আইফোন ও অটোরিকশা ছিনতাই করতে চালক নাজমুল ইসলামকে ফাঁসি দিয়ে হত্যার পর মরদেহ পুড়িয়ে কয়লা বানাতে চেয়েছিল তিন ভাই। তাতে ব্যর্থ হয়ে পরিচয় গোপন করতে মরদেহের মুখমণ্ডল ঝলসে দেওয়া হয়। এরপর নাজমুলের অটোরিকশা করেই তার মরদেহ কালিজিরা ব্রিজে নিয়ে বস্তায় ভরে ফেলা হয় নদীতে।
গত সোমবার (১৫ জুন) সকালে কালিজিরা নদী থেকে অটোরিকশাচালক নাজমুলের বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধারের দুই দিনের মাথায় হত্যাকাণ্ডে জড়িত মা-ছেলেসহ একই পরিবারের চারজনকে গ্রেপ্তারের পর বেরিয়ে আসে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য। এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা শুনে বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী অভিযুক্তদের বাড়িঘর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে।
নাজমুল বরিশাল সদর উপজেলার রায়পাশা-কড়াপুর ইউনিয়নের মাকরকাঠি এলাকার বাসিন্দা আব্দুল রশিদ মোল্লার ছেলে। পেশায় রিকশাচালক ছিলেন তিনি। তার সাত মাসের একটি কন্যা সন্তান রয়েছে।
বুধবার (১৭ জুন) সকালে বরিশাল সিটি করপোরেশনের ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের জাগুয়া নতুন হাট এলাকার হাওলাদার বাড়িতে এ ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এর আগে ওই বাড়ি থেকেই গ্রেপ্তার করা হয় মৃত ইউনুস হাওলাদারের ছেলে মিরাজ হাওলাদারকে।
এছাড়াও মিরাজের মা ফরিদা বেগম, স্ত্রী আসমা আক্তার এবং বড় ছেলের স্ত্রী শিল্পী বেগমকেও আটক করে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। তবে ঘটনার মূল মাস্টারমাইন্ড মিরাজের অপর দুই ভাই রিয়াজ ও ইমরান আত্মগোপনে রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এদের মধ্যে ইমরান ঘটনার মূল হোতা বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এছাড়া ছিনতাই হওয়া নাজমুলের অটোরিকশাটিও উদ্ধার করেছে পুলিশ। সন্ধ্যার দিকে বাবুগঞ্জ উপজেলার মাধবপাশা ইউনিয়নের পূর্ব পাংশা এলাকায় একটি বাড়ির সামনে পরিত্যক্ত অবস্থায় অটোরিকশাটি উদ্ধার করা হয়।
এর আগে দুই দিন নিখোঁজ থাকার পর গত ১৫ জুন সকালে বরিশাল নগরীর ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের কালিজিরা নদীতে ভাসমান অবস্থায় অটোরিকশা চালক নাজমুল হোসেনের (২৫) বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এই ঘটনায় একটি হত্যা মামলা হয়েছে।
জানা গেছে, গত শনিবার (১৩ জুন) সকালে প্রতিদিনের মতো অটোরিকশা নিয়ে বাড়ি থেকে বের হন নাজমুল। দুপুর থেকে নাজমুলের ফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেনি। পরে রোববার (১৪ জুন) নিহতের পিতা আব্দুল রশিদ মোল্লা বরিশাল মেট্রোপলিটনের এয়ারপোর্ট থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। এরপর স্থানীয়দের সহায়তায় ১৫ জুন সকালে কালিজিরা নদী থেকে তার বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এদিকে হত্যাকাণ্ড নিয়ে তদন্ত শেষ না করে বিস্তারিত জানাতে অপরাগতা প্রকাশ করেছেন পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। তবে হত্যাকাণ্ডের লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন স্থানীয়রা। পুলিশের তদন্ত কার্যক্রমের সময় ঘটনাস্থলে থাকা একাধিক সূত্র জানিয়েছে, মূলত একটি আইফোন এবং অটোরিকশা ছিনতাইয়ের জন্য হত্যা করা হয়েছে নাজমুলকে।
