নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলায় সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করা গৃহবধূ স্বামী ও শিশু সন্তান নিয়ে চারদিন ধরে হাসপাতালেই অবস্থান করছেন। আসামি পক্ষের অব্যাহত হুমকির মুখে তারা বাড়ি ফিরতে পারছেন না। এ অবস্থায় ওই নারী আরও অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। শ্বাসকষ্ট হওয়ায় তাঁকে কৃত্রিমভাবে অক্সিজেন দিয়ে রাখতে হচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জ জেনারেল (ভিক্টোরিয়া) হাসপাতালে অবস্থান করছে ওই পরিবার। গতকাল বুধবার রাত ৮টায় মোবাইল ফোনে কথা হলে ওই নারীর স্বামী এসব তথ্য জানান। এদিকে, মামলার পর অভিযুক্ত স্থানীয় এক যুবদল নেতাসহ দুইজনকে গ্রেপ্তার করে পাঁচ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠায় পুলিশ। আদালত এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। গতকাল রিমান্ড শেষে অভিযুক্তদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।
অভিযুক্তরা হলেন– জামপুর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম শহীদ, তাঁর সহযোগী একই এলাকার শাহিন মিয়া ও শুভ মিয়া। শহিদুল ইসলাম শহীদকে যুবদল থেকে ইতোমধ্যে বহিষ্কার করা হয়েছে। অন্য দুজনও যুবদলের কর্মী। শুভ পলাতক রয়েছেন।
সোনারগাঁ থানার ওসি মো. গোলাম সারোয়ার বলেন, ভিকটিম ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তার জন্য সব সময় যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। থানার সামনে এক যুবক তাঁর স্বামীকে বকাঝকা করছিল। তাঁকে ধরে এনে চড়-থাপ্পড় দিয়ে শাসানো হয়েছে। ভিকটিম হুমকির বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে চাইলে পুলিশ ব্যবস্থা নেবে। পরিবারটি অসহায় হওয়ার কারণে পুলিশ কর্মকর্তারা ব্যক্তিগতভাবে আর্থিক সহযোগিতা করছেন বলেও জানান তিনি।
পুলিশ ও ভুক্তভোগীর পরিবার সূত্রে জানা যায়, উপজেলার একটি গ্রামে ভাড়া বাসায় দুই সন্তান নিয়ে বসবাস করেন ওই দম্পতি। ১০ জুন বিকেলে রাজমিস্ত্রি স্বামী কর্মস্থলে থাকাকালে অভিযুক্তরা বাড়িতে ঢুকে। দুই শিশু-সন্তানকে জিম্মি করে গৃহবধূকে পাশের বাড়ির একটি কক্ষে নিয়ে ধর্ষণ করেন তারা।
ভুক্তভোগী নারীর স্বামীর অভিযোগ, ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর প্রভাবশালী কয়েকজন ব্যক্তি সালিশের মাধ্যমে মীমাংসার চেষ্টা করেন। দুদিন পর শুক্রবার বিকেলে ভুক্তভোগী নারী সোনারগাঁ থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন। মামলার পরপরই পুলিশ অভিযান চালিয়ে দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করে। তবে থানায় মামলা দিতে গেলে বিএনপির এক প্রভাবশালী নেতা মামলা দিতে বাধা দেন। সেখানেও ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে বলে দাবি করেন ওই নারীর স্বামী। তবে তিনি নিরাপত্তার কারণে ওই নেতার নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি।
তিনি আরও জানান, ঘটনার পর থেকে অব্যাহত হুমকি পাচ্ছেন। গত সোমবার সাড়ে ১১টার দিকে হাসপাতালে গিয়েও অভিযুক্ত শহীদের ভাই পাঁচ-ছয়জন নিয়ে মীমাংসার জন্য চাপ দেন। তিনি রাজি না হওয়ায় হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। থানার ওসি গত মঙ্গলবার তাঁকে থানায় ডাকেন। তিনি যখন যান সে সময় ওসি ছিলেন না। তখন আসামিদের রিমান্ড চলছিল। ওই সময় আসামিদের আত্মীয়-স্বজন ও দুই বন্ধু তাঁকে মামলা তুলে নিতে চাপ দেন। তিনি রাজি না হওয়ায় তাঁরা গলা কেটে ফেলার ইঙ্গিত দেন।
মামলার পর গত শনিবার ভুক্তভোগীকে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য নারায়ণগঞ্জ জেনারেল (ভিক্টোরিয়া) হাসপাতালে নিয়ে যায় পুলিশ। ওই দিনই পরীক্ষা শেষ হলেও নিরাপত্তার অভাবে এখনও তারা সেখানে অবস্থান করছেন। ভুক্তভোগী নারীর স্বামী জানান, বর্তমানে তারা হাসপাতালে অবস্থান করছেন। পত্রপত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ার পর তাঁর দুই সন্তান ও তাঁকে একটি বেডের ব্যবস্থা করে দেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
ভিক্টোরিয়া জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার মো. জহিরুল ইসলাম তাঁকে বেডের ব্যবস্থা করে দেন। তাঁর স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বলে জানান তিনি। তিন শ্বাসকষ্টে ভুগছেন। সার্বক্ষণিক অক্সিজেন দিয়ে রাখা হয়েছে তাঁকে। ডা. জহিরুল ইসলাম জানান, ওই নারী ভয়ের কারণে শ্বাসকষ্টে ভুগছেন। আশা করি দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবেন। নারীর ডাক্তারি পরীক্ষা গত শনিবারই হয়েছে। বিবাহিত নারী হওয়ার কারণে তাঁর শরীরে একাধিক ব্যক্তির বীর্য রয়েছে কিনা সেটা জানতে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য নমুনা ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। রিপোর্ট এলে বিস্তারিত বলা যাবে।
সোনারগাঁ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোহাম্মদ জামালউদ্দিন বলেন, সংঘবদ্ধ ধর্ষণের মামলা করা নারীর পরিবারের নিরাপত্তা পুলিশ নিশ্চিত করবে। আসামিদের রিমান্ড শেষে গতকাল বুধবার তাদের আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে।