বিএনপি সরকারের আলোচিত ফ্যামিলি কার্ডের পাইলটিং কার্যক্রম ঠিকঠাকভাবেই চলছিল। তবে কিছু ব্যক্তির ভুল তথ্যের কারণে প্রশ্নের মুখে পড়েছে এ কার্যক্রম। সম্প্রতি যশোরে ৬২ জন সচ্ছল পরিবারের সদস্যের হাতে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এর পরেই নড়েচড়ে বসে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়। এখন চলছে ফ্যামিলি কার্ড পাইলটিং গাইডলাইন অনুযায়ী শুদ্ধি অভিযান।
মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ৩২৫ জন ব্যক্তির আর্থিক সচ্ছলতা ও সরকারি সংশ্লিষ্টতা থাকায় তাদের ফ্যামিলি কার্ড বাতিল করা হয়েছে। সিস্টেমের ফিল্টারিংয়ে এমন কিছু ব্যক্তিকে পাওয়া গেছে যারা ফ্যামিলি কার্ড পাইলটিং গাইডলাইন অনুযায়ী বাতিল হয়ে গেছে। এছাড়াও বিভিন্ন পর্যায়ের মোট এক হাজার ৪৬৬ জন সুবিধাভোগীকে প্রথম মাসে টাকা দেওয়ার পর দ্বিতীয় মাস থেকে চূড়ান্তভাবে বাতিল করা হয়। সব মিলিয়ে বাতিলের সংখ্যা প্রায় এক হাজার ৮০০ ফ্যামিলি কার্ড।
এর মধ্যে ১৭৪ জনের জাতীয় সঞ্চয়পত্র আছে যার পরিমাণ পাঁচ লাখ টাকার বেশি। ৩৮ জন সরকারি চাকরিজীবী, ৬৯ জন পেনশনভোগী এবং ৪৪ জনের নামে গাড়ির নিবন্ধনের তথ্য উঠে আসে। এসব ব্যক্তির কার্ডে প্রথম মাসের অর্থ দেওয়া হয়েছে। এটা বর্তমানে স্থগিত করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে উঠে আসেÑফ্যামিলি কার্ড পাইলটিংয়ের জন্য নির্দিষ্ট নীতিমালা ও যাচাই-বাছাইয়ের ভিত্তিতে সুবিধাভোগী নির্বাচন করার কথা থাকলেও, সুনামগঞ্জের নদীভাঙনকবলিত এলাকার লোক বাদ পড়েছেন, অন্যদিকে সচ্ছলরা কার্ড পাচ্ছেন। ঢাকার বস্তিগুলোতে কিছু অভিযোগ আছে। অন্যদিকে বান্দরবানে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর অগ্রাধিকারের সরকারি নির্দেশনা লঙ্ঘিত হয়েছে।
তবে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ফ্যামিলি কার্ড সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাইলট প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হলো ভুলগুলো খুঁজে বের করা যাতে দেশব্যাপী যখন আমরা প্রায় কোটি পরিবারের কাছে যাব, তখন যেন কোনো ধরনের ত্রুটি না থাকে। ‘কম্পিউটারাইজড’ কিন্তু তথ্যের প্রাথমিক উৎস হলো মাঠ পর্যায়ের জরিপ। তদন্ত প্রতিবেদনে (কলমাকান্দা ও মিরপুরের উদাহরণ) দেখা গেছে যে, কিছু ক্ষেত্রে তথ্য সংগ্রহকারীরা বাড়ি বাড়ি না গিয়ে এক জায়গায় বসে তথ্য পূরণ করেছেন এবং স্থানীয় প্রভাবশালীদের মাধ্যমে তথ্য প্রভাবিত হওয়ার কথা জানা গেছে।
এদিকে সুনামগঞ্জ বা বান্দরবানের যেসব এলাকায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বা নদীভাঙন কবলিত মানুষ বাদ পড়েছেন, সেখানে মন্ত্রণালয় থেকে পুনরায় তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এখানে সিস্টেমের দোষ নয়, বরং যারা ভুল তথ্য সংগ্রহ ও ইনপুট দিয়েছে, সেসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে মন্ত্রণালয়।
অপরদিকে অর্থ বিভাগের ভেরিফিকেশন রিপোর্ট অনুযায়ী, পাইলট পর্যায়ে মোট এক হাজার ৪৬৬ জন সুবিধাভোগীকে প্রথম মাসের পর দ্বিতীয় মাস থেকে চূড়ান্ত স্থগিত করা হয়। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অন্যান্য সুবিধাভোগী ‘ভালনারেবল উইমেন বেনিফিট’-এর ৭০৯ জন, বয়স্ক বা বিধবা বা অন্যান্য ভাতাভোগী ১০২৬ জন, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি (এফএফপি) ১১৩ জন মোট এক হাজার ৮৪৮ জনের অন্যান্য সুবিধা বাতিল করে শুধু ফ্যামিলি কার্ডে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সূত্র আরো জানায়, সিম কার্ড এবং এমএফএস (বিকাশ-নগদ) অ্যাকাউন্টের জটিলতার কারণে ডাটা অনুযায়ী, প্রায় ১৬ হাজার ৪৯৫ জন সুবিধাভোগীর এনআইডি’র সঙ্গে সিমের মালিকানার মিল না থাকায় টাকা পাঠানো বন্ধ ছিল। বর্তমানে মাঠ পর্যায়ে তথ্য সংশোধন করে ছয় হাজার ৮৩৭ জনের অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানো হয়েছে। বাকি কার্ডধারীদের সমস্যা সমাধানে কাজ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
মন্ত্রণালয়ের ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে কাজ করেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, ফ্যামিলি কার্ডের পাইলটিং পর্যায়ে কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছে। এগুলো দ্রুতই ঠিক করা হচ্ছে। আমরা মাঠে কাজ করছি, আগামী জুলাই থেকে এটার সিস্টেম আরো ভালো হবে। তিনি বলেন, যে কার্ডগুলো বাতিল করা হয়েছে এগুলোর অর্থ ফেরত নেওয়া হবে।
