Image description

কোনো সামরিক জোট বা প্রতিরক্ষা ব্লকে যোগ না দিয়ে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে দেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থরক্ষা করার নীতি গ্রহণ করেছে নতুন বিএনপি সরকার। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একে বলা হচ্ছে ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’। এই নীতির মূল কথাই হলো—সবার সাথে বন্ধুত্ব রেখে দেশের উন্নয়ন নিশ্চিত করা।

 

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিভিন্ন বিদেশ সফর সরকারের এই মনোভাবকেই স্পষ্ট করেছে। দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে টেনে তুলতে তিনি এমন কিছু ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহযোগিতা চেয়েছেন, যা কোনো কোনো উন্নয়ন সহযোগীর কাছে কিছুটা সংবেদনশীল বা অস্বস্তিকর মনে হতে পারে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার যেমন জরুরি, ঠিক তেমনি বিশ্বের বড় বড় পরাশক্তিগুলোর মধ্যে একটি নিখুঁত ভারসাম্য বজায় রাখাও ঢাকার জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের সময় ঢাকা ও বেইজিং বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে একমত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বহুল আলোচিত তিস্তা মেগা প্রকল্প, দুই দেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের মধ্যে আলোচনার মেকানিজম চালু করা এবং মিয়ানমারের ওপর দিয়ে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে সরাসরি সড়ক বা রেল যোগাযোগ চালুর সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা।

এই বিষয়গুলোর সাথে ভূ-রাজনীতি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত। তবে সরকারের স্পষ্ট মনোভাব হলো, দেশের স্বার্থে কোন প্রকল্প নেওয়া হবে, তা বাংলাদেশ নিজেই ঠিক করবে। এখানে অন্য কোনো দেশের আপত্তি বা উদ্বেগকে প্রাধান্য দেওয়া হবে না।

উন্নয়ন সহযোগীদের সাথে সম্পর্ক জোরদার

দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বাংলাদেশের প্রধান প্রধান উন্নয়ন সহযোগী দেশগুলো সফর করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে ভারত, চীন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদর দফতর বেলজিয়াম। একই সঙ্গে ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র চার মাসের মাথায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফর প্রমাণ করে, সরকার বৈশ্বিক অংশীদারদের সাথে সম্পর্ক তৈরিতে কতটা তৎপর।

নতুন এই সরকার আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বেশ ভাল রাজনৈতিক সমর্থনও পাচ্ছে। তবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে দিল্লির কূটনৈতিক বার্তা ইতিবাচক হলেও বাস্তব কিছু ঘটনায় ঢাকা পুরোপুরি সন্তুষ্ট নয়। বিশেষ করে সীমান্ত হত্যা এবং পুশইন-এর মতো অমীমাংসিত সংবেদনশীল ইস্যুগুলো নিয়ে ঢাকার ভেতরে ক্ষোভ রয়েছে।

কী এই ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’?

সহজ কথায়, কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন হলো কোনো বিদেশি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে, নিজের দেশের স্বার্থ ও প্রতিরক্ষানীতি সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে পরিচালনা করার ক্ষমতা। বর্তমান সরকার মনে করে, বাংলাদেশের উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে সব দেশের সাথেই কাজ করতে হবে। তবে তা হতে হবে সম্পূর্ণ নিজেদের শর্তে ও স্বার্থে।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও তিস্তা প্রকল্প এবং মোংলা বন্দর সম্প্রসারণের জন্য চীনের সহায়তার কথা উঠেছিল। কিন্তু ভারতের তীব্র আপত্তির কারণে শেখ হাসিনা সরকার সেখান থেকে পিছিয়ে আসে। ২০২৪ সালে দিল্লি সফরের পর শেখ হাসিনা নিজেই গণমাধ্যমের সামনে বলেছিলেন, যেহেতু তিস্তার পানি ভারত নিয়ন্ত্রণ করে, তাই তিস্তা নদীর পানি ব্যবস্থাপনার কাজটি তিনি ভারতকেই দিতে চান। একইভাবে ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগের কথা মাথায় রেখে মোংলা বন্দরের কাজও চীনকে দেওয়া থেকে বিরত ছিল তৎকালীন সরকার।

তবে বর্তমান বিএনপি সরকার এই প্রকল্পগুলোকে জাতীয় উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য মনে করে। যেহেতু চীন এসব প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী, তাই সরকার বেইজিংয়ের সাথে কাজ করতে দ্বিধা করছে না। তবে সরকার এটিও সাফ জানিয়ে দিয়েছে, বাংলাদেশ কোনো সামরিক জোটে জড়াবে না এবং নিজের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখবে।

অংশীদারিত্ব ও ‘অভিন্ন ভবিষ্যৎ’

২০১১ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং যখন ঢাকা এসেছিলেন, তখন দুই দেশের মধ্যে একটি বড় চুক্তি হয়েছিল। সেখানে বলা হয়েছিল, পারস্পরিক উন্নয়ন ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার মাধ্যমে দুই দেশ ‘অংশীদারত্বমূলক ভবিষ্যৎ’ গড়ে তুলবে।

ঠিক ১৫ বছর পর, বাংলাদেশ ও চীনও এখন প্রায় একই ধরনের ভাষা ব্যবহার করছে। দুই দেশ এখন ‘অংশীদারত্বমূলক ভবিষ্যতের অভিন্ন সম্প্রদায়’ গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেছে, যা বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্কের গভীরতা প্রমাণ করে।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক জোরদার করতে এ ধরনের শব্দ বা স্লোগান খুবই সাধারণ বিষয়। তবে তারা সতর্ক করে বলেন, বড় দেশগুলোর এই লড়াইয়ের মাঝে বাংলাদেশকে খুব সাবধানে পা ফেলতে হবে। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই বাংলাদেশ কোনো নির্দিষ্ট একটি ব্লকের দিকে ঝুঁকে পড়ছে—এমন ধারণা তৈরি হতে দেওয়া যাবে না।

কারণ, অবকাঠামো ও বড় বড় প্রজেক্টে অর্থায়নের জন্য চীন যেমন জরুরি, তেমনি গভীর সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও সীমান্ত নিরাপত্তার কারণে প্রতিবেশী ভারতও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আবার অন্যদিকে, বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার এবং রাজনৈতিক অংশীদার হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন মানে কাউকে ছেড়ে কারও পক্ষে যাওয়া নয়। এর আসল অর্থ ভূ-রাজনৈতিক যুদ্ধ বা সামরিক জোটে পা না দিয়ে, দেশের প্রয়োজন অনুযায়ী সবার সাথে সুসম্পর্ক রাখা। ঢাকার মূল চ্যালেঞ্জ হলো, অন্য কোনো দেশের সাথে বিশ্বাস নষ্ট না করে কীভাবে সবার কাছ থেকে সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক সুবিধা আদায় করা যায়। কোনো পদক্ষেপ যেন এমন না হয় যা কোনো আঞ্চলিক শক্তির নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে। কারণ তা হলে দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশেরই কূটনৈতিক ক্ষতি হতে পারে।