লিফট একাধিক, কিন্তু কর্মী মাত্র একজন। আদৌ তিনি দায়িত্ব পালন করছেন কি না, তা তদারকি করবে কে! তাই কে ডিউটিতে আর কে হাজিরা খাতায় সই করে বাড়ি গিয়ে ঘুমাচ্ছেন, তা জানার বাইরে। অনেক লিফটের অবস্থা বেহাল। রাজধানীর প্রধান দুটি হাসপাতালে এভাবেই চলছে লিফট-সুরক্ষার নজরদারি। বিস্তর ফাঁক থাকলেও এতেই ভরসা রোগী-পরিজন-চিকিৎসক সবার।
মাদারীপুর জেলা হাসপাতালের লিফটে আটকা পড়েছিলেন নারীসহ ১০ জন। তাদেরকে দুই ঘণ্টা পর উদ্ধার করেছে ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা। গত ১৬ জুনের এই ঘটনার পর বিভিন্ন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নড়েচড়ে বসার কথা থাকলেও তেমনটি দেখা যাচ্ছেনা রাজধানীর হাসপাতালগুলোয়।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে সকাল থেকেই তিল ধারণের ঠাঁই থাকে না। দূর-দূরান্ত থেকে আসেন মুমূর্ষু রোগীরা। তাদের নিয়ে স্বজনরা ছোটেন এক বিভাগ থেকে অন্য বিভাগে। তাদের সুবিধায় বহুতলে লিফটের ব্যবস্থা থাকলেও সেখানে নেই কোনো অপারেটর। বেশির ভাগ লিফটেরেই এই দশা। এ হাসপাতালের ন্যাশনাল ফিস্টুলা সেন্টার ভবনে গতকাল সোমবার গিয়ে দেখা যায়, অনেক রোগী ও তাদের স্বজন বুঝতেই পারেন না, কাঙ্ক্ষিত বিভাগে যেতে নামতে হবে কোন ফ্লোরে। একটি লিফটের বোতামে স্কচটেপ লাগানো, যা দেখে লিফটটি ব্যবহার করতেই ভয় পাচ্ছেন রোগী ও স্বজনরা।
বরিশাল থেকে আসা ৫৫ বছর বয়সী আছিয়া বেগম জানালেন, তার রোগী দুদিন ধরে পাঁচতলায় ভর্তি। এই বয়সে তার পক্ষে সিঁড়ি বেয়ে এত ওপরে ওঠা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কোনটা চাপলে ওপরে যাবে আর কোনটায় নিচে নামবে, তা বুঝতে না পেরে তিনি দাঁড়িয়ে থাকেন বাইরেই। লিফটে অন্য কোনো মানুষ থাকলে তবেই তিনি ওঠেন।
ওই ভবনের আরও পাঁচটি লিফট ঘুরে দেখা গেছে, কোনোটিতেই লিফট অপারেটর দায়িত্বে নেই। সবচেয়ে বিশৃঙ্খলা ঢাকা মেডিকেলের নতুন ভবনে। ১০ তলা এই বিশাল ভবনে প্রতিদিন হাজারো মানুষের চাপ সামলাতে রয়েছে সাতটি লিফট। সাতটির জন্য কেয়ারটেকার মাত্র একজন। তিনি কি আর মানুষের দুর্ভোগ গায়ে মাখেন! চেয়ার নিয়ে বসে থাকেন খানিকটা দূরে। লিফটগুলোর ধারণক্ষমতা ১৬ থেকে ২১ জন। লিফট নিচে আসামাত্রই লাইনের তোয়াক্কা না করে সবাই হুড়মুড় করে ভেতরে ঢুকতে থাকেন। অতিরিক্ত মানুষের ওভারলোডে লিফটের দরজা বন্ধ হয় না। ভেতর থেকে কেউ নামতেও রাজি হন না। কে নামবেন আর কে থাকবেন, এ নিয়ে প্রতিবারই লিফটের ভেতর চলে তুমুল বিতণ্ডা ও হট্টগোল। এই চিত্র নিত্যদিনের।
ভবনটি মাত্র ১০ তলার। এটুকুন উঠতে-নামতেই লেগে যায় ১৫ থেকে ২০ মিনিট। কখনো তার চেয়েও বেশি! এই ভবনের ৫ নম্বর লিফটে গতকাল সোমবার সাততলার ৭০১ নম্বর পুরুষ মেডিসিন ওয়ার্ডে যাচ্ছিলেন হামজা শেখ নামের এক রোগীর স্বজন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, লিফটটির ধারণক্ষমতা ১৬ জন। হুড়মুড় করে ঢুকে পড়েছেন ২৫ জন। স্ট্রেচারে শোয়া গুরুতর রোগীও ছিলেন। বাড়তি ওজনে লিফটটি আটকে গেলেও কেউ নামছিলেন না। কে নামবেন, তা নিয়ে হট্টগোল। মেডিকেল কলেজের একজন শিক্ষার্থী এসে বোঝানোর পরও কেউ না নামায় হামজা শেখ নিজেই লিফট থেকে নেমে যান।
