স্যোশাল মিডিয়ায় ৫০ মিলিয়নেরও বেশি ভিউ পাওয়া শিশুদের একটি কন্টেন্টের গল্প দিয়ে শুরু করি।
একটি ছোট্ট ছেলে মেঝেতে বসে আরবি পড়ছে। হঠাৎ পেছন থেকে আরেক শিশু এসে লাঠি দিয়ে তার মাথায় আঘাত করে। মুহূর্তেই শিশুটিকে রক্তাক্ত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়তে দেখা যায়। এরপর হত্যাকারীর ভূমিকায় থাকা শিশুটি নাকের কাছে হাত দিয়ে দেখে সে বেঁচে আছে কি না। মৃত ভেবে হো হো করে হাসতে থাকে। তারপর লাশ বস্তাবন্দী করে টেনে নিয়ে যায়, রক্তাক্ত বস্তা দেখে বাবার সন্দেহ হলে বাবাকেও মিথ্যা বলে। আর ছাদ থেকে সেটি ফেলে দিতে গিয়ে বলতে থাকে যে এবার আর তার ভাই সম্পত্তির ভাগ নিতে পারবে না।
“সথ ভাই কে মে*রে ফেললো ভাই আল্লাহ মহান” শিরোনামে ভিডিওটি ‘হাসান’ (Mehedihasanvau) নামের একটি ইউটিউব চ্যানেলে আপলোড করা হয়।
১ লক্ষ ৭৮ হাজার সাবস্ক্রাইবার যুক্ত চ্যানেলটি পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, এই চ্যানেলে ৮৬টা ভিডিওর মধ্যে অন্তত ২১টি ভিডিওতে শিশুদের দিয়ে খুন করার দৃশ্য দেখানো হয়েছে। প্রচারিত ভিডিওগুলোতে শিশু সন্তান তার মাকে কুপিয়ে হত্যা করছে, বাবা সেজে এক শিশু তার ছেলেকে হত্যা করছে, ভাই বোনের হত্যার দৃশ্যসহ বিভিন্ন আপত্তিকর ভিডিও আপলোড করা হয়েছে। সব মিলিয়ে ৯কোটি বারের বেশি দেখা হয়েছে এসব ভিডিও এবং হাজার হাজার মানুষ শেয়ার করেছেন সেগুলো।
একই চ্যানেলে আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, একটি শিশু তার প্রেমিকার কথায় মায়ের কলিজা কেটে নিয়ে যাচ্ছে। এমনকি সেখানে মা চরিত্রটিও অবলীলায় শিশুটিকে তার কলিজা কেটে নিতে সায় দেয় শিশুটি “ভালোবাসা নিয়ে সুখে থাকার” জন্য।
মিলিয়ন মিলিয়ন ভিউ হলেও অনেকেই কমেন্ট বক্সে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রশ্ন তুলেছেন- এসব কন্টেন্টে যে শিশুরা অভিনয় করছে, অথবা যেসব শিশু এসব ভিডিও দেখছে, তারা এগুলো থেকে কী শিখছে? ভিডিওর শেষ দৃশ্যে বাস্তবতা প্রকাশ পেলেও, তার আগে পর্যন্ত যে খুন, প্রতারণা, লাশ গুম, মিথ্যা এবং সম্পত্তি দখলের গল্প দেখানো হয়, সেটিই কি শিশু দর্শকদের মনে বেশি প্রভাব ফেলে না?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন শিশুদের দিয়ে নির্মিত এমন অসংখ্য ভিডিও ছড়িয়ে পড়ছে, যেখানে খুন, আত্মহত্যা, পারিবারিক সহিংসতা, রাজনৈতিক প্রচারণা, বিপজ্জনক স্টান্ট, এমনকি বড়দের মধ্যকার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও শিশুদের অভিনয়ের বিষয় হয়ে উঠছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব কনটেন্টের লক্ষ্য হলো ভিউ, রিচ, ও অর্থনৈতিক লাভ।
মনোবিজ্ঞানী, শিশু অধিকারকর্মী ও আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি শুধু বিনোদনের বিষয় নয়; বরং শিশুদের মানসিক বিকাশ, সামাজিক আচরণ এবং ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য তৈরি করছে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি।
প্রেম, আত্মহত্যা আর প্রাপ্তবয়স্ক সম্পর্কের অভিনয়ে শিশুরা
