Image description

আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতিতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে রাজধানীর কাছে অন্যতম প্রধান শিল্প ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র নরসিংদী। একসময়ের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাময় এই জেলা এখন প্রকাশ্য ডাকাতি, নৃশংস হত্যাকাণ্ড এবং এলাকা দখলের সহিংসতায় জর্জরিত। এর ফলে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা।

নিরাপত্তাহীনতার এই ভয়াবহ রূপ সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে প্রত্যন্ত চরাঞ্চলগুলোতে। সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো আগ্নেয়াস্ত্র, টেটা, হেলমেট এমনকি বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ব্যবহার করে পুরোদস্তুর যুদ্ধে লিপ্ত হচ্ছে। অন্যদিকে, মহাসড়কগুলো হয়ে উঠেছে ডাকাতির অভয়ারণ্য। সেখানে ডাকাতদের সামান্যতম প্রতিরোধ করতে গেলেই প্রাণ হারাতে হয়।

সরকারি তথ্য থেকেই জেলার এই আইনশৃঙ্খলার অবনতির ভয়াবহ চিত্র পাওয়া যায়। জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির কাছে জমা দেওয়া পুলিশের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসের মধ্যে নরসিংদীতে ১৩৫ জন মানুষ খুন হয়েছেন। আগের বছরের একই সময়ের ৬৪টি হত্যাকাণ্ডের তুলনায় এই সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি। ২০২৪ সালের আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর জেলাটিতে প্রতি মাসে গড়ে নয়জন করে মানুষ হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন।

পরবর্তী সাত মাসের সরকারি পরিসংখ্যান কর্তৃপক্ষ প্রকাশ না করলেও গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনবরত রক্তপাতের কথাই বলছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাসে আটটি এবং জুনের প্রথম ১৫ দিনেই পাঁচটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।

স্থানীয় বিশিষ্টজনেরা এই সংকটের পেছনে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবক্ষয়কে দায়ী করছেন। নরসিংদী জজ কোর্টের আইনজীবী তুষার মিত্র জানান, দীর্ঘদিনের পারিবারিক শত্রুতা ও এলাকা দখলের লড়াইয়ের কারণে বড় বড় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। এর পাশাপাশি মাদকের অপব্যবহারের ফলে ছোটখাটো কিন্তু অত্যন্ত নৃশংস অপরাধের মাত্রা অনেক বেড়ে গেছে।

তিনি বলেন, মাদক ও ইজি-বাইক ছিনতাইয়ের মতো তুচ্ছ কারণে সামান্য লাভের জন্য বড় বড় খুনের ঘটনা ঘটে।

ব্যবসায়ী সমাজও এই পরিস্থিতি নিয়ে সমানভাবে উদ্বিগ্ন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রমে অসন্তোষ প্রকাশ করেন নরসিংদী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি রাশেদুল হাসান রিন্টু।

তিনি বলেন, চুরি, ডাকাতি ও হত্যাকাণ্ড দিন দিন বাড়ছে। তবে কেবল পুলিশি তৎপরতা দিয়ে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। তার মতে, বেকারত্ব এবং মাদক সমস্যা দূর করা গেলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হবে এবং বিনিয়োগের উপযোগী পরিবেশ তৈরি হবে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে এই অস্থিতিশীলতা চরম আকার ধারণ করে। এর ফলে চাঁদাবাজি, কিশোর অপরাধী চক্রের তৎপরতা এবং অনিয়ন্ত্রিত মাদক চোরাচালান মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পায়। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অপরাধী চক্রের কর্মকাণ্ড কিছুটা কমলেও অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের বিস্তার এখনো বড় হুমকি হয়ে রয়েছে।

অস্ত্র ও মাদক অনুপ্রবেশের জন্য নরসিংদীর কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থানকে দায়ী করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সীমান্তবর্তী এই জেলার উন্নত সড়ক, রেল ও নৌপথের নেটওয়ার্ক অপরাধীদের পালানোর পথ এবং মাদক চোরাচালানের প্রধান ট্রানজিট রুটে পরিণত হয়েছে।

