Image description

মুফতি সাইফুল ইসলাম

জীবনের কঠিন মুহূর্তে মানুষ কখনো কখনো এমন বিপদ, দুঃখ বা হতাশার মুখোমুখি হয় যে, তার মনে মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষা জাগে। কেউ অসুস্থতায়, কেউ দারিদ্র্যে, কেউ প্রিয়জন হারানোর বেদনায় কিংবা দীর্ঘ সংকটে পড়ে নিজের মৃত্যু কামনা করে থাকে। কিন্তু ইসলাম মানুষের এই মানসিক অবস্থার প্রতিও দিকনির্দেশনা দিয়ে বলে যে, জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে আল্লাহর পক্ষ থেকে অর্পিত একটি আমানত। কাজেই ইসলাম সংকটে ধৈর্য ধারণ করে আশা ও তওবার পথে নিজেকে পরিচালিত করতে উদ্বুদ্ধ করেছে।

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কোনো ব্যক্তিকে তার নেক আমল জান্নাতে প্রবেশ করাতে পারবে না।’ সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আপনাকেও নয়?’ তিনি বললেন, আমাকেও নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ আমাকে তাঁর করুণা ও দয়া দিয়ে আবৃত না করেন। কাজেই মধ্যমপন্থা গ্রহণ কর, আল্লাহর নৈকট্য লাভের চেষ্টা চালিয়ে যাও। আর তোমাদের মধ্যে কেউ যেন মৃত্যু কামনা না করে। কেননা, সে ভালো লোক হলে তার নেক আমল বৃদ্ধি হতে পারে, আর খারাপ লোক হলে সে তওবা করার সুযোগ পাবে।’ (বুখারি, হাদিস : ৫৬৭৩)

এই হাদিসে একদিকে যেমন জান্নাতে প্রবেশের মূল ভিত্তি হিসেবে আল্লাহর রহমতের কথা বলা হয়েছে, অন্যদিকে মৃত্যু কামনা থেকে বিরত থাকার গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একজন মুমিন জানেন, যতক্ষণ জীবন আছে ততক্ষণ ইবাদত, দান-সদকা, মানুষকে উপকার করা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের সুযোগ রয়েছে। তাই জীবনকে শেষ করে দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা নয়, বরং জীবনকে আরও অর্থবহ করার চেষ্টা করা একজন বিশ্বাসীর দায়িত্ব।

রাসূলুল্লাহ (সা.) অন্য এক হাদিসে আরও স্পষ্টভাবে বলেছেন, তোমাদের কেউ যেন কোনো বিপদে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু কামনা না করে। যদি একান্তই বলতে হয়, তবে সে যেন বলে, ‘হে আল্লাহ! যতদিন আমার জন্য জীবন কল্যাণকর, ততদিন আমাকে জীবিত রাখুন এবং যখন মৃত্যু আমার জন্য কল্যাণকর হবে, তখন আমাকে মৃত্যু দিন।’ (বুখারি, হাদিস : ৬৩৫১)

ইসলাম মানুষের কষ্টকে অস্বীকার করে না। বরং সেই কষ্টের মধ্যেও আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে শেখায়। কারণ মানুষ জানে না তার জন্য কোনটি উত্তম। যে ব্যক্তি আজ বিপদে আছে, আল্লাহ চাইলে আগামীকাল তার অবস্থার পরিবর্তন করে দিতে পারেন। আবার যে ব্যক্তি পাপে নিমজ্জিত, তার জন্য একটি আন্তরিক তওবাই হতে পারে মুক্তির পথ।

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘তোমরা নিজেদেরকে হত্যা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ২৯) এই আয়াত আত্মবিনাশের সব পথ থেকে দূরে থাকার শিক্ষা দেয় এবং মানুষের জীবনের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করে।

তবে মুসলিম স্কলারগণ বলেছেন, যদি কোনো ব্যক্তি নিজের ব্যক্তিগত কষ্টের কারণে নয়, বরং দ্বীনের ওপর ভয়াবহ ফিতনা ও ঈমান নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় মৃত্যু কামনা করে, তাহলে বিষয়টি ভিন্ন প্রসঙ্গ। তবে এটিও সাধারণ মানুষের জন্য অনুসরণীয় নয়। নবী (সা.)-এর শিক্ষা হলো, আল্লাহর কাছে কল্যাণকর জীবন ও কল্যাণকর মৃত্যুর দোয়া করা।

আজকের পৃথিবীতে মানসিক চাপ, হতাশা ও অনিশ্চয়তা বেড়েছে। তাই একজন মুসলিমের উচিত বিপদের সময় মৃত্যু কামনা না করে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করা, ধৈর্য ধারণ করা, নামাজ, দোয়া ও জিকিরে নিজেকে দৃঢ় রাখা এবং প্রয়োজন হলে বিশ্বস্ত মানুষ ও বিশেষজ্ঞের সহযোগিতা নেওয়া। কারণ জীবনের প্রতিটি অতিরিক্ত দিন একজন সৎ মানুষের মর্যাদা বৃদ্ধি করতে পারে, আর একজন গুনাহগারের জন্য হতে পারে তওবা ও ক্ষমা লাভের অমূল্য সুযোগ।

মুমিনের দৃষ্টিতে জীবন আল্লাহর দান, আর মৃত্যু তাঁরই নির্ধারিত সময়ের অপেক্ষা। তাই মৃত্যু কামনা নয়, বরং আল্লাহর রহমতের আশায় সৎ আমল, ধৈর্য এবং তওবার মাধ্যমে জীবনকে সফল করে তোলাই ইসলামের শিক্ষা।

লেখক : আলেম ও সাংবাদিক