শুধু সহিংসতা নয়, প্রেম, প্রতারণা এবং আত্মহত্যার মতো ঘটনাও শিশুদের অভিনয়ের মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
'দেখার ঝলক (Dekhar jholog)' নামের একটি ফেসবুক পেজের এক ভিডিওতে দেখা যায়, একটি ছেলে (শিশু) বিয়ে করছে। ঠিক তখন আরেকটি মেয়ে (শিশু) এসে দাবি করে, তার সঙ্গে প্রেম করার পর অন্য কাউকে বিয়ে করা সে মেনে নেবে না। কথায় কথায় উত্তেজিত হয়ে মেয়েটি নিজের হাতের রগ কেটে আত্মহত্যা করার অভিনয় করে।
ভিডিওটি ৭০ লাখের বেশি ভিউ এবং ১ লাখ ৭৭ হাজার লাইক পেয়েছে। যদিও এটি পশ্চিমবঙ্গের একটি পেজ, তবু ভারতের সীমানা ছাড়িয়ে বাংলাদেশের অনেক দর্শকের কাছে এটি পৌঁছে গেছে। সেখানে বাংলাদেশের অনেক ব্যবহারকারী মন্তব্য করেছেন। একই পেজে প্রেম, ভালোবাসা, প্রতারণা ও সম্পর্কভিত্তিক আরও বহু ভিডিওতে শিশুদের ব্যবহার করা হয়েছে।
একই ধরনের কনটেন্ট প্রকাশ করছে 'ইফতা ভাও' নামের একটি পেজ। সেখানে কোনো ভিডিওতে শিশুদের স্বামী-স্ত্রী, আবার কোনো ভিডিওতে প্রেমিক-প্রেমিকার চরিত্রে অভিনয় করানো হয়েছে। এসব ভিডিওর বেশ কয়েকটি ভিডিও মিলিয়ন মিলিয়ন ভিউ অর্জন করেছে।
শিশুদের মানসিক বিকাশের জন্য যে বয়সে খেলাধুলা, শিক্ষা ও সামাজিক দক্ষতা গড়ে ওঠার কথা, সে সময়েই তারা বড়দের সম্পর্ক, প্রতারণা কিংবা আত্মবিধ্বংসী আচরণের অভিনয়ে অংশ নিচ্ছে।
ব্যস্ত সড়কে শিশুর হাতে স্টিয়ারিং
শুধু নাটকীয় অভিনয় নয়, বিপজ্জনক বাস্তব কর্মকাণ্ডও এখন কনটেন্টে রূপ নিচ্ছে।
'তাজওয়ার'স ড্রাইভিং স্টোরি' নামে একটি ফেসবুক পেজে দেখা যায়, একটি শিশু ঢাকার ব্যস্ত সড়কে প্রাইভেট কার চালাচ্ছে। কোনো ভিডিওতে সে এক হাতে গাড়ি চালাচ্ছে, কোথাও আবার অন্য শিশুদের নিয়ে রাস্তায় গাড়ি চালাচ্ছে। এমনকি একটি ভিডিওতে মূল সড়কের সেতুর ওপর গাড়ি ঘোরানোর দৃশ্যও রয়েছে।
পেজটিতে থাকা প্রতিটি ভিডিওই হাজার হাজার মানুষ দেখেছেন। এর মধ্যে একটি ভিডিও ৩৩ লাখের বেশি ভিউ পেয়েছে।
মন্তব্যের ঘরে অনেকেই এই কনটেন্টকে বিপজ্জনক বলে আখ্যায়িত করেছেন। কেউ কেউ বাংলাদেশ পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ট্যাগ করে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের ভিডিও শুধু সংশ্লিষ্ট শিশুকেই ঝুঁকির মধ্যে ফেলে না; বরং অন্য শিশুদের মাঝেও একই ধরনের কাজ অনুকরণ করার প্রবণতা তৈরি করতে পারে।
শিশুকে মাটিচাপা, কান্না আর 'সাবস্ক্রাইবার’ এর জন্য আকুতি
সহিংসতার মাত্রা আরও এক ধাপ ছাড়িয়ে যায় আরেকটি ভাইরাল ভিডিওতে। সেখানে দেখা যায়, এক যুবক হাতে কোদাল নিয়ে একটি কান্নারত শিশুকে টানতে টানতে নিয়ে যাচ্ছে। এরপর একটি নির্জন স্থানে দাঁড় করিয়ে কোদাল দিয়ে গর্ত খুঁড়তে শুরু করে। শিশুটি তার পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছিল, আর লোকটি বলতে থাকে, সৎ ভাইয়ের জ্বালা আর সহ্য হচ্ছে না।
গর্ত খুঁড়তে খুঁড়তে ক্লান্ত হয়ে পড়লে শিশুটি সাহায্য করতে চাইলে তাকে ধমক দিয়ে চুপ থাকতে বলা হয়। এরপর শিশুটিকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়, "তোমাকে আজ মাটি দিয়েই এখান থেকে যেতে হবে।"
