Image description

চুক্তিপাঠ বিদায় হওয়ার কথা, অর্থাৎ চুক্তি শেষ, চাকরিও শেষ। কিন্তু সেটি ঘটেনি বিমানের উপমহাব্যবস্থাপক মো. আশরাফুল আলমের বেলায়। চুক্তিভিত্তিক চাকরিটাকেই স্থায়ী চাকরিতে রূপ দিয়েছেন তিনি, যা বিধিবিধানের আওতায় পড়ে না।

বিশেষ ব্যবস্থার চাকরিতে যোগ দেওয়ার সময় আশরাফুল আলমের বয়স ছিল ৪১। তিন বছর পর বাড়িয়েছেন আরও এক বছর, অর্থাৎ চার বছর চুক্তির চাকরি শেষ করতে করতে তার বয়স হয়ে যায় ৪৫। ওই বয়সে স্থায়ী চাকরির কোনো সুযোগই নেই। কারণ, চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩০ বছরে নির্ধারিত। এত নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে চাকরিতে থাকা আশরাফুলের হয়েছে এক দফা পদোন্নতিও। আবারও পদোন্নতির ফুল ফুটছে।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের অভ্যন্তরে জারি করা একটি চিঠি ইঙ্গিত দিচ্ছে— বিষয়টি কেবল একজনকে ঘিরেই সীমাবদ্ধ নয়; পদোন্নতির অংশ হিসেবে ওই চিঠিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোনো বিভাগীয় অভিযোগ বা আদালতে মামলা রয়েছে কি না, সে বিষয়ে তথ্য চাওয়া হয়েছে। এই তথ্য চাওয়া হয় পদোন্নতির বেলায়। এ প্রক্রিয়ায় আশরাফুল আলম ছাড়াও মোট ১৬ কর্মকর্তা অন্তর্ভুক্ত।

 

 

জন্ম তারিখ অনুযায়ী ঠিক ৪১ বছর বয়সে ২০১৮ সালের ১ জুলাই মোহাম্মদ আশরাফুল আলম (জি-৫১২০০) ব্যবস্থাপক অর্থ (অ্যাকাউন্টস) পদে যোগ দেন। সর্বসাকল্যে মাসিক বেতন নির্ধারণ হয় ১ লাখ ১০ হাজার টাকা। যার মধ্যে মূল বেতন ৪৯ হাজার ৮৮০ টাকা এবং বাড়িভাড়া (মূল বেতনের ৫০%) ২৪ হাজার ৯৪০ টাকা। তিন বছর মেয়াদি চুক্তি পূর্ণ হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ২০২১ সালের ৯ মে তাকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ থেকে অবসান দেখানো হয়। তবে এর মাত্র কয়েক দিন পর ১৬ মে পুনরায় এক বছরের জন্য চুক্তি বাড়ানোর আবেদন করেন। পরে বিমান কর্তৃপক্ষ ১ জুলাই ২০২১ থেকে ৩০ জুন ২০২২ পর্যন্ত এক বছরের নতুন করে ডিড অব অ্যাগ্রিমেন্ট সম্পাদন করে। নতুন চুক্তিপত্রে তার মাসিক বেতন নির্ধারণ হয় ১ লাখ ২১ হাজার ৭৯৩ টাকা। যার মধ্যে মূল বেতন ৫৭ হাজার ৭৪২ টাকা, বাড়িভাড়া ২৮ হাজার ৮৭১ টাকা এবং অন্যান্য ভাতা ৩৫ হাজার ১৮০ টাকা অন্তর্ভুক্ত ছিল; যা আগের নিয়োগপত্রের তুলনায় বেশি।

চুক্তি অবসানের পর নিজেই স্থায়ীকরণের জন্য আবেদন করেছিলেন বলেও নথিতে উল্লেখ রয়েছে। সেই আবেদনের ভিত্তিতেই ব্যবস্থাপক অর্থ (অ্যাকাউন্টস) পদে তার স্থায়ী চাকরি হয়, যা পুরো প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
চাকরির ধারাবাহিকতায় ২০২৩ সালের ৯ আগস্ট তাকে ‘উপমহাব্যবস্থাপক হিসাব’ পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। ২০১৮ সালে চুক্তিভিত্তিক যোগদানের মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে এই পদোন্নতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

চাকরির এই অদ্ভুত জার্নিটা আগামীর সময়ের প্রতিবেদক জানতে চেয়েছিলেন মোহাম্মদ আশরাফুল আলমের কাছে। তিনি ঠেলে দিলেন কর্তৃপক্ষের দিকে, ‘আমার নিয়োগ, চুক্তি ও স্থায়ীকরণ-সংক্রান্ত তথ্য একমাত্র জানাতে পারে বিমানের মানবসম্পদ (এইচআর) ও প্রশাসন (অ্যাডমিন) বিভাগ। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।’
রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি নিয়োগের বিষয়ে সরকারি চাকরির নিয়ম অনুসরণ করে। সে হিসেবে বিমানে চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩০ বছর। কিন্তু আশরাফুলের এই ব্যতিক্রমী নিয়োগ কোন বিধানের আওতায় দেওয়া হয়েছে— তা স্পষ্ট নয়। তার কোনো ব্যাখ্যাও দিতে আগ্রহী না বিমান।

 

 

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) সৈয়দ মইনুদ্দিন আহমেদ জানান, তিনি একটি বৈঠকে রয়েছেন। পরে যোগাযোগ করতে অনুরোধ করেন। তবে পরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

প্রশাসনবিষয়ক বিশ্লেষক ও সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার বললেন, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দীর্ঘদিনের প্রচলিত একটি প্রক্রিয়া এবং এটি নতুন কিছু নয়। তবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ থেকে স্থায়ীকরণ করা হয় না। বিশেষ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ১০ শতাংশ কোটার আওতায় আত্তীকরণের সুযোগ থাকতে পারে।

বিমানে কী প্রক্রিয়ায় স্থায়ীকরণ করা হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। তার ভাষায়, ‘যদি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ওই ক্ষেত্রের এক্সপার্ট হন, তাহলে কিছু আইনি বা নীতিগত সুযোগ থাকতে পারে। তবে কী কারণে নির্ধারিত বয়সের বাইরে গিয়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হলো, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।’

আবদুল আউয়াল বলেন, ‘যদি সবকিছু নিয়ম মেনে হয়ে থাকে, তাহলে সেটি এক বিষয়; আর যদি প্রভাব খাটিয়ে করা হয়ে থাকে, তাহলে সেটি ভিন্ন বিষয়।’ এ ধরনের ঘটনা শুধু বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসেই নয়, অন্য আরও অনেক প্রতিষ্ঠানে এমনটি ঘটে থাকতে পারে বলেও ধারণা তার।

নিয়োগ থেকে স্থায়ীকরণ হয়ে পদোন্নতি পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি এখন প্রশ্নের মুখে। এটি কি নিয়মের ব্যতিক্রম, নাকি নীতিমালার মধ্যেই নেওয়া বিশেষ সিদ্ধান্ত— তা পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।