এই সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের সহিংস লড়াই। দীর্ঘ দুই দশক পর নরসিংদীতে প্রভাব ফিরে পাওয়া বিএনপির বিভিন্ন উপদল এখন নিজেদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী অভ্যন্তরীণ কোন্দলে লিপ্ত। কেবল ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসেই আলোকবালী ইউনিয়ন দলীয় কোন্দলের কারণে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল। সেখানে পৃথক অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষের ঘটনায় বিএনপি কর্মী ইদন মিয়া, গৃহবধূ ফেরদৌসী বেগম এবং যুবদল নেতা সাদেক মিয়া গুলিতে নিহত হন।

নরসিংদীর পুলিশ সুপার মো. আব্দুল্লাহ আল ফারুক অবশ্য পুলিশের ভূমিকার পক্ষে কথা বলেছেন। তিনি দাবি করেন, নিখুঁত তদন্তের মাধ্যমে জেলার ৯০ শতাংশ হত্যা মামলার আসামিদের আইনের আওতায় আনা হয়েছে। তিনি আরও জানান, গত ছয় মাসে পুলিশি অভিযানে ২১টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারসহ ২২ জন বন্দুকধারী, ৭০ জন ডাকাত এবং ২৪ জন সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে পুলিশের এই আশ্বাস সত্ত্বেও নরসিংদীর সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে গ্রাস করে রেখেছে আতঙ্কের পরিবেশ।

একটির পর একটি হত্যাকাণ্ড
নরসিংদীতে একের পর এক নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সাধারণ মানুষকে চরম আতঙ্কের মধ্যে ফেলেছে। মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে মৃত্যুর সংখ্যা হু হু করে বাড়তে থাকায় বাসিন্দারা গভীর উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন।

মে মাসের ৭ তারিখে বেলাবো, রায়পুরা ও মাধবদী থেকে পুলিশ তিনটি মরদেহ উদ্ধার করলে এই ভয়াবহ ধারার সূত্রপাত ঘটে। এরপর ২২ মে পলাশের মাঝেরচর গ্রামে আশিক ভূঁইয়া নামের এক যুবককে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়। এর মাত্র দুই দিন পর, ২৪ মে রায়পুরার হাটুভাঙ্গা স্টেশনের কাছে নিজের দোকান থেকে ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম মুন্সীর রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। একই দিনে রায়পুরার পিরিজকান্দি রেলগেটের কাছে একটি মুরগির খামারে ইয়াসমিন ওরফে সুমন নামের আরেক ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়।

জুন মাস শুরু হতেই স্থানীয় ইজিবাইক চালকেরা ঘাতকদের মূল লক্ষ্যে পরিণত হন। গত ২ জুন নরসিংদী সদর উপজেলার মধ্য শিলমান্দির একটি পুকুর থেকে ফাহিম মিয়া নামের এক চালকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মূলত তার ইজিবাইকের ব্যাটারি ছিনতাইয়ের জন্যই তাকে হত্যা করা হয়েছিল। একইভাবে ১৩ জুন সারোয়ার হোসেন নামের আরেকজন চালক তার ইজিবাইক নিয়ে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হন। ছিনতাই হয় তার ইজিবাইক। দুই দিন পর নজরপুরের বেড়িবাঁধ এলাকা থেকে পুলিশ তার ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করে।

আইনশৃঙ্খলার এই চরম অবনতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয় গত ১৬ জুন। রায়পুরার নীলক্ষা এলাকায় ভয়াবহ সংঘর্ষে তিনজন নিহত এবং বহু মানুষ আহত হন। স্থানীয় চরাঞ্চলে ঘটে যাওয়া এই সংঘর্ষে শিউরে ওঠার মতো দৃশ্য দেখা যায়। সেখানে হেলমেট, বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট এমনকি পুলিশের ভেস্টের মতো যুদ্ধ সরঞ্জাম পরে প্রতিপক্ষ দলগুলো একে অপরের বিরুদ্ধে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে প্রচণ্ড গোলাগুলিতে লিপ্ত হয়।

পুরো জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম বিপর্যয়কেই স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলে এই ঘটনা।