শিশুটি গর্তে নামতে অস্বীকৃতি জানালে ভিডিওটির সবচেয়ে উদ্বেগজনক সংলাপটি আসে—"তুই না নামলে বন্ধুরা সাবস্ক্রাইব করবে না।"
এরপর জোর করে শিশুটিকে গর্তে নামিয়ে মাটি চাপা দেওয়ার অভিনয় করা হয়। লোকটি বলতে থাকে, "সব ঝামেলা শেষ," এবং হাতের ইশারায় হত্যার সংকেত দেখায়। কিছুক্ষণ পর তার কল্পনায় দেখা যায়, শিশুটি এক বোতল পানি নিয়ে এসে বলছে, "ভাইয়া, তোমার মনে হয় পানির পিপাসা লাগছে, এই নাও পানি।" তখন তার অনুশোচনা হয় এবং সে গর্ত খুঁড়ে শিশুটিকে বের করে আনে।
ভিডিওটি ইউটিউবে প্রকাশের পর ৪ লাখ ৩০ হাজার লাইক এবং ৪৬৮টি মন্তব্য পায়। মন্তব্যের একটি অংশে দর্শকরা এমন কনটেন্ট নির্মাণের তীব্র সমালোচনা করেন।
ক্যামেরার সামনে শিশুদের ব্যক্তিগত জীবন
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরেকটি উদ্বেগজনক প্রবণতা হলো শিশুদের ব্যক্তিগত ও অপ্রস্তুত মুহূর্তকে কনটেন্টে পরিণত করা।
কোথাও দেখা যায়, একটি শিশু গোসল করছে—গায়ে কোনো পোশাক নেই। কোথাও শিশু খাবার খাচ্ছে, মুখ ও বুকজুড়ে খাবার লেগে আছে। আবার ঠান্ডায় আক্রান্ত শিশুর নাক পরিষ্কার করার দৃশ্যও প্রকাশ করা হচ্ছে। অনেক ভিডিওতে দেখা যায়, শিশু রান্না করছে আর সেই দৃশ্যকে ঘিরেই তৈরি হচ্ছে বিনোদনমূলক কনটেন্ট।
এসব ভিডিওর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শিশুর মুখ বা পরিচয় গোপন করার কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না।
এ ধরণের কিছু কন্টেন্ট দেখুন এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এবং এখানে।
শুধু দৈনন্দিন জীবনের দৃশ্য নয়, শিশুদের দিয়ে মিথ্যা বলা, বড়দের চরিত্রে অভিনয় করা, পারিবারিক কলহ, বিদ্বেষ কিংবা সহিংস আচরণও উপস্থাপন করা হচ্ছে।
শিশু ও ডিজিটাল রাইটস কর্মীরা মনে করছেন, যেহেতু শিশুরা নিজেরা এসব কনটেন্ট প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো বয়সে পৌঁছায়নি ফলে তাদের সম্মতি ছাড়াই তৈরি হয়ে যাচ্ছে একটি স্থায়ী ডিজিটাল পরিচয়, যা ভবিষ্যতে তাদের জন্য বিব্রতকর কিংবা ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে।
নির্বাচনের কন্টেন্ট তৈরিতে শিশুদের ব্যবহার
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারিত অনেক ভিডিওতে শিশুদেরকে ব্যবহার করা হয়েচে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), জামায়াতে ইসলামী, এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মতো প্রধান দলগুলোর প্রতিটির সমর্থনেই শিশুদের ব্যবহার দেখা গেছে। কোনটিতে শিশুরা কোন দলের সমর্থনে স্লোগান দিচ্ছে, আবার কোনটিতে বিপক্ষকে আক্রমণ করে কথা বলছে।
এ ধরণের ভিডিও দেখুন এখানে, এখানে, এবং এখানে।
বাংলাদেশের জাতীয় শিশু নীতি ২০১১-তে উল্লেখ করা হয়েছে, শিশুদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করা যাবে না এবং কোনো প্রকার প্রলোভন বা জোরজবরদস্তির মাধ্যমে তাদের রাজনীতিতে জড়িত করা নিষিদ্ধ।
অনুকরণপ্রিয় শিশুদের জন্য এসব ভিডিও বিপদ ডেকে আনতে পারে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দিন দ্য ডিসেন্টকে জানান, “শিশুদের দিয়ে সহিংস বা প্রাপ্তবয়স্ক বিষয়ভিত্তিক কনটেন্ট তৈরি এবং সেগুলো শিশুদের দেখার সুযোগ তৈরি হওয়া দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক আচরণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।”
তিনি বলেন, "শিশুরা অনুকরণপ্রিয়। ফলে তারা ভিডিওতে যা দেখে তা বাস্তব জীবনেও অনুকরণ করতে চায়। এতে করে ভিডিও থেকে যেসব হিংসা, বিদ্বেষ এবং হানাহানি দেখছে, তা তারা বাস্তব জীবনেও টেনে নিয়ে আসছে।"
তার মতে, শুধু শিশুরা নয়, অনেক অভিভাবকও সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে এসব কনটেন্ট দেখেন এবং অন্য শিশুদের উদাহরণ দিয়ে নিজের সন্তানকে তুলনা করেন।
"অনেক বাবা-মা বাচ্চাদের সঙ্গে নিয়ে এসব কনটেন্ট দেখে এবং বাচ্চার সামনে এর প্রশংসা করে। নিজের বাচ্চাকে বকাঝকা করে—'তুই কী করলি? ওরা তো এই করে ফেলল।' এতে বাচ্চারা প্রতিযোগিতায় নেমে যায়।"
ড. কামাল উদ্দিন বলেন, এই আচরণ ধীরে ধীরে সামাজিকভাবে স্বাভাবিক বা Norm-এ পরিণত হতে পারে।
"এটা একটা মডেলিং বিহেভিয়ার (Modeling behavior), অর্থাৎ একজনের বিহেভিয়ার আরেকজন মডেলিং হিসেবে নেয়। সে তাকে ফলো করে। এভাবে চক্রাকারে চলতে থাকে।"
এর প্রভাব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি সাম্প্রতিক একটি ঘটনার উদাহরণ দেন। তার ভাষায়, সম্প্রতি ঢাকার উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলে এক শিক্ষার্থীর অশোভন আচরণের ঘটনাকে তিনি সামাজিক অনুকরণের একটি উদাহরণ হিসেবে দেখেন।
তার মতে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শিশুদের দিয়ে কন্টেন্ট বানানোর প্রতিযোগিতা বন্ধ করতে সরকারের আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন।
"সরকারকে এ বিষয়ে এগিয়ে আসতে হবে। তারা এই ধরনের ঘটনায় একটা তদন্ত কমিটি করতে পারে। কী হচ্ছে, কোথায় কী হচ্ছে, সেগুলো নিয়ন্ত্রণের উপায় কী—এগুলো খুঁজে বের করা দরকার।"
শিশুদের নিয়ে তৈরি এসব কনটেন্টের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সেভ দ্য চিলড্রেন-এর চাইল্ড প্রোটেকশন ইউনিটের পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন।
তিনি দ্য ডিসেন্টকে বলেন, "এগুলো শিশুদের উপরে অবশ্যই নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং সেই প্রভাবটা সুদূরপ্রসারী হয়। বিশেষত তার মনস্তাত্ত্বিক এবং সামাজিক বিকাশের ক্ষেত্রে এটা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।"
কেন এটি ঝুঁকিপূর্ণ—তার ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, "শিশুরা দর্শক হিসেবে যদি প্রথমে সেগুলো দেখে, খুন-খারাবি বা অন্যান্য বিষয়গুলোকে সে খুব স্বাভাবিকভাবে ধরে নেয়। ফলে সে বোঝে না যে কোনটা অভিনয় আর কোনটা বাস্তব।"
