বিএনপি সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়া ও চীন যাচ্ছেন। বিশ্ব রাজনীতির জটিল সমীকরণ, নানা দেশের পারস্পরিক প্রতিযোগিতা আর জাতীয় স্বার্থের টানাপোড়েনের মধ্যে এটি তার জন্য এক বড় মঞ্চ। মালয়েশিয়া ও চীনে তার এই সফর থেকে পরিষ্কার বোঝা যাবে, বর্তমান নতুন সরকার বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশকে কিভাবে তুলে ধরতে চায়।
এই সফরগুলোর দিকে দেশের ভেতরে ও বাইরে সবাই বেশ আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের জন্য এটি একটি বড় পরীক্ষা। গত দুই দশকে অনেক প্রধান উন্নয়ন সহযোগী দেশের সঙ্গেই দলটির যোগাযোগ কিছুটা কম ছিল। তাই সেসব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক আবার নতুন করে জোরদার করার ক্ষেত্রে এই সফর বড় ভূমিকা রাখবে।
একইসঙ্গে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের মতো শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক তৈরি করার সুযোগ পাবেন তারেক রহমান। তাদের সঙ্গে বৈঠকের ফলাফলের ওপরই নির্ভর করছে এ দুটি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ।
মালয়েশিয়া সফর
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে রোববার দুই দিনের সরকারি সফরে কুয়ালালামপুরে যাবেন তারেক রহমান। সোমবার দুই নেতার মধ্যে প্রথমে একান্ত বৈঠক এবং পরে আনুষ্ঠানিক আলোচনা হবে। বাংলাদেশের জন্য মালয়েশিয়া সফরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, স্বাধীনতার পর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে মালয়েশিয়াই প্রথম বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। ঢাকা আশা করছে, এ সফরের মাধ্যমে দুই দেশের পারস্পরিক বিশ্বাস ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও মজবুত হবে।
এ সফরে মূলত জনশক্তি রপ্তানি ও মানবসম্পদ উন্নয়ন, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, জ্বালানি, কৃষি এবং রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা হবে। পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম জানিয়েছেন, রোহিঙ্গাদের নিরাপদে নিজ দেশ মিয়ানমারে প্রত্যাবাসেরর জন্য মালয়েশিয়া ও আসিয়ান জোটের দেশগুলো যেন আরও জোরালো ভূমিকা নেয়, সেই অনুরোধ জানাবে বাংলাদেশ।
এ ছাড়া মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের সাধারণ ও দক্ষ কর্মীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর বিষয়টিও বেশ গুরুত্ব পাবে। সফরে তিনটি সমঝোতা স্মারক সই এবং সন্ত্রাসবাদ দমনে একটি চুক্তি হওয়ার কথা রয়েছে। চীন সফরের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার আগে তারেক রহমান মালয়েশিয়ার এমএমসি পোর্ট, এয়ারএশিয়া ও পেট্রোনাসের মতো কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় কোম্পানির চেয়ারম্যানদের সঙ্গেও বৈঠক করবেন।
চীন সফর
প্রধানমন্ত্রী তার চীন সফর শুরু করবেন ডালিয়ান শহর থেকে। সেখানে তিনি ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের একটি বিশেষ সম্মেলনে অংশ নেবেন এবং বিশ্ব নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন। এরপর তিনি হাইস্পিড ট্রেনে করে বেইজিংয়ে যাবেন। বেইজিংয়ে তিনি চীনের বড় বড় নির্মাণ ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের সঙ্গে দেখা করবেন এবং ‘বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরাম’র একটি অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন।
আগামী ২৫ জুন চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের সঙ্গে তারেক রহমানের বৈঠক হবে। এই বৈঠকে অন্তত ১৩টি সমঝোতা স্মারক ও কয়েকটি চুক্তি সই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ চীনের ‘গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ-এ (জিডিআই) যোগ দিতে পারে।
তবে এই সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি হবে ২৬ জুন। সেদিন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এক ঘণ্টার একটি বৈঠক নির্ধারিত রয়েছে, যেখানে দুই দেশের ভবিষ্যতের পথনকশা তৈরি হবে।
কূটনৈতিক ভারসাম্যের পরীক্ষা
তারেক রহমানের এই চীন সফরের দিকে বিশ্ব রাজনীতি এখন কড়া নজর রাখছে। পরাশক্তিগুলো দেখতে চায় বাংলাদেশের নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতি ঠিক কোন দিকে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর সফরের ঠিক আগে বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন শনিবার বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেন।
বৈঠক শেষে রাষ্ট্রদূত সাংবাদিকদের রসিকতা করে বলেন, তিনি বাংলাদেশিদের আগামী বিশ্বকাপে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন করার অনুরোধ জানাতে এসেছেন। কারণ, দীর্ঘমেয়াদে আমেরিকার পক্ষে বাজি ধরলে কখনো ঠকতে হয় না।
কথাটি ফুটবল বিশ্বকাপ নিয়ে বলা হলেও কূটনীতিকরা মনে করছেন এর পেছনে গভীর রাজনৈতিক বার্তা রয়েছে। বাংলাদেশ যখন আমেরিকার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রেখেও চীনের সঙ্গে বন্ধুত্ব বাড়াচ্ছে, তখন দেশের আসল কূটনৈতিক দক্ষতার পরীক্ষা হবে। কোনো এক পক্ষ না নিয়ে সবার সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রাখাই হবে প্রধান কাজ।
বাংলাদেশের মূল চ্যালেঞ্জ হলো কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশের দিকে ঝুঁকে না পড়ে সবার সঙ্গে দেশের স্বার্থে মিলেমিশে কাজ করা। তাই মালয়েশিয়া ও চীন সফরের সফলতা শুধু চুক্তির খাতা দেখে বিচার করা যাবে না। বর্তমানের এই দলাদলির বিশ্বে বাংলাদেশ নিজের স্বাধীনতা ও জাতীয় স্বার্থ কতটা বজায় রাখতে পারছে, তার ওপরই নির্ভর করবে এই সফরের আসল সাফল্য।