Image description

কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন সেদিন। স্ত্রীকে বলেছিলেন অন্য কাউকে বিয়ে করতে। আজও নিজের অক্ষমতাকে দায়ী করেন সন্তান না হওয়ার জন্য। গল্পটা এমন হলেই বোধহয় শোভন হতো। কিন্তু বাস্তবে এমন পুরুষ পাওয়া মুশকিল, যিনি বন্ধ্যা অথচ তা মেনে নিতে পারেন।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বন্ধ্যা শব্দটিকে এক ধরনের স্ত্রীকরণ করা হয়েছে। যেখানে নারীকেই শুধু বন্ধ্যা বলা হয়। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। দেশে নারী এবং পুরুষের বন্ধ্যত্ব সমান।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বে গড়ে ৮ থেকে ১২ শতাংশ দম্পতি বন্ধ্যা। বাংলাদেশে এ হার বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে কিছুটা বেশি এবং তা ১০ থেকে ১৫ শতাংশ। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনফার্টিলিটি আউটডোরে আসা রোগীদের ওপর করা এক গবেষণায় এই তথ্য মেলে। সন্তান না হওয়ার পেছনে নারী ও পুরুষের দায় সমান সমান। আমেরিকান সোসাইটি ফর রিপ্রোডাকটিভ মেডিসিনের (এএসআরএম) তথ্য বলছে, বন্ধ্যত্বের ক্ষেত্রে প্রায় ৪০ শতাংশ কারণ এককভাবে পুরুষের এবং ৪০ শতাংশ কারণ এককভাবে নারীর জন্য হয়ে থাকে। বাকি ২০ শতাংশ যৌথ বা অজ্ঞাত কারণ। এখন প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশে কতজন পুরুষ বন্ধ্যা?

বর্তমানে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৯৮ লাখ ২৮ হাজার ৯১১ জন। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রজননক্ষম (১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারী ও তাদের স্বামী) মোট বিবাহিত দম্পতির সংখ্যা সাড়ে তিন কোটির মতো। ফলে দেশে বন্ধ্যা পুরুষের সংখ্যা দাঁড়ায় ২১ লাখ, যারা এককভাবে সন্তান জন্মদানে অক্ষম। দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল, আইভিএফ (ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন) সেন্টার এবং চিকিৎসকদের গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দিন দিন পুরুষের বন্ধ্যত্ব আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।

দেশে বন্ধ্যত্বের শিকার পুরুষের চিত্র ভয়াবহ হলেও এসব আলাপ সমাজে ‘নিষিদ্ধ’। ফলে যেসব পুরুষ বন্ধ্যা, তারা চেষ্টা করেন এই সত্য কথাটি অস্বীকার করতে কিংবা ভুলে যেতে। আর এর ফলে তারা গভীর মানসিক অবসাদে ডুবে যান। অথচ বন্ধ্যা নারীর বেলায় চিত্র ভিন্ন। সমাজে বা পরিবারে তিনি সন্তান জন্মদানে অক্ষম কথাটি অনায়াসেই বলতে পারেন এবং অন্যরাও সেটি মেনে নেন। অথচ একজন বন্ধ্যা পুরুষ পরিবার কিংবা সমাজ কোথাও তার বন্ধ্যত্বের কথা বলতে পারেন না।

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এসব পুরুষ খুবই হতাশায় ভোগেন। তাদের অনেকেই মাদকাসক্ত বা চুপচাপ হয়ে যান। কেউ কেউ আত্মহত্যা পর্যন্ত করেন।

এই বন্ধ্যত্বের অনেক কারণ। এর মধ্যে কিছু শারীরিক। যেমন বীর্যে স্বাভাবিকের চেয়ে শুক্রাণুর সংখ্যা কম থাকা, শুক্রাণুর নড়াচড়া করার ক্ষমতা দুর্বল অথবা কোনো শুক্রাণুই না থাকা। চিকিৎসকদের মতে, চিকিৎসা নিতে আসা বন্ধ্যা পুরুষের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের বীর্যেই কোনো শুক্রাণু থাকে না। এর বাইরেও পুরুষের বন্ধ্যত্বের কিছু কারণ আছে। যেমন অতিরিক্ত মাত্রায় ল্যাপটপ ও স্মার্টফোন ব্যবহার, কোলে ল্যাপটপ রেখে দীর্ঘক্ষণ কাজ করা, ধূমপান ও মাদক সেবন, ভেজাল খাবার, দেরিতে বিয়ে করা, বেশি গরমে কাজ করা, আঁটসাঁট পোশাক পরা, প্যান্টের পকেটে মোবাইল রাখা, তীব্র মানসিক চাপ, রাত জাগার অভ্যাসও পুরুষের বন্ধ্যত্বের কারণ।

গত মাসে মোহাম্মদপুর ফার্টিলিটি সার্ভিসেস অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টারে চিকিৎসা নিতে এসেছিলেন এক দম্পতি। ছয়-সাত বছর হলো বিয়ের বয়স। ঢাকার বাসিন্দা। স্বামী ভালো বেতনের চাকরি করেন। বয়স বছর চল্লিশেক। তার ডায়াবেটিস, হার্টের রিং পরানো, যৌনাঙ্গের সমস্যা এবং বিষণ্নতা রোগ আছে। আর স্ত্রী গৃহিণী। বয়স ৩৫-এর কোটায়। আগে কোনো চিকিৎসা নেননি এ দম্পতি। চিকিৎসক জানিয়েছেন, এই দম্পতির মধ্যে পুরুষটি বন্ধ্যা। এ কথা শোনামাত্র ভদ্রলোক ভয়ংকর চেঁচামেচি শুরু করেন হাসপাতালের মধ্যে। এমনকি স্ত্রীকেও বকাঝকা করেন।

মোহাম্মদপুর ফার্টিলিটি সার্ভিসেস অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টারের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ও বিভাগীয় প্রধান (ইনফার্টিলিটি) ডা. রহিমা খাতুন আগামীর সময়কে বলেছেন, একজন স্ত্রী যখন শোনেন তার স্বামী বন্ধ্যা, তখন মন খারাপ করেন, কাঁদেন, কিন্তু মেনে নেন বা ছাড় দেন। অথচ বেশিরভাগ পুরুষ মানতেই চান না যে তার কোনো সমস্যা আছে। তারা নারীর দোষ পেলে খুশি হন। কেউ কেউ তো হাঙ্গামা করেন। সমাজের গঠনই এমন, যেখানে পুরুষ ধরেই নেন তিনি বন্ধ্যা হতেই পারেন না।

নানারকম ভুল ধারণা থেকে পুরুষদের বের করা যায় না বলেও উল্লেখ করেন এই চিকিৎসক। এমনকি পুরুষ আগে নারীকে বাধ্য করেন বন্ধ্যত্ব পরীক্ষা করাতে। যদি নারীর সমস্যা ধরা না পড়ে, তাহলেই শুধু কোনো কোনো পুরুষ নিজের বন্ধ্যত্ব পরীক্ষা করাতে রাজি হন।

পুরুষের বন্ধ্যত্ব অস্বীকারের কারণ যতটা না সামাজিক, তার চেয়েও বেশি অহংবোধ। স্কয়ার হাসপাতালের মানসিক রোগ বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট অধ্যাপক ডা. মো. ওয়াজিউল আলম চৌধুরী আগামীর সময়কে বলেছেন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে মানসিক রোগের কারণে পুরুষ বন্ধ্যা হয়। তবে নিজের বন্ধ্যত্ব শুনে পুরুষের যে প্রতিক্রিয়া হয়, তা স্বাভাবিক ব্যক্তিত্বের লক্ষণ নয়, ইগো সমস্যা বা শয়তানি। ইগোকে বাঁচানোর জন্য তিনি নিজের বন্ধ্যত্ব স্বীকার করেন না বরং আরেকটা বিয়ে করেন। তার কাছে মনে হয়, এটি স্বীকার করা মানে নারীর কাছে হেরে যাওয়া। অথচ একজন নারী যদি জানেনও তার স্বামী বন্ধ্যা, তবুও তিনি কোথাও বলেন না। তিনি মেনে নেন বলে যুক্ত করেন এই চিকিৎসক।

যদিও আজকাল কিছু পুরুষ সচেতন হচ্ছেন এবং তারা নিজেরাই চিকিৎসা নিতে আগ্রহী হচ্ছেন। তবে সংখ্যাটা খুবই কম। অন্যদিকে চিকিৎসকরাও মনে করেন, সময়মতো চিকিৎসা নিলে দেশে বন্ধ্যত্বের হার কমানো সম্ভব।