তিনি আরও বলেন, "সে নিজে যদি এখানে অভিনয় করে বা তাকে দিয়ে করানো হয়, তাহলে এটা আরো ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে। সকল ধরনের সহিংসতা তার কাছে মনে হবে স্বাভাবিক, গালিগালাজগুলো মনে হবে স্বাভাবিক এবং এইটাকে নিয়েই বেড়ে উঠবে। তার মনে সহমর্মিতা বা অন্যদের জন্য সংবেদনশীলতা—এটা থাকবে না।"
শিশুদের দিয়ে বড়দের সম্পর্ক, পারিবারিক দ্বন্দ্ব কিংবা রাজনৈতিক বক্তব্য বলানোর প্রবণতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
"শিশুকে দিয়ে অনেকে মজার জন্য কিংবা ভিউ বাড়ানোর জন্য এমন এমন কনটেন্ট বানাচ্ছে যেগুলো আসলে শিশুসুলভ নয়। বড়দের কথা—সেটা রাজনৈতিক হতে পারে, সামাজিক হতে পারে কিংবা পারিবারিক কলহের বিষয়ও হতে পারে—বলানো হচ্ছে, যেটা শিশুকে অকাল পরিপক্ব করে তুলছে।"
তার মতে, এসব কনটেন্ট ভবিষ্যতে শিশুর সামাজিক বিকাশে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে থেকে যায় ডিজিটাল ফুটপ্রিন্টের ঝুঁকিও।
"একজন শিশু অবুঝ অবস্থায় তাকে দিয়ে যে ধরনের কনটেন্ট বানানো হয়, বড় হয়ে যখন সেগুলো সে দেখে, সেটা তার জন্য তার পছন্দের নাও হতে পারে কিংবা তার দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে অমিলও থাকতে পারে।"
অনুকরণ প্রবণতার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, "একটা বিপজ্জনক ড্রাইভিং, মোটরসাইকেলের স্টান্ট কিংবা গোলাগুলির দৃশ্য দেখে সে সেটা অনুকরণ করার চেষ্টা করবে এবং সেটা তার জন্য বিপজ্জনক হয়ে যাবে।"
তার ভাষায়, সবচেয়ে বড় সংকট হচ্ছে শৈশবের বাণিজ্যিকীকরণ।
"বাবা-মা বা কনটেন্ট ক্রিয়েটররা যখন শৈশবকে বাণিজ্যিকীকরণ করে—বুঝে করুক বা না বুঝে করুক—তখন শুধু শিশুর ভবিষ্যৎই ঝুঁকিতে পড়ে না, সমাজের স্বাভাবিক সাংস্কৃতিক বিকাশও বাধাগ্রস্ত হয়।"
সমাধানের বিষয়ে তিনি বলেন, আইনের প্রয়োগের পাশাপাশি অভিভাবকদের সচেতনতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
"আইনি পদক্ষেপের চাইতেও বেশি প্রয়োজন বাবা-মা বুঝতে পারছে কিনা কোন কনটেন্টটা শিশুকে দেখানো যাবে, কোন কনটেন্টটা দেখানো যাবে না।"
তার মতে, প্রযুক্তিগত সুরক্ষা—যেমন প্যারেন্টাল কন্ট্রোল, ফিল্টারিং টুল ব্যবহার—এবং শিশুদের জন্য সৃষ্টিশীল বিকল্প তৈরি করাও সমান জরুরি।
একাধিক অভিভাবকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, কেউ কেউ বিষয়টিকে অত গুরুত্ব দিয়ে চিন্তা করেননি। তবে প্রায় বেশিরভাগ অভিভাবক বুঝতে পারেন যে স্যোশাল মিডিয়ার অনেক কন্টেন্টই শিশুদের জন্য নেতিবাচক শিক্ষা দিচ্ছে। তবে কিছু ভালো কন্টেন্টও রয়েছে যেগুলো শিক্ষামূলক, সেখান থেকে শিশুরা ভালো অনেক কিছুই শিখতে পারে।
তবে অভিভাবকরা সবচেয়ে বেশি চিন্তিত শিশুদের বিকল্প বিনোদন মাধ্যম নিয়ে। সোহেলি চৌধুরী নামের একজন দুই শিশুর জননী বলেন, শিশুরা স্কুল শেষ করার পর তাদের বিনোদন দরকার তার সুযোগ ঢাকা শহরে খুবই কম। আশে পাশে কোথাও মাঠের ব্যবস্থা নেই। খেলতে হলে অনেক দূরে যেতে হয়। ফলে বাধ্য হয়ে বাচ্চাদেরকে টেলিভিশন বা স্যোশাল মিডিয়া কন্টেন্ট দেখতে দিতে হয়।
আইন কী বলে?