এ কর্মকর্তা বলেন, অনেক সুবিধাভোগী নিজের নামে রেজিস্ট্রেশনকৃত সিম নাম্বার, নিজের বিকাশ অ্যাকাউন্ট না দিয়ে স্বামীর নামের অ্যাকাউন্ট দেন। সেসব কার্ডে টাকা দেওয়া বন্ধ ছিল। এগুলো এখন ঠিক করে টাকা পাঠনো শুরু হয়েছে।
বিষয়টা নিয়ে সম্প্রতি আমার দেশ-এর সঙ্গে কথা বলেন সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, ফ্যামিলি কার্ডে আমরা সরকারি ব্যবস্থাপনা প্রপারলি ইউজ করছি। এখানে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের কোনো ভূমিকা নেই। পাইলটিং পর্যায়ে কিছু ত্রুটি দেখা দিয়েছে। সেগুলো রিভিউ করে অর্থবিভাগের আইবাস সিস্টেমে এসে ধরা পড়েছে। ইতোমধ্যে বেশকিছু কার্ড বাতিল করা হয়েছে। আবার অনেকের কার্ডে নিজের কিছু তথ্য না দিয়ে পরিবারের অন্য সদস্যদের তথ্য দেওয়া হয় যেটা এখন ধরা পড়ছে। এগুলো সংশোধন করা হচ্ছে।
মন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন তথ্য দেওয়ার পর অটোমেটিক্যালি স্কোরিংয়ে ফ্যামিলি কার্ডে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এটাকে পিএমটি স্কোরিং বলে, ২০১৬ সাল থেকে সারা পৃথিবীতে চালু আছে। এটার মাধ্যমে সারা দেশের মানুষের সামাজিক অবস্থান, আর্থিক অবস্থানÑ এগুলো পরিমাপ করার স্কেল। তিনি বলেন, অনেকেই কিছু তথ্য হয়তো গোপন করেছিল। তবে সেগুলো অর্থবিভাগের সিস্টেমে গিয়ে ধরা পড়ে। আবার অনেকের মোবাইলের সিম কার্ডের জন্য তাদের অ্যাকাউন্টে টাকা ঢুকছে না। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, কেউ হয়তো স্বামীর অথবা ছেলের নাম্বার দিয়েছে সেগুলো ঠিক করে আবার টাকা দেওয়া হচ্ছে।
সমাজকল্যাণমন্ত্রী আরো বলেন, যারা প্রকৃত অভাবী অথচ ভুল তথ্যের কারণে বাদ পড়েছেন, তারা যদি প্রমাণ করতে পারেন যে, তারা অন্য কোনো সুবিধা নিচ্ছেন না, তবে তাদের আমরা পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করব। কিন্তু যারা সচ্ছল তাদের কার্ড স্থগিত করা হয়েছে যাতে সরকারের সীমিত সম্পদের সঠিক বণ্টন হয় এবং অতি দরিদ্ররা অগ্রাধিকার পায়। ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন বলেন, পাইলট পর্যায়ে ভুল হওয়া মানেই সিস্টেমের ব্যর্থতা নয়, বরং ভবিষ্যতে নিখুঁত করার সুযোগ করে দেওয়া।
তিনি বলেন, আগামীতে অনেক তথ্য সংগ্রহের জন্য ইউনিভার্সিটিতে পড়া ছেলে-মেয়েদের আমরা ট্রেনিং দেব। ট্রেনিংয়ের পর জেলা, উপজেলা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে যাব, তাহলে আমাদের দুই মাসের মধ্যে ডাটা কালেকশন কমপ্লিট হয়ে যাবে। মন্ত্রী বলেন, আগে উপজেলায় বসে তথ্য সংগ্রহ করা হতো। এখন তথ্য সংগ্রহকারীরা সুবিধাভোগীদের বাসায় গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করবে। তথ্য সংগ্রহে সরকারি লোকবল বাড়ানো হবে বলে জানান তিনি।
আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যাপক বরাদ্দ বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছে সরকার। সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতীয় সংসদে বাজেট পেশকালে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণের জন্য এক লাখ ৪৪ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেছেন, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় উল্লেখযোগ্য। এই বাজেটে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির আওতায় ৪১ লাখ নারীকে মাসিক দুই হাজার ৫০০ টাকা করে ভাতা প্রদানের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। বাজেট প্রস্তাবনা অনুযায়ী, ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্পের জন্য আগামী অর্থবছরে ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
চলতি অর্থবছর থেকেই পরীক্ষামূলক ভিত্তিতে ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্পের বাস্তবায়ন শুরু হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ১০ মার্চ নারীপ্রধান পরিবারগুলোর জন্য এ প্রকল্পের উদ্বোধন করেন। এখন পর্যন্ত ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিতে তিন ধাপে (১০ মার্চ ২০২৬ হতে ১৭ জুন ২০২৬ পর্যন্ত) ৬৯ হাজার ৩৮৭টি কার্ড দেওয়া হয়েছে।