তু তাতেও বাজি থেমে থাকেনি। যে যার বাসায় বসেই মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বিভিন্ন ম্যাচকে কেন্দ্র করে অর্থের বিনিময়ে বাজি ধরতে থাকে।
তিনি বলেন, বিশ্বকাপ চলাকালে প্রথমে খাবারের বাজি দিয়ে শুরু করলেও পরে তার ছেলে নগদ টাকার জুয়ায় আসক্ত হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে বিভিন্ন ম্যাচে বাজি ধরতে গিয়ে কোচিং সেন্টারের বেতনের টাকাও হারিয়ে ফেলে।
মা জিজ্ঞাসাবাদ করলে ওই শিক্ষার্থী স্বীকার করে, বন্ধুদের সঙ্গে বিভিন্ন ম্যাচে বাজি ধরে হেরে যাওয়ায় কোচিংয়ের বেতনের পুরো টাকাই শেষ হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, খুব দ্রুত বিষয়টি জানতে পেরেছি। না হলে আমার ছেলে পুরোপুরি জুয়ায় আসক্ত হয়ে পড়ত। এরপর অন্য বন্ধুদের পরিবারকেও বিষয়টি জানিয়েছি। এখন সবাই মিলে সন্তানদের বোঝানোর চেষ্টা করছি।
শুধু বন্ধুদের মধ্যে বাজিই নয়, সংগঠিত অনলাইন বেটিংয়েও বাড়ছে তরুণদের অংশগ্রহণ। রাজধানীর গেন্ডারিয়া এলাকার বাচ্চু (ছদ্মনাম) বাংলানিউজকে বলেন, বন্ধুদের উৎসাহে তিনি একটি অনলাইন জুয়া প্ল্যাটফর্মে অ্যাকাউন্ট খোলেন। নতুন সদস্য হিসেবে তাকে ৫০০ টাকা বোনাস দেওয়া হয়। এরপর অ্যাকাউন্টে আরও টাকা জমা দিতে উৎসাহিত করা হয়। তিনি পাঁচ হাজার টাকা জমা দেওয়ার পর বিভিন্ন খেলার ওপর বাজি ধরার সুযোগ পান।
তিনি বলেন, ধরুন ব্রাজিল-জাপান ম্যাচ। খেলা শুরুর আগেই বিভিন্ন অপশন আসে কে প্রথম গোল করবে, কত মিনিটে গোল হবে, বিরতির আগে না পরে গোল হবে কিংবা নির্দিষ্ট কোনো খেলোয়াড় গোল করবেন কি না। প্রতিটি অপশনের বিপরীতে নির্দিষ্ট রেট থাকে।
বাচ্চুর ভাষায়, আমি যদি এক হাজার টাকা বাজি ধরি এবং সেটি মিলে যায়, তাহলে দ্বিগুণ টাকা পাই। আর না মিললে পুরো টাকাই হারাই। জেতার টাকা তোলার কথা আর মনে থাকে না। বরং হারলে আবার টাকা জমা দিতে ইচ্ছা করে। মনে হয়, যেভাবেই হোক হারানো টাকা ফেরত আনতে হবে। কিন্তু বাস্তবে বেশিরভাগ মানুষই হারেন। অদৃশ্য কিছু নিয়ন্ত্রক বিপুল অঙ্কের টাকা নিয়ে যায়।
তিনি, আমরা বুঝি এটি অন্যায়। তবুও একসময় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, যখন ঘর-সংসার, অর্থ-সম্পদ সবকিছু হারানোর পরও ফিরে আসার সুযোগ থাকে না।
জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬
১৫৯ বছর পুরোনো আইন বাতিল করে ডিজিটাল যুগের অনলাইন জুয়া, স্পোর্টস বেটিং এবং ক্রিপ্টোকারেন্সিভিত্তিক জুয়া নিয়ন্ত্রণে জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’ পাস হয়েছে। নতুন আইনে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ ৫ কোটি টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
গত ৩০ জুন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদের অধিবেশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিলটি উত্থাপন করলে তা সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়।
জুয়া নিয়ন্ত্রণ করা সহজ নয়
জুয়া নিয়ন্ত্রণ করা সহজ নয় বলে মন্তব্য করেছেন পুলিশের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা। তিনি বলেন, অনলাইন ও অফলাইন উভয় ধরনের জুয়া নিয়ন্ত্রণ করা সহজ বিষয় নয়। অনলাইন জুয়া সাধারণত বিভিন্ন অ্যাপভিত্তিক হয়ে থাকে। আবার অনেক ক্ষেত্রে মেসেঞ্জার, টেলিগ্রাম কিংবা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খুলেও নিজেদের মধ্যে বেটিং পরিচালিত হয়।
পুলিশের এই কর্মকর্তা জানান, এসব জুয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে যখন সংঘর্ষ, মারামারি বা অন্য কোনো অপরাধের ঘটনা ঘটে, তখন পুলিশ বিষয়টি জানতে পারে এবং আইনগত ব্যবস্থা নেয়। তবে ব্যক্তিগত পর্যায়ে কোথাও অফলাইনে জুয়া হলে অভিযোগ না পাওয়া পর্যন্ত তা শনাক্ত করা কঠিন। তার মতে, এসব প্রতিরোধে পরিবারের ভূমিকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি আরও বলেন, খেলাধুলাকে কেন্দ্র করে জুয়া শুধু কোন দল জিতবে বা হারবে, তাতেই সীমাবদ্ধ নেই। কে প্রথম গোল করবে, পরবর্তী গোল হবে কি না, প্রথমার্ধে কত গোল হবে কিংবা নির্দিষ্ট কোনো খেলোয়াড় গোল করবেন কি না—এসব বিষয় নিয়েও বাজি ধরা হয়।