হত্যার বর্ণনা দিয়ে তারা বলেন, নাজমুলকে অপহরণের পর তাকে নিজ এলাকায় নিয়ে যায় মিরাজসহ তার তিন ভাই। এরপর জাগুয়া এলাকায় একটি টিনশেড ঘরের মধ্যে নিয়ে তাকে মারধর এবং পরে গলায় ফাঁস দিয়ে তাকে হত্যা করা হয়।
পরে লাশ পুড়িয়ে আলামত নষ্ট করার জন্য সে ঘরেই বস্তাবন্দি অবস্থায় রাখা হয় নাজমুলের মরদেহ। প্রচণ্ড গরমে পচে গন্ধ ছড়াতে থাকে। এজন্য ১৪ জুন গভীর রাতে পাশের একটি গাছে ঝুলিয়ে মরদেহ পুড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে তিন ভাই। কিন্তু প্রচণ্ড দুর্গন্ধের কারণে পোড়াতে পারেনি তারা। এজন্য মরদেহের পরিচয় আড়াল করতে শুধু মুখমণ্ডল আগুনে ঝলসে দেয়। এরপর সেই রাতেই নিহত নাজমুলের অটোরিকশায় করে মরদেহ কালিজিরা ব্রিজের নিচে ফেলে দেওয়া হয়।
স্থানীয় সূত্রগুলো আরও জানায়, এই হত্যাকাণ্ডে তিন ছেলের সাথে মা এবং তাদের স্ত্রীরাও সম্পৃক্ত রয়েছেন। হত্যার পর ঘরে পড়ে থাকা নাজমুলের রক্ত মোছার জন্য গরম পানি করে দেন তাদের মা। তাছাড়া মরদেহ সরাতে সহযোগিতা করে ঘরের দুই বউ।
বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের এয়ারপোর্ট থানার ওসি মিজানুর রহমান বলেন, মৌখিকভাবে এমন অভিযোগ শোনা যাচ্ছে। তবে বিষয়টি নিশ্চিত হতে ঘটনার মূল মাস্টার মাইন্ড ইমরানকে প্রয়োজন। কেননা তার পরিকল্পনায় নাজমুলকে হত্যা করা হয়েছে। সে আত্মগোপনে রয়েছে। তাকে ধরতে পারলেই বিষয়টি পরিষ্কার হবে।
তিনি বলেন, নাজমুল হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এখন পর্যন্ত পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে আত্মগোপনে থাকা ইমরানের এক ভাই, দুই ভাবি, মা এবং ভগ্নিপতি সাইদুল ইসলাম। তাদের মধ্যে চারজনকে বুধবার বিকেলে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। আর বোন জামাইকে আগেই গ্রেপ্তার করা হয়। যারা গ্রেপ্তার হয়েছে তারা সবাই হত্যাকাণ্ড এবং মরদেহ গুমে ইমরানকে সহযোগিতা করেছে।
বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কমিশনার (উপপুলিশ কমিশনার ক্রাইম ম্যানেজমেন্ট) আব্দুল হান্নান বলেন, মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় মিরাজ নামের একজনের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। এছাড়া প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, তার দুই ভাইও জড়িত। তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
তিনি আরও বলেন, অভিযুক্ত মিরাজের পাশাপাশি তার মা, স্ত্রী এবং ভাবিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নেওয়া হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা আছে কি না সে বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এ ছাড়া আলামত সংগ্রহ করেছে সিআইডি টিম।
ভারপ্রাপ্ত কমিশনার বলেন, হত্যাকাণ্ডের ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার পর স্থানীয় বিক্ষুব্ধ জনতা অভিযুক্তদের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগ করেছে। ঘটনা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।