শিশুদের নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও সহিংস কনটেন্ট তৈরির ঘটনা বাড়লেও, বাংলাদেশে এখনো শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার বা কনটেন্টে অংশগ্রহণের বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো বয়সভিত্তিক একক আইন নেই।
তবে বিদ্যমান বিভিন্ন আইন ও নীতিমালায় শিশুদের সুরক্ষার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
শিশু আইন, ২০১৩ শিশুদের সব ধরনের শোষণ থেকে সুরক্ষার আইনি ভিত্তি দেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে শিশুদের দিয়ে কনটেন্ট তৈরি করানো বা তাদের "ডিজিটাল চাইল্ড লেবার"এর অংশে পরিণত করাও এই সুরক্ষার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
ডিজিটাল অপরাধের ক্ষেত্রে সাইবার সেফগার্ড অর্ডিন্যান্স, ২০২৫-এ শিশুদের যৌন নিপীড়নমূলক কনটেন্ট (CSAM), সাইবার বুলিং, সেক্সটর্শন ও রিভেঞ্জ পর্নের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
এদিকে ১৬ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ করার দাবিতে সম্প্রতি সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও বিটিআরসিকে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে। জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা এজেন্সিও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার আলোকে এ ধরনের নীতিমালার বিষয়টি বিবেচনার কথা জানিয়েছে।
জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সির পরিচালক মো. হোসেন বিন আমিন দ্য ডিসেন্টকে জানান, “সরকার অনেক ধরনের এওয়ারনেস ক্যাম্পেইন পরিচালনা করে যেন মানষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হয়। এজন্য আমরা অনেক সময় বিভিন্ন ধরণের প্রোগ্রামও করে থাকি। এরপরেও কোনো নাগরিক যদি আমাদের কাছে কোনো কন্টেন্ট, কোনো লিংক দিয়ে আবেদন করে আমরা সাহায্য করে থাকি। তাছাড়া ইন্টারন্যাশনাল যে প্লাটফর্মগুলো আছে, সেগুলো আমাদের কাছে কন্ট্রোল নাই। আমরা শুধু রিকোয়েস্ট করতে পারি। সাইবার বুলিংয়ে যারা মহিলা অথবা যারা শিশু তাদের বিষয়ে কিছু জানালে তারা খুব দ্রুত প্রম্পট অ্যাকশন নেয়। আমরা চেষ্টা করতেছি যে এইসব মিডিয়াগুলোর সঙ্গে যাতে কিছু জানানোর সঙ্গে সঙ্গে অ্যাকশন নেওয়া যায়। আমাদের এখন যে সময়টা লাগে সেটাকে যাতে আরও খুব কম সময়ে আমরা নিয়ে আসতে পারি।”
সাইবার নিরাপত্তা আইন যেটা ২০২৩ এর ২৫ ধারায় বলা আছে, যদি কেউ জ্ঞাতসারে করে বা কেউ যদি অজ্ঞাতসারেও করে, সেক্ষেতেও শাস্তির বিধান রয়েছে।
শিশুদের ডিজিটাল সুরক্ষায় অভিভাবকদের করণীয়
বাংলাদেশে শিশুদের সাইবার অপরাধের হাত থেকে বাঁচাতে এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনি প্রতিকার ও প্রযুক্তিগত সুরক্ষা উভয় দিকই সমান গুরুত্বপূর্ণ। কোনো শিশু যদি অনলাইনে বডি শেমিং, হুমকি বা আপত্তিকর মেসেজের শিকার হয়, তবে সাইবার সেফগার্ড অর্ডিন্যান্স, ২০২৫ (সাবেক সাইবার নিরাপত্তা আইন)-এর অধীনে সরাসরি মামলা করা যায়। শিশুর কোনো ছবি এডিট করে বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে ডিপফেক বানিয়ে ব্ল্যাকমেইল করলে পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১২ অনুযায়ী অপরাধীকে কঠোর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়া হয়।