অনেক ক্ষেত্রে শর্ত অনুযায়ী বিজয়ী ব্যক্তি দ্বিগুণ অর্থ পেয়ে যান, আর পরাজিত ব্যক্তি নিজের অর্থ হারান। এখান থেকেই শুরু হয় আসক্তির মূল চক্র। হেরে যাওয়া ব্যক্তি হারানো অর্থ ফিরে পাওয়ার আশায় আবার বাজি ধরেন, আর বিজয়ী ব্যক্তি আরও লাভের আশায় জুয়ার দিকে ঝুঁকে পড়েন। এভাবেই ধীরে ধীরে মানুষ জুয়ায় আসক্ত হয়ে পড়ে।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় জমে উঠছে বাজির আসর
সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীর গেন্ডারিয়া, শ্যামপুর, কমলাপুর, বাসাবো, জুরাইন, মগবাজার, মতিঝিলসহ বিভিন্ন এলাকায় বিশ্বকাপকে ঘিরে গোপনে জমে উঠছে বাজির আসর।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, চায়ের দোকান, ক্লাবঘর ও আড্ডাকেন্দ্রকে ঘিরে ছোট পরিসরে বাজির আয়োজন হয়। অন্যদিকে অনলাইন বেটিং অ্যাপ, টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে বড় অঙ্কের লেনদেন চলছে। গার্মেন্টসকর্মী, শিক্ষার্থী ও তরুণদের মধ্যে এ প্রবণতা বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। স্থানীয় কিছু সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ম্যাচভিত্তিক বাজি ধরে প্রকাশ্যেই অর্থ লেনদেন হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সূত্রাপুর এলাকার চায়ের দোকানদার মিজান বলেন, খেলা শুরুর আগেই অলিগলিতে মোবাইল হাতে তরুণদের ছোটাছুটি করতে দেখা যায়। কয়েকজন একসঙ্গে বসে ফিসফিস করে কথা বলে। মাঝেমধ্যে শুনি ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে লাখ টাকার বাজিও ধরা হচ্ছে। বিশেষ করে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড ও পর্তুগালের ম্যাচে বাজির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। কিন্তু কাউকে জিততে দেখি না, শেষে শুধু হতাশাই থাকে।
মতিঝিল এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা রহমত উল্লাহ বলেন, জুয়া যুবসমাজকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। আগে পাড়া-মহল্লার চায়ের দোকানে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন স্মার্টফোনভিত্তিক অ্যাপ, টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে বাজি ছড়িয়ে পড়েছে। বিকাশ, নগদসহ বিভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যমে অর্থ লেনদেন হচ্ছে। অভিভাবক হিসেবে আমরা খুবই উদ্বিগ্ন।
জুরাইনের বাসিন্দা সাইফুল বলেন, এখন ছোট ছোট ছেলেরাও ২০০-৫০০ টাকা বাজি ধরছে। অনেকে মজা করে শুরু করে। পরে বড় অঙ্কের টাকা হারিয়ে নেশার মতো হয়ে যায়। এরপর পরিবারে অশান্তি সৃষ্টি হয়, কেউ কেউ চুরি-ছিনতাইসহ নানা অপরাধেও জড়িয়ে পড়ে।
জুয়ার বিস্তারে বাড়ছে সহিংসতা, ঘটছে হত্যাকাণ্ডও
দেশে অনলাইন ও অফলাইন উভয় ধরনের জুয়ার বিস্তারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সহিংসতা, মারামারি, হত্যাকাণ্ডসহ নানা ধরনের অপরাধ।
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় জুয়া কিংবা জুয়ার লেনদেনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে আহত ব্যক্তিদের প্রায়ই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে বলে হাসপাতালের পুলিশ ক্যাম্প সূত্রে জানা গেছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন তদন্তে দেখা গেছে, অনলাইন জুয়ায় আসক্ত হয়ে অনেকেই বিপুল অঙ্কের ঋণের বোঝায় জড়িয়ে পড়ছেন। সেই আর্থিক সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে গিয়ে কেউ কেউ চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, এমনকি হত্যাকাণ্ডের মতো গুরুতর অপরাধেও জড়িয়ে পড়ছেন।
ঢাকার গোয়েন্দা পুলিশ প্রধান যা বলছেন
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) প্রধান মো. শফিকুল ইসলাম বাংলানিউজকে বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জোরালো নির্দেশনার আলোকে অন্যান্য অপরাধের পাশাপাশি অনলাইন ও অফলাইন উভয় ধরনের জুয়ার কার্যক্রম সার্বক্ষণিকভাবে মনিটরিং করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, বিশেষ করে চলমান ফুটবল বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে দেশের কোথাও অনলাইন বা অফলাইনে জুয়ার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে গোয়েন্দা নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে।
