রাজনৈতিক কোন্দল, আন্ডারওয়ার্ল্ডের আধিপত্য বিস্তারের লড়াই, চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সংঘর্ষে দেশ জুড়ে খুন, টার্গেট কিলিং ও অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বেড়েছে। এতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। রাজধানীর পরেই সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে চট্টগ্রামে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, গত তিন মাসে সারা দেশে ৯১৫টি হত্যাকাণ্ডের মামলা হয়েছে। অর্থাত্ গড়ে প্রতিদিন ১০টিরও বেশি খুনের ঘটনা ঘটেছে। এই হত্যাকাণ্ডের মধ্যে বিএনপি ক্ষমতা গ্রহণের ঠিক পরপরই, অর্থাত্ মার্চ মাসে ৩১৭টি, এপ্রিলে ২৮৮টি ও মে মাসে ৩১০টি মামলা দায়ের হয়েছে। গত বছরের এই তিন মাসে ৯৯৩টি মামলা হয়েছিল, তবে এর মধ্যে ২২৬টি মামলা ছিল আগের ঘটনার জের। অন্যদিকে ২০২৪ সালের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ৭৯৪। অর্থাত্ হত্যাকাণ্ড বেড়েছে উদ্বেগজনকভাবে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গত পহেলা মে থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অবৈধ অস্ত্রের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছে। চলমান বিশেষ অভিযানে গতকাল পর্যন্ত ১৫৩টি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া ১৭৮৫ রাউন্ড গুলি ও কার্তুজ, ম্যাগজিন ৫২টি, হাতবোমা ৩২টি, গানপাউডার ২ হাজার ২০০ কেজি উদ্ধার করা হয়েছে।
চলতি বছর এই তিন মাসে সবচেয়ে বেশি ২০৭টি খুনের ঘটনা ঘটেছে ঢাকা রেঞ্জে। এরপর চট্টগ্রামে ১৮৬টি, রাজশাহীতে ১০৬টি ও খুলনায় ৮৪টি মামলা হয়েছে।
মেট্রোপলিটন এলাকাগুলোর মধ্যে বরাবরের মতোই শীর্ষে ঢাকা, যেখানে ৫৭টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। দিনদুপুরে একের পর এক হত্যাকাণ্ডে উদ্বেগ বাড়ছে।
সবশেষ গত ১৩ জুন ট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার এক জনাকীর্ণ বাজারে যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরীকে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে হত্যা করা হয়। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, একটি অটোরিকশায় করে পাঁচ থেকে সাত জন সশস্ত্র ব্যক্তি এসে খুব কাছ থেকে তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায় এবং ফাঁকা গুলি ছুড়তে ছুড়তে পালিয়ে যায়। এর আগে, গত ৫ জানুয়ারি একই উপজেলার পূর্ব গুজরা ইউনিয়নে নিজ বাড়ির সামনে জানে আলম সিকদার (৫১) নামের অন্য এক যুবদল নেতাকে মুখোশধারী দুর্বৃত্তরা গুলি করে হত্যা করে। স্থানীয়রা এখন রাউজানকে ‘সন্ত্রাসের জনপদ’ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্যমতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে কেবল রাউজানেই অন্তত ২৫ জন খুন হয়েছেন। এর মধ্যে ১৮টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে রাজনৈতিক বিরোধের কারণে। একই সময়ে শতাধিক গোলাগুলি ও সংঘর্ষের ঘটনায় গুলিবিদ্ধসহ ৩৫০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।
২০২৪ সালের আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানের পর চট্টগ্রামের বিভিন্ন থানা ও ফাঁড়ি থেকে ৯৪৫টি আগ্নেয়াস্ত্র লুট হয়েছিল, যার মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রায় ৭০০টির মতো অস্ত্র উদ্ধার করেছে ও ৫ সেপ্টেম্বরের বেঁধে দেওয়া সময়সীমার মধ্যে ৬১৭টি অস্ত্র জমা পড়েছিল। অর্থাত্ এখনো প্রায় ১৬৫টির মতো লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার করা যায়নি।
অন্য জেলাগুলোর মধ্যে গত ১৩ জুন খুলনায় এক বিএনপি কর্মীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এছাড়া ১৫ জুন খুলনা শহরের দৌলতপুরে ফজর নামাজের সময় মসজিদের ভেতর সন্ত্রাসীরা গুলি চালালে দুই মুসল্লি আহত হন। একই দিন ঢাকার পশ্চিম রামপুরায় শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিন খান ওরফে ‘কাইল্যা পলাশ’ কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার মাত্র এক মাসের মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বেশ কয়েক জন কুখ্যাত গ্যাং লিডার ও দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধী কারাগার থেকে জামিনে বা বিদেশ থেকে দেশে ফিরে আসায় সহিংসতা নতুন মাত্রা পেয়েছে। গোয়েন্দাদের ধারণা, এই অপরাধীরা তাদের হারানো সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধারে মরিয়া হয়ে উঠেছে।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে ৬৪টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় পাঁচ জন নিহত ও ২৮৯ জন আহত (১১ জন গুলিবিদ্ধ) হয়েছেন। এপ্রিল মাসে ৯৮টি ঘটনায় ছয় জন নিহত ও ৫৩৩ জন আহত (৩৭ জন গুলিবিদ্ধ) হয়েছেন। মার্চ মাসে ১১৩টি ঘটনায় অন্তত ১৮ জন নিহত ও ৯১২ জন আহত (১৫ জন গুলিবিদ্ধ) হয়েছেন। রাউজানে গত ২৬ এপ্রিল বিএনপি কর্মী নাসির উদ্দিন নিহত হন। এর দুদিন আগে ২৪ এপ্রিল নিহত হন বিএনপি নেতা কাউসারুজ্জামান। ২ এপ্রিল পাবনার ঈশ্বরদীতে ছাত্রদল নেতা ইমরান হোসেনকে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। খুলনায় ৫ মার্চ সাবেক রূপসা শ্রমিক দল সভাপতি মাসুম বিল্লাহ গুলিতে নিহত হন। আর ১৪ মার্চ বাগেরহাটে শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ সোহেলকে হত্যা করা হয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সীমান্ত এলাকায় অবৈধ অস্ত্রে খুনাখুনি বেশি ঘটছে। গত দেড় বছরে যশোর সীমান্ত এলাকায় ৬২টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, যার অধিকাংশেই বিদেশি পিস্তল ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে। উদ্ধার করা অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, তুরস্ক ও জার্মানিতে তৈরি রিভলবার ও পিস্তলসহ ১১টি বিদেশি উন্নতমানের আগ্নেয়াস্ত্র, একটি নতুন অত্যাধুনিক স্বয়ংক্রিয় পয়েসবচ ২২ ক্যালিবার একে রাইফেল এবং দুটি এয়ারগান। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের পর যশোর সীমান্ত দিয়ে দেশে সবচেয়ে বেশি অবৈধ ক্ষুদ্র অস্ত্র প্রবেশ করছে। পার্শ্ববর্তী দেশে তৈরি ‘কাটা রাইফেল’, ‘বেলঘরিয়া পিস্তল’ এবং ৯ এমএম পিস্তলের মতো ছোট আকারের আগ্নেয়াস্ত্র সহজে বহন ও গোপন করা যায়, যা চোরাচালানকে আরো সহজ করে তুলছে।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরেও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত অভিযানের মধ্যেও খুনাখুনি চলছে। সর্বশেষ গত দুই দিন আগে মোহাম্মদপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে বিদেশি অস্ত্রসহ সোহেল ওরফে ‘মাওরা সোহেল’ নামে পরিচিত এক শীর্ষ ছিনতাইকারীকে গ্রেফতার করে র্যাব। র্যাব সূত্রে জানা গেছে, গ্রেফতার সোহেলের বিরুদ্ধে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ছিনতাই, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এবং অবৈধ অস্ত্র ব্যবহারের একাধিক অভিযোগ রয়েছে। অভিযানের সময় তার কাছ থেকে বিদেশি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।