পুলিশ, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব), ডিবি এবং যৌথ বাহিনীর বারবার অভিযানেও রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকায় অপরাধের মাত্রা কোনোভাবেই কমছে না। দিন দিন আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠছে অপরাধীরা। এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপরও হামলা চালাতে দ্বিধাবোধ করছে না তারা।
চাপাতি ও বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ডাকাতি, ছিনতাই এবং সশস্ত্র হামলার অসংখ্য ভিডিও প্রতিদিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে, যা ওই এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির কথাই ফুটিয়ে তোলে।
গত ২০২৪-এ রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং বিএনপি সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বেশ কিছু বিশেষ অভিযান চালিয়েছে। তবে কর্তৃপক্ষ স্বীকার করছে, এই এলাকার অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা এখনও বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সম্প্রতি প্রকাশ্য দিবালোকে এক মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টের ওপর হামলা চালিয়ে ৩ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের একটি ঘটনা ঘটে। এর পর মোহাম্মদপুরের বেড়িবাঁধ এলাকায় পুলিশ অভিযানে নামলে অপরাধীদের সাথে তাদের সংঘর্ষ হয়। এই বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় কিশোর গ্যাং ‘কব্জিকাটা আনোয়ার গ্রুপ’-এর চার সন্দেহভাজন সদস্য এবং পুলিশের দুই কর্মকর্তা আহত হন। পরে পুলিশ ওই চার সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করে এবং তাদের কাছ থেকে বেশ কিছু অস্ত্র উদ্ধার করে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দিনের বেলা পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে শান্ত মনে হলেও সন্ধ্যা নামার সাথে সাথেই সশস্ত্র গ্যাংগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে। তারা ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা এবং সহিংস সংঘর্ষে লিপ্ত হয়।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান ও পুলিশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ ওমর ফারুক এই পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, মোহাম্মদপুর এলাকায় অতিরিক্ত জনসংখ্যার ঘনত্ব, ভাসমান মানুষের সংখ্যা এবং সরু গলির গোলকধাঁধার কারণে অপরাধীরা অপরাধ করার পর খুব সহজেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে যেতে পারে। তিনি আরও বলেন, এই এলাকার ভৌগোলিক এবং জনমিতিক বৈশিষ্ট্যের কারণেই মূলত এখানে কার্যকরভাবে অপরাধ দমন করা পুলিশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন নজরুল ইসলাম স্থানীয় অপরাধীদের এই ক্রমবর্ধমান দুঃসাহসের কথা স্বীকার করেন। তিনি জানান, এই এলাকায় মূলত নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষের বসবাস এবং জনসংখ্যার ঘনত্ব অনেক বেশি। কম খরচে থাকার সুবিধা, বেকারত্ব এবং জেনেভা ক্যাম্পের উপস্থিতির কারণে এখানে নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্ম হচ্ছে।
তবে তিনি জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
মোহাম্মদপুর জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার আব্দুল্লাহ আল মামুনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই এলাকায় বর্তমানে ১৫০ থেকে ২০০ সদস্যের অন্তত ২০ থেকে ২৫টি কিশোর গ্যাং সক্রিয়। তিনি বলেন, এই কিশোর অপরাধীরা প্রায়ই চাপাতি, সামুরাই তলোয়ার, সুইচব্লেড ও ছুরি উঁচিয়ে এলাকার বাসিন্দাদের মনে আতঙ্ক তৈরি করে। পুলিশ প্রতিদিন গড়ে তিন থেকে চারজন ডাকাতির সন্দেহভাজন এবং ১৫ থেকে ১৬ জন মাদক ব্যবসায়ী ও অন্যান্য অপরাধীকে গ্রেপ্তার করছে, যার মধ্যে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরাও রয়েছে। পরে তাদের আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আদালতে পাঠানো হচ্ছে।
জামিন পেয়ে আরও বেপরোয়া অপরাধীরা
আদাবর বাজারের স্থানীয় ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন, অনেক অপরাধী আদালত থেকে জামিনে বের হয়ে আসার পর আরও বেশি সহিংস ও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। এর ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য অপরাধ দমন করা একটি অন্তহীন চক্রে পরিণত হয়েছে।
কিশোর গ্যাংগুলোর সবচেয়ে বেশি তৎপরতার কারণে এ সমস্যা বসিলা এলাকায় আরও বেশি প্রকট। পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, অনেক আসামি জামিনে মুক্তি পাওয়ার পরপরই আইনি লড়াইয়ের পেছনে খরচ হওয়া টাকা তুলতে আবারও অপরাধ জগতে ফিরে আসে। এই প্রবণতা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সম্পদ ও জনবলের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
ক্ষমতার লড়াইয়ে বাড়ছে সহিংসতা
শেখেরটেক, আদাবর, মনসুরাবাদ হাউজিং এবং তাজমহল রোডের বাসিন্দারা জানান, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মাদক ব্যবসা, ফুটপাত এবং স্থানীয় ব্যবসা কেন্দ্রগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য অপরাধী চক্রগুলোর তৎপরতা বহুগুণ বেড়ে গেছে। নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপগুলো প্রায়ই অবৈধ অস্ত্রের মহড়া দেয়, নিজেদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।
জেনেভা ক্যাম্পের আশেপাশের বাসিন্দাদের অভিযোগ, পুলিশ মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়ে মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তার করলেও সেখানে মাদক সিন্ডিকেটের কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। তারা মামলার তদন্ত এবং আদালতের বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতাকে দায়ী করে বলেন, এই ধীরগতির কারণে আসামিরা খুব দ্রুত জামিন পেয়ে যায় এবং বাইরে এসে আবার তাদের পুরনো অপরাধের ব্যবসা শুরু করে।
একইভাবে বাবর রোডের দোকানদাররা অভিযোগ করেন, বেশ কিছু কুখ্যাত অপরাধী স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ছত্রছায়ায় রয়েছে। এই রাজনৈতিক বা সামাজিক আশ্রয়ের কারণে তারা অনেকটা নির্ভয়ে এবং বুক ফুলিয়ে এলাকায় ছিনতাই, ডাকাতি ও চাঁদাবাজি চালিয়ে যাচ্ছে।
একাধিক সূত্র মোহাম্মদপুরের এই আশঙ্কাজনক নিরাপত্তা পরিস্থিতির পেছনে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট মোহাম্মদপুর থানায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাকে একটি বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। সেই ঘটনার পর থেকে এলাকায় পুলিশের উপস্থিতি কমে যাওয়া এবং কঠোর আইন প্রয়োগের অভাবের কারণে অপরাধীদের মনে আইন ও প্রশাসনের প্রতি ভয় অনেকটাই কমে গেছে।
মোহাম্মদপুরের দীর্ঘদিনের বাসিন্দা ডিএমপির সাবেক কমিশনার শেখ মোঃ সাজ্জাত আলী এই সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে এলাকার বিশাল ভাসমান জনগোষ্ঠীকে চিহ্নিত করেন। তিনি বলেন, বরিশাল, ভোলা ও নদীমাতৃক চরাঞ্চলের বহু মানুষ এখানে সাময়িকভাবে বসবাস করে। এদের মধ্যে কিছু মানুষ অপরাধ করে সহজেই অন্য কোথাও পালিয়ে যায়। এর ফলে পুলিশ তাদের সঠিক ঠিকানা খুঁজে বের করতে হিমশিম খায়। এর পাশাপাশি ক্রমবর্ধমান বেকারত্বও সাধারণ মানুষকে অপরাধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
এখানকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুনরায় পুরোপুরি স্বাভাবিক করতে সাজ্জাত আলী মোহাম্মদপুর জোনজুড়ে পুলিশের জনবল বৃদ্ধি এবং নিয়মিত টহল ব্যবস্থা আরও জোরদার করার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।