Image description
নীরব মহামারি অনলাইন জুয়া : পর্ব-১

দেশে নতুন এক নীরব মহামারি হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে অনলাইন জুয়া বা গ্যাম্বলিং। ইন্টারনেটের সহজলভ্যতাকে কাজে লাগিয়ে মাদকের চেয়েও ভয়ংকর এই নেশায় আসক্ত করা হচ্ছে দেশের তরুণ ও যুবসমাজকে। রাতারাতি বড়লোক হওয়ার লোভে পড়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছে হাজারো মানুষ। ফলে সমাজে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে পারিবারিক কলহ, ডিভোর্স, চুরি-ছিনতাই এমনকি আত্মহত্যার মতো ঘটনাও। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে উঠে এসেছে, চীন-নাইজেরিয়াসহ বিদেশি বিভিন্ন চক্রের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে এসব জুয়া সাইট। দেশীয় এজেন্টের পাশাপাশি মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) কিছু অসাধু কর্মীও এর সঙ্গে জড়িত। তাদের হাত ধরে প্রতিদিন বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে কোটি কোটি টাকা। অভিযান চালিয়ে সাইট বন্ধ ও জড়িতদের গ্রেফতার করা হলেও দুর্বল আইন এবং মূল চক্র দেশের বাইরে থাকায় এই ডিজিটাল থাবা পুরোপুরি নির্মূল করতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টার-দক্ষিণ) সৈয়দ হারুন অর রশীদ যুগান্তরকে বলেন, অনলাইন জুয়ার বিস্তার ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। আমরা প্রতিনিয়ত সাইবার প্যাট্রোলিং অব্যাহত রেখেছি। জুয়াসহ অনলাইনকেন্দ্রিক যত ধরনের প্রতারণা রয়েছে সেগুলো প্রতিরোধে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অনলাইন জুয়ার সঙ্গে মানি লন্ডারিং জড়িত। কেননা জুয়ার টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তদন্তের ক্ষেত্রে মানি লন্ডারিংয়ের অংশটা আমাদের তফসিল ভুক্ত না হওয়াতে তদন্ত করতে পারছি না। মানি লন্ডারিং সিআইডি ছাড়া অন্য কেউ তদন্ত করতে পারে না। তবে যে হারে জুয়ার বিস্তার বাড়ছে সিআইডির একার পক্ষে সব তদন্ত করা সম্ভব নয়।

গোয়েন্দা সূত্র বলছে, বাংলাদেশে নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও অনলাইন জুয়ার বহু ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপস দেদার পরিচালিত হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া হচ্ছে চটকদার বিজ্ঞাপন। ওয়েবসাইটের মধ্যে বহুল পরিচিত-মেল বেট, মোস্ট বেট, ওয়ানএক্স বেট, টুয়েন্টি টু বেট, বেট উইনার ও জেটবাজ। এসব সাইটে স্পোর্টস, ক্যাসিনো, সল্ট গেম ও টেবিল গেম বেশি খেলা হয়। দেশে এসব অনলাইন জুয়ার বিস্তারের নেপথ্যে কