নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতিতে এমনিতেই হাঁসফাঁস করছে সাধারণ মানুষ। এর মধ্যেই বাড়ে বিদ্যুতের দাম। ঠিক এমন সময় সরকারি দল বিএনপির মিডিয়া সেলের পক্ষ থেকে ঘোষণা আসে— প্রিপেইড বিদ্যুৎ মিটারের মাসিক ভাড়া আর দিতে হবে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিডিয়া সেলের দেওয়া ওই পোস্ট সরকারের দায়িত্বশীল অনেক ব্যক্তিও শেয়ার করেন। এমনকি খোদ বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীও প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের বরাতে এ-সংক্রান্ত পোস্ট দেন। এতে স্বস্তি ফিরেছিল লাখো গ্রাহকের মনে।
কিন্তু বাস্তবতা বলছে, জুন থেকে বাড়তি দামে বিদ্যুৎ কিনতে হলেও রিচার্জের সময় আগের মতোই কাটা হচ্ছে মিটারভাড়া, ডিমান্ড চার্জ ও ভ্যাট। ফলে ঘোষণার এক মাস পেরিয়ে গেলেও প্রতিশ্রুত স্বস্তি এখনো অধরাই রয়ে গেছে প্রায় ৫৫ লাখ প্রিপেইড মিটার গ্রাহকের জন্য।
গত ৩ জুন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা দেয়। ১ জুন থেকে নতুন বিদ্যুতের দাম কার্যকর হয়েছে ঠিকই; কিন্তু অতিরিক্ত মাসিক চার্জ প্রত্যাহারের ঘোষণা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি।
ফলে প্রিপেইড মিটারে রিচার্জ করতে গিয়ে আবারও ধাক্কা খাচ্ছেন গ্রাহকরা। বিদ্যুতের বাড়তি মূল্য তো দিতেই হচ্ছে, সেই সঙ্গে আগের মতোই কেটে নেওয়া হচ্ছে মিটারভাড়া, ডিমান্ড চার্জ এবং ভ্যাট। ফলে গ্রাহক যে পরিমাণ টাকা রিচার্জ করেন, তার পুরোটা বিদ্যুৎ হিসেবে ব্যবহার করতে পারছেন না।
বর্তমানে দেশে প্রায় ৫ কোটি বিদ্যুৎ গ্রাহক রয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ৫৫ লাখ গ্রাহক প্রিপেইড মিটার ব্যবহার করছেন। এই গ্রাহকদের প্রতি মাসে নির্ধারিত মিটারভাড়া, অনুমোদিত লোড অনুযায়ী ডিমান্ড চার্জ এবং ভ্যাট দিতে হয়। দীর্ঘদিন ধরেই এসব অতিরিক্ত চার্জ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আসছেন ভুক্তভোগীরা।
ঢাকার মিরপুর-১ নম্বরের বাসিন্দা সাদেকুর রহমান কামাল তাদেরই একজন। তিনি বলেছেন, ‘বিদ্যুতের দাম বাড়ার পর ১০ জুন ২ হাজার টাকা রিচার্জ করি। কিন্তু ভ্যাট, মিটারভাড়া আর ডিমান্ড চার্জ কেটে আমার মিটারে যোগ হয়েছে মাত্র ১ হাজার ৭০৬ টাকা। অর্থাৎ প্রায় ৩০০ টাকা বিভিন্ন খাতে কেটে নেওয়া হয়েছে।’ তার প্রশ্ন, ‘দ্রব্যমূল্যের এই ঊর্ধ্বগতির মধ্যে সরকারের ঘোষণায় কিছুটা স্বস্তি পেয়েছিলাম। কিন্তু রিচার্জ করার পর দেখলাম সব আগের মতোই আছে। শুধু বিদ্যুতের ইউনিট মূল্য বেড়েছে। তাহলে এমন ঘোষণা দেওয়া হলো কেন?’
নির্দেশনার অপেক্ষায় বিতরণ কোম্পানিগুলো: ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক (পরিচালন) জ্যোতিষ চন্দ্র রায় বলেছেন, ‘এ বিষয়ে আমরা এখনো কোনো সরকারি নির্দেশনা পাইনি। নির্দেশনা পেলেই তা কার্যকর করা হবে।’
দেশের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থা পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) আওতায় রয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ ৫৮ হাজার গ্রাহক। সংস্থাটির সদস্য (বিতরণ ও পরিচালন) মো. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘এ বিষয়ে আমি এখনই কিছু বলতে পারছি না। খোঁজ নিয়ে পরে জানাতে পারব।’
আর্থিক সংকটের কথা বলছে সরকার: বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, সরকার বিষয়টি নিয়ে আন্তরিকভাবে কাজ করছে। তবে এটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আর্থিক বিষয় জড়িত রয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘বিদ্যুৎ খাতে অনেক আর্থিক দায় ও ঋণ রয়েছে। সবকিছু বিবেচনা করেই আমরা এগোচ্ছি। কিছুটা সময় লাগবে। তবে আশা করছি, যেকোনো সময় এটি কার্যকর করা সম্ভব হবে।’
অন্যদিকে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম বলেছেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আমরা চিন্তাভাবনা করছি। গ্রাহক নিজেই প্রিপেইড মিটার কিনে ব্যবহার করলে মিটারভাড়ার প্রয়োজন হবে না। কীভাবে বিষয়টি বাস্তবায়ন করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা চলছে।’
বিদ্যুতের বাইরে বাড়তি যে খরচ: বর্তমানে একজন সিঙ্গেল ফেজ গ্রাহককে প্রতি মাসে ৪০ টাকা এবং থ্রি-ফেজ গ্রাহককে ২৫০ টাকা পর্যন্ত মিটারভাড়া দিতে হয়। এর সঙ্গে রয়েছে ৫ শতাংশ ভ্যাট।
এ ছাড়া অনুমোদিত লোড অনুযায়ী প্রতি কিলোওয়াটে ৪২ থেকে ১২০ টাকা পর্যন্ত ডিমান্ড চার্জ দিতে হয়। অর্থাৎ কোনো গ্রাহকের অনুমোদিত লোড যদি ৪ কিলোওয়াট হয় এবং তিনি সিঙ্গেল ফেজ সংযোগ ব্যবহার করেন, তাহলে বিদ্যুতের বিল ছাড়াও তাকে ভ্যাটসহ প্রায় ২০৮ টাকা অতিরিক্ত পরিশোধ করতে হয়। এই অর্থের বিনিময়ে তিনি অতিরিক্ত কোনো বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে পারেন না।
ঘোষণা ঘিরেও ধোঁয়াশা: মাসিক চার্জ প্রত্যাহারের ঘোষণা নিয়েও তৈরি হয়েছে বিভ্রান্তি। গত ৩ জুন বিএনপির মিডিয়া সেলের ফেসবুক পেজে এক পোস্টে দাবি করা হয়েছিল, সরকারের প্রথম ১০০ দিনের কর্মসূচির অংশ হিসেবে প্রিপেইড বিদ্যুৎ মিটারের অতিরিক্ত মাসিক চার্জ প্রত্যাহার করা হয়েছে। পরে সরকারের দায়িত্বশীল অনেক ব্যক্তি সেই পোস্ট শেয়ার করেন। কেউ কেউ ২৫ মে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের সংবাদ সম্মেলনের তথ্যও উল্লেখ করেন।
সাধারণত এ ধরনের সিদ্ধান্তের প্রজ্ঞাপন বা নির্দেশনা বিদ্যুৎ বিভাগ কিংবা বিইআরসির পক্ষ থেকেই জারি হওয়ার কথা। কিন্তু তারা কেউ-ই বিষয়টি জানে না। অবশ্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকেও এমন ঘোষণা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে সেখান থেকে এমন ঘোষণা দেওয়া হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘোষণাটি ব্যাপক প্রচারের পর অনেক গণমাধ্যমে প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি বিদ্যুৎ বিভাগ কিংবা বিইআরসি।
এর আগে গত ২৯ মার্চ বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছিলেন, প্রিপেইড বিদ্যুৎ মিটারের মাসিক ভাড়া প্রত্যাহার করা হবে। এরপর একাধিকবার একই ধরনের ঘোষণা এলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি।