Image description

যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দরে কাস্টমসের জব্দ করা প্রায় ৬ কোটি টাকা দামের ভারতীয় শাড়ি, থ্রিপিস, বেবিওয়্যার ও প্রসাধনীসামগ্রী উধাও হয়ে গেছে। এ ঘটনায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। কাস্টমসের অভিযোগ, বন্দরের জিম্মায় থাকা জব্দ হওয়া মূল্যবান পণ্য সরিয়ে তার পরিবর্তে নিম্নমানের দেশীয় পণ্য রাখা হয়েছে। এ ঘটনায় বন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, গত ১২ মার্চ যশোরের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান সাফা ইমপেক্স ভারত থেকে একটি পণ্যচালান আমদানি করে। সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট হিসেবে চালানটি গ্রহণ করে বেনাপোলের মেসার্স হুদা ইন্টারন্যাশনাল। পরে চালানটি বেনাপোল স্থলবন্দরের ৩৭ নম্বর শেডে সংরক্ষণ করা হয়।


পণ্যের চালানটি কায়িক পরীক্ষার সময় ১০৮টি কার্টনের মধ্যে ঘোষণাবহির্ভূত বিপুল পরিমাণ ভারতীয় শাড়ি, থ্রিপিস, বেবিওয়্যার, ফেসওয়াশ, ক্রিম, লোশনসহ বিভিন্ন প্রসাধনী সামগ্রী পাওয়া যায়। কাস্টমসের হিসাব অনুযায়ী, এসব পণ্যের বাজারমূল্য প্রায় ৬ কোটি টাকা। একই সঙ্গে মিথ্যা কথা বলে ২ কোটি ৩২ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা করা হয়েছিল।

এ ঘটনায় কাস্টমস আইন অনুযায়ী চালানটি জব্দ করে বন্দর কর্তৃপক্ষের জিম্মায় রাখা হয়। একই সঙ্গে পণ্য খালাসে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে বন্দর কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার লিখিতভাবে সতর্ক করা হয়। কাস্টমস সূত্র জানায়, গত ১২ মার্চ, ২ এপ্রিল এবং ২০ মে পৃথক তিনটি চিঠির মাধ্যমে চালানটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, কোরবানি ঈদের ছুটির মধ্যেই বন্দরের কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত ও তালাবদ্ধ ৩৭ নম্বর শেড থেকে জব্দকৃত ভারতীয় পণ্য সরিয়ে ফেলা হয়। পরবর্তী সময়ে সেখানে নিম্নমানের দেশীয় শাড়ি, থ্রিপিস ও অন্যান্য সামগ্রী রাখা হয়। অভিযোগের ভিত্তিতে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর বিষয়টি অনুসন্ধান শুরু করলে গত ২ জুন বন্দর ও ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে পুনরায় চালানটির কায়িক পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় পণ্য পরিবর্তনের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

বেনাপোল কাস্টমস হাউসের কমিশনার মোহাম্মদ ফাইজুর রহমান জানান, উধাও হওয়া ভারতীয় পণ্যের পরিবর্তে পাওয়া দেশীয় পণ্যগুলো বসুন্ধরা ও মেঘনা গ্রুপের বিভিন্ন কোম্পানির নাম মুদ্রিত কার্টনে রাখা ছিল। এছাড়া দেশীয় সংবাদপত্রে মোড়ানো প্যাকেট এবং বিভিন্ন কুরিয়ার সার্ভিসের স্টিকারযুক্ত পিপি বস্তাও উদ্ধার করা হয়েছে। এসব আলামত থেকে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়, বিকল্প পণ্যগুলো দেশের অভ্যন্তর থেকেই এনে শেডে রাখা হয়েছে।

গজলডোবা ব্যারাজ খুলে দিল ভারত, হু হু করে বাড়ছে তিস্তার পানিগজলডোবা ব্যারাজ খুলে দিল ভারত, হু হু করে বাড়ছে তিস্তার পানি
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বন্দরের প্রতিটি শেডে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তাব্যবস্থা, সশস্ত্র টহল এবং সিসিটিভি নজরদারি রয়েছে। তাছাড়া ৩৭ নম্বর শেডটি তালাবদ্ধ অবস্থায় ছিল। ফলে বন্দরের অভ্যন্তরীণ সহযোগিতা ছাড়া কয়েক কোটি টাকার পণ্য সরিয়ে নেওয়া কার্যত অসম্ভব।

ঘটনার পর গত ৩ জুন বন্দর কর্তৃপক্ষকে পাঠানো চিঠিতে কাস্টমস জানায়, আইন অনুযায়ী জব্দকৃত পণ্যের সংরক্ষণ ও নিরাপত্তার সম্পূর্ণ দায়িত্ব ওয়্যারহাউজ রক্ষকের। বন্দরের জিম্মায় থাকা অবস্থায় পণ্য পরিবর্তন ও সরিয়ে ফেলার মাধ্যমে কাস্টমস আইন লঙ্ঘিত হয়েছে। এ কারণে ক্ষতিগ্রস্ত রাজস্বের পরিমাণ ২ কোটি ৩২ লাখ টাকা বন্দর কর্তৃপক্ষকে পরিশোধ করতে চরমপত্র দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে বেনাপোল আমদানিকারক-রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি আমিনুল হক আনু বলেন, জব্দকৃত পণ্যের সংরক্ষণ ও নিরাপত্তার সম্পূর্ণ দায়িত্ব বন্দরের শেড ইনচার্জ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। বন্দরের জিম্মায় থাকা অবস্থায় পণ্য পরিবর্তন ও সরিয়ে ফেলার দায়ভারও স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষকেই নিতে হবে।

বেনাপোল স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক (ট্রাফিক) মো. শামীম হোসেন বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করা হচ্ছে। শেড ইনচার্জ মোহাম্মদ শাহজালালকে প্রত্যাহার করে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি উপপরিচালক (ট্রাফিক) মো. রুহুল আমিনকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

অন্যদিকে, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট প্রতিষ্ঠান মেসার্স হুদা ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী আনিসুর রহমান দাবি করেছেন, তাদের প্রতিষ্ঠান জব্দকৃত চালানের খালাসের জন্য কোনো বিল অব এন্ট্রি দাখিল করেনি। রাজু নামের এক ব্যক্তি তাদের প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে এসব কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছেন বলে তিনি অভিযোগ করেন।

এ বিষয়ে বেনাপোল স্থলবন্দরের সহকারী পরিচালক কাজী রতন বলেন, ঘটনার প্রাথমিক তদন্ত শেষ হয়েছে। জব্দকৃত পণ্য সরিয়ে প্রমাণ নষ্টের অপচেষ্টা চালানো হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে নতুন তথ্য সামনে আসায় ঘটনা আরো জটিল আকার ধারণ করেছে । বন্দরের ৪১ নম্বর শেড থেকেও প্রায় ২৫ টন আমদানিকৃত পণ্য উধাও হয়ে গেছে। বন্দর পরিচালক শামীম হোসেন জানিয়েছেন, ৩৭ ও ৪১ নম্বর শেডে ঘটে যাওয়া দুটি ঘটনারই তদন্ত চলছে।

তদন্ত সূত্রে আরো জানা গেছে, গত ২০ মে সংশ্লিষ্ট চালানের পণ্যবোঝাই ট্রাকের মোট ওজন ছিল ১৫ হাজার ৪৩০ কেজি। কিন্তু বন্দরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মচারীরা আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে ওজন ৪০০ কেজি কম দেখিয়ে ১৫ হাজার ৩০ কেজির স্লিপ প্রদান করে। এ ঘটনায় পোর্ট থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।

ইরানের সঙ্গে ট্রাম্পের চুক্তি স্বাক্ষরের নেপথ্য গল্পইরানের সঙ্গে ট্রাম্পের চুক্তি স্বাক্ষরের নেপথ্য গল্প
থানার ওসি আশরাফ হোসেন বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে এবং জড়িতদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। অনুসন্ধানে আরো উঠে এসেছে, এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে বাজিতপুর বীজ ভান্ডার ও সোনারগাঁ এজেন্সি নামের প্রতিষ্ঠানের আমদানিকৃত চালানে মিথ্যা ঘোষণা ধরা পড়ে। তখন প্রায় আড়াই কোটি টাকা দামের পণ্য জব্দ করা হয়েছিল।

একই মাসে রাইস ট্রেডিং ইন্টারন্যাশনাল ও বিলিসিভ কসমেটিকস লিমিটেডের নামে আমদানি করা আরেকটি চালানে ঘোষিত পণ্যের পরিবর্তে উচ্চ শুল্কের ফেব্রিক্স পাওয়া যায়। সেই চালানও কাস্টমস জব্দ করেছিল। তবে অভিযোগ রয়েছে, এসব ঘটনায় প্রকৃত হোতাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অনুসন্ধানে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এসেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বেনাপোল স্থলবন্দরের পরিচালক (ট্রাফিক) মো. শামীম হোসেনকে বদলির আদেশ দেওয়া হলেও প্রায় নয় মাস পরও তিনি একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। এ নিয়ে প্রশাসনিক মহলে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের অভিমত, শেডের ভেতরে সিসিটিভি নজরদারি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং নিয়ন্ত্রিত প্রবেশাধিকার থাকার পরও বন্দরের অভ্যন্তরীণ অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশ ছাড়া এত বড় ধরনের পণ্য বদল ও অপসারণ সম্ভব নয়। ফলে পুরো ঘটনায় বেনাপোল স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের সম্পৃক্ততার অভিযোগ জোরালো হচ্ছে।