প্রযুক্তিগতভাবে শিশুদেরকে নিয়ন্ত্রণ করতে প্যারেন্টাল কন্ট্রোল অ্যাপ ও প্রযুক্তিগত সুরক্ষার জন্য Google Family Link ব্যবহার করা যায়। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি এবং কার্যকর। এর মাধ্যমে অভিভাবকরা শিশুর ফোনে কোন অ্যাপ থাকবে তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, স্ক্রিন টাইম (ফোন ব্যবহারের সময়) বেঁধে দিতে পারেন এবং শিশু লাইভ কোথায় আছে তা ট্র্যাক করতে পারেন।
এছাড়া সাধারণ ইউটিউবের বদলে শিশুদের 'ইউটিউব কিডস' অ্যাপ ব্যবহার করতে দেয়া যায়। এছাড়া মূল ইউটিউব অ্যাপের সেটিংসে গিয়ে Restricted Mode অন করে দিলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বড়দের বা ক্ষতিকর কনটেন্ট ব্লক হয়ে যায়। পাশাপাশি বাসার ইন্টারনেট রাউটারের সেটিংস পেজে গিয়ে 'Parental Controls' অপশনটি চালু করে নির্দিষ্ট কিছু ওয়েবসাইট বা অ্যাডাল্ট কি-ওয়ার্ড স্থায়ীভাবে ব্লক করে দেওয়া যায়। এতে ওই ওয়াইফাইয়ের অধীনে থাকা কোনো ফোনেই ক্ষতিকর সাইট খুলবে না।
অভিযোগ জানানো যায় যেভাবে:
সরাসরি ফোন করা যায় সরকারের ১০৯ (শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ) বা ৯৯৯ নম্বরে।সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিভিশন (পুলিশ): ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (DMP) সাইবার ক্রাইম ইউনিটের ফেসবুক পেজে বা সরাসরি মিন্টো রোডের অফিসে গিয়ে লিখিত অভিযোগ দেওয়া যায়।অনলাইন পোর্টাল: সরকারের 'সাইবার হেল্পডেস্ক' বা cybersafe.gov.bd পোর্টালে গিয়ে ঘরে বসেই পরিচয় গোপন রেখে অভিযোগ করা সম্ভব।
শিশুদের ডিজিটাল নিরাপত্তায় কঠোর হচ্ছে বিশ্ব
শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য, সাইবার নিরাপত্তা এবং ক্ষতিকর ডিজিটাল কনটেন্টের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে বিশ্বজুড়ে। এর প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন দেশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার, বয়স যাচাই, প্যারেন্টাল কন্ট্রোল এবং অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন আইন ও নীতিমালা গ্রহণ করছে।
২০২৬ সালের জুনে সংযুক্ত আরব আমির নতুন নীতিমালা ঘোষণা করেছে। যেখানে ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক, এক্স (সাবেক টুইটার) এবং স্ন্যাপচ্যাটের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যাকাউন্ট খোলা ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া ১৫–১৬ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে ক্ষতিকর কনটেন্ট স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্লক এবং প্যারেন্টাল কন্ট্রোল বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। (সূত্র:Khaleej Times, Gulf News)
অস্ট্রেলিয়ার পার্লামেন্ট ২০২৪ সালে একটি আইন পাস করা হয়। এর মাধ্যমে ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ করার বিধান রাখা হয়েছে। (সূত্র: Australian Parliament (aph.gov.au))
যুক্তরাষ্ট্রে ওহাইও অঙ্গরাজ্যে আইন অনুযায়ী, ১৬ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যাকাউন্ট খুলতে অভিভাবকের অনুমতি প্রয়োজন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর শিশুদের জন্য ক্ষতিকর কনটেন্ট কমানো এবং নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা রয়েছে।
এছাড়া স্পেন (১৬ বছরের কম), ফ্রান্স ও ডেনমার্ক (১৫ বছরের কম) এবং অস্ট্রিয়া (১৪ বছরের কম বয়সীদের জন্য) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বয়সসীমা নির্ধারণ বা সংশ্লিষ্ট আইনি খসড়া নিয়ে কাজ করছে।
অন্যদিকে জাপান ডিজিটাল আইডি ব্যবস্থার মাধ্যমে বয়স যাচাই প্রক্রিয়া আরও শক্তিশালী করেছে।