ডিবিপ্রধান আরও বলেন, বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে কেউ যদি অনলাইন বা অফলাইনে জুয়া পরিচালনা করে কিংবা এ ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার তথ্য গোয়েন্দা পুলিশের নজরে আসে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
খেলাধুলাকে বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে দেখার মানসিকতা কমছে
অপরাধবিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল ইসলাম বাংলানিউজকে বলেন, ফুটবল বিশ্বকাপ কিংবা ক্রিকেটকে কেন্দ্র করে ব্যক্তিগত পর্যায়ে অনলাইন ও অফলাইনে জুয়া বা বেটিংয়ের প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমেও নিয়মিত এ ধরনের ঘটনার খবর প্রকাশিত হচ্ছে।
তার মতে, এই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে শুধু আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়। এর চেয়েও বেশি প্রয়োজন পারিবারিক শিক্ষা, সামাজিক সচেতনতা এবং এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে জুয়ার ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে বিশেষ করে শিশু-কিশোর ও তরুণদের সচেতন করা।
ড. তৌহিদুল ইসলাম বলেন, সমাজে এমন অনেক ব্যবসায়ী, উচ্চপদস্থ চাকরিজীবী ও প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি রয়েছেন, যারা পান-সিগারেট বা অন্য কোনো নেশায় আসক্ত নন, কিন্তু জুয়ায় আসক্ত। দিনের কাজ শেষে রাতে তারা বিভিন্ন স্থানে গিয়ে জুয়া খেলেন। তাদের অনেকেই প্রাপ্তবয়স্ক, এমনকি চার-পাঁচ সন্তানের অভিভাবকও।
তিনি বলেন, এ ধরনের মানুষদের বোঝানো তুলনামূলক কঠিন। অথচ তাদের নিজের সন্তান জুয়া খেললে তারাই বাধা দেন এবং প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। কিন্তু নিজের জুয়া খেলাকে তারা অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করেন না। এ কারণেই পারিবারিক পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
ড. তৌহিদুল ইসলাম আরও বলেন, বিশ্বকাপ ফুটবলকে কেন্দ্র করে অর্থের বিনিময়ে বাজি ধরা বা বেটিং এখন শুধু বড় পরিসরেই সীমাবদ্ধ নয়, ব্যক্তিগত পর্যায়েও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক ফুটবল ও ক্রিকেট টুর্নামেন্টকে কেন্দ্র করে অনলাইন বেটিংয়ের প্রবণতা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়। যদিও অফলাইনেও জুয়া চলছে, তবে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে এর বিস্তার অনেক বেশি।
শিশু-কিশোরদের জন্য ‘নীরব বিপদ’
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. শারমিন আক্তার বাংলানিউজকে বলেন, অনলাইন জুয়া শিশু-কিশোরদের জন্য একটি নীরব বিপদ হয়ে উঠছে। এটি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতির বিষয় নয়, বরং তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।
তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় মোবাইল বা স্ক্রিনে আসক্ত থাকার কারণে ঘুমের ব্যাঘাত, চোখের সমস্যা, মাথাব্যথা, ক্লান্তি ও শারীরিক দুর্বলতা দেখা দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব কারণে শিশু-কিশোরদের হাসপাতালে ভর্তি পর্যন্ত হতে হচ্ছে।
ডা. শারমিন আক্তার বলেন, মানসিকভাবে অনলাইন জুয়া শিশু-কিশোরদের উদ্বেগ, হতাশা, রাগ, অস্থিরতা এবং আসক্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। হার-জিতের চাপ তাদের আচরণে নেতিবাচক পরিবর্তন আনছে, পরিবার থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি করছে।
তিনি আরও বলেন, অনলাইন জুয়ার কারণে অনেক শিশুর পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যাচ্ছে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং আত্মবিশ্বাসও নষ্ট হচ্ছে। তাই শিশু-কিশোরদের ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারের বিষয়ে অভিভাবকদের আরও সচেতন হতে হবে এবং পরিবারে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও খোলামেলা যোগাযোগ বজায় রাখতে হবে।