হামজা শেখের মতে, এভাবে গাদাগাদি করে ওঠার পর লিফট মাঝপথে আটকে যেতে পারে। দুর্ঘটনা ঘটলে ভেতরের মানুষদের বাঁচার উপায় থাকবে না। লিফটগুলো মনে হয় চলন্ত কফিন! ভেতরে একজন অপারেটর থাকলে তিনি পরিমাণমতো মানুষ উঠিয়ে ঝুঁকি কমাতে পারতেন।
একই দশা বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (পিজি) হাসপাতালেও। এর ল্যাবরেটরি সার্ভিস সেন্টার ভবনের পাঁচ লিফটে কোনো অপারেটর নেই। বেসিক সায়েন্স ভবনের দুটি লিফটের জন্য আছেন একজন।
হাসপাতালের অন্যতম ব্যস্ততম ব্লক-ডি। চারটি লিফট দেখভালের জন্য আছেন একজন। ফলে এখানেও প্রতিবার ধারণক্ষমতার বাইরে অতিরিক্ত মানুষ নিয়ে লিফট ওপরে উঠছে। ডি-ব্লকের একটি লিফটের ভেতরের প্রধান নিয়ন্ত্রণ প্যানেলের নিচের অংশটি সম্পূর্ণ খোলা। ভেতরের লাইট, ফ্যান এবং জরুরি সুইচ বোর্ডটি কোনো ঢাকনা ছাড়াই অরক্ষিত অবস্থায় ঝুলছে। এ থেকে শর্টসার্কিট বা বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনা ঘটতে পারে যেকোনো সময়।
সোমবার লিফটে করে ১৬ তলার মেডিসিন বিভাগে যাচ্ছিলেন বছর পঁয়ত্রিশের ফয়সাল আহমেদ। তিনি বলেছেন, ‘প্রতিদিন হাসপাতালে আসেন অসংখ্য হৃদরোগী। ভাঙাচোরা লিফট যদি মাঝপথে আটকে যায়, তবে ভেতরে থাকা রোগীরা ভয়ে ও অক্সিজেনের অভাবে হার্ট অ্যাটাক করেই মারা যাবেন। প্রতিটি লিফটে যদি একজন করে অপারেটর থাকতেন, তবে তারা যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি সহজে সামাল দিতে পারতেন।’
হাসপাতালের সি-ব্লকের চারটি লিফটের সামনেও থাকে মানুষের দীর্ঘ লাইন। পাশাপাশি দুটি লিফটের জন্য একজন অপারেটর থাকলেও সরেজমিন গিয়ে তার চেয়ারটি খালি পাওয়া যায়।
হাসপাতালের লিফটে কেয়ারটেকার না থাকলে কী ঘটতে পারে, তার নজির আছে দেশেই। ২০২৪ সালের ১২ মে গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে লিফট বন্ধ হয়ে আটকা পড়েন হৃদরোগী মমতাজ বেগম (৫০)। লিফটের ভেতরে সে সময় অপারেটর ছিলেন না। স্বজনরা লিফটম্যানের সঙ্গে যোগাযোগ করলে সাহায্যের বদলে দুর্ব্যবহার করা হয়েছিল বলে অভিযোগ। দীর্ঘ সময় আটকে থেকে লিফটের ভেতরেই মারা যান মমতাজ বেগম। পরে ফায়ার সার্ভিস গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও ঘটেছে আতঙ্কের ঘটনা। গত বছর ফেব্রুয়ারিতে হাসপাতালের প্রশাসনিক ব্লকের লিফটে রোগীসহ চারজন আটকা পড়েন। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় লিফট নিচতলা ও দোতলার মাঝখানে আটকে যায়। লিফটম্যান দরজা খুলতে পারলেও লিফট ভেতরে আটকে থাকায় কেউ বের হতে পারেননি। প্রায় দেড় ঘণ্টা পর ফায়ার সার্ভিস এসে তাদের উদ্ধার করে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও প্রকৌশলীদের মতে, হাসপাতালের লিফট সাধারণ শপিংমল বা আবাসিক ভবনের চেয়ে অনেক বেশি সংবেদনশীল। এখানে হুইলচেয়ার ও স্ট্রেচার ওঠাতে হয়। প্রতি লিফটে সার্বক্ষণিক দক্ষ অপারেটর থাকা বাধ্যতামূলক।
জরুরি ভিত্তিতে এই সংকটের সমাধান না হলে যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের যান্ত্রিক বিপর্যয় বা অগ্নিকাণ্ডের মতো ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে।