Image description

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কয়েক বছর ধরেই সংকোচনমূলক নীতি মেনে চলছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কিন্তু তাতেও কাজ হচ্ছে না, কমছে না দ্রব্যমূল্য। উল্টো গত মে মাসেও মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ রেকর্ড গড়েছে। মূল্যস্ফীতির যখন এই অবস্থা, তখন বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি গিয়ে ঠেকেছে তলানিতে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছে আগামীর সময়। তারা বলছেন, মূলত মধ্যপ্রাচ্যের ইরান সংকট, সরকারের লক্ষাধিক কোটি টাকার অর্থায়ন স্কিম, দুর্বল ব্যাংকে তারল্য সহায়তা এবং বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ডলার কেনায় বাজারে টাকার সরবরাহ বেড়েছে। এতে মুদ্রানীতির হাতিয়ার হিসেবে খ্যাত নীতি সুদহার হ্রাস-বৃদ্ধি কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। নীতি সুদহার হলো সেই সুদহার, যা অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংক তফসিলি ব্যাংকগুলোকে স্বল্প সময়ের জন্য ঋণ দেয়। দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বাংলাদেশ ব্যাংক বিদ্যমান এই নীতি সুদহার ১০ শতাংশ অপরিবর্তিত রাখতে চায়। আর সেটি রেখেই আজ মঙ্গলবার ঘোষিত হতে যাচ্ছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসের (জুলাই-ডিসেম্বর) মুদ্রানীতি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল কাজ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ঋণপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ ও সামষ্টিক অর্থনীতিকে সহায়তা। পাশাপাশি ঋণ সুদহার বাড়িয়ে বাজারে টাকার (মুদ্রার) সরবরাহ কমানো। বর্তমানে নীতি সুদহার ১০ শতাংশ। কিন্তু এরপরও দ্রব্যের মূল্য কমছে না। গত মে মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। আর প্রস্তাবিত আগামী বাজেটে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ, যা বাস্তবায়ন কঠিন। একই সঙ্গে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। এই প্রবৃদ্ধিও অর্জন করা হবে না— বলছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকসংশ্লিষ্টরা। তবে তারা এটাও জানালেন, মুদ্রানীতিতে এই দুটি লক্ষ্য সমন্বয় করা হচ্ছে। এ ছাড়া ইরান সংকটে বারবার জ্বালানি ও বিদ্যুতের দামবৃদ্ধি, বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে অব্যাহতভাবে কয়েক বিলিয়ন ডলার কেনায় বাজারে টাকা ছাড়া, দুর্বল ব্যাংকে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা তারল্য সহায়তা এবং সরকারের প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকার বিভিন্ন অর্থায়ন স্কিমে বাজারে টাকার ছড়াছড়ি দেখা দিয়েছে। এটি শুধু সুদের হার হ্রাস-বৃদ্ধি করে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।

বাংলাদেশ ব্যাংক গতকাল জানায়, গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান আজ বিকাল ৩টায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসের (জুলাই-ডিসেম্বর) মুদ্রানীতি ঘোষণা করবেন। এরই মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় অনুমোদন পেয়েছে নতুন মুদ্রানীতি।

তথ্য বলছে, নতুন অর্থবছরের বাজেটে সরকার গড় মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাসে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ, যা ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির পর সর্বোচ্চ। টানা দুই মাস ধরে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে রয়েছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, আমদানিনির্ভর দেশে মূল্যস্ফীতি মূলত পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থার সংকটের (সাপ্লাই-সাইড প্রেশার) কারণে তৈরি হয়। তাই এককভাবে মুদ্রানীতি দিয়ে তা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। পণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন, স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন, আমদানি-ব্যয় বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ বাজারের অদক্ষতাই মূল্যস্ফীতি উসকে দেওয়ার পেছনে দায়ী।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কয়েকটি সূত্র বলছে, নতুন অর্থবছরের বড় বাজেট এবং প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা কর্মসূচির কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আসার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে একই সঙ্গে বাজারে চাহিদা ও অর্থপ্রবাহ বাড়লে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি হতে পারে। আবার বিভিন্ন স্কিমের অধীন প্রায় এক লাখ কোটি টাকার বেশি অর্থায়ন প্রকল্প চালু রয়েছে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক ড. এজাজুল ইসলাম আগামীর সময়কে বললেন, ‘বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির পরিস্থিতিতে নীতি সুদহার কমিয়ে আরও সম্প্রসারণমূলক অবস্থানে যাওয়া সমীচীন হবে না। সম্প্রসারণমুখী রাজস্বনীতির পাশাপাশি সহজ মুদ্রানীতি গ্রহণ করা হলে মূল্যস্ফীতির ওপর আরও চাপ সৃষ্টি হতে পারে। এ কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আপাতত সতর্ক বা ধীরে চলো নীতি অনুসরণ করতে পারে। ফলে আসন্ন মুদ্রানীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম। আর বিনিয়োগ বাড়াতে সরকার যে পদক্ষেপ নিয়েছে, তা বিবেচনায় নিয়ে সামষ্টিক অর্থনীতিকে সহায়তা করতে হবে।’

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ২০২২ সালের শেষ দিক থেকে নীতি সুদহার বাড়াতে শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০২৪ সালে পুরোপুরি সংকোচনমূলক মুদ্রানীতিতে যায় এবং নীতি সুদহার বাড়িয়ে ১০ শতাংশে উন্নীত করে। সর্বশেষ গত ফেব্রুয়ারিতে ঘোষিত মুদ্রানীতিতেও নীতি সুদহার ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়। চলতি বছর প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার কেনা হয়েছে। দুর্বল ব্যাংকগুলোকে দেওয়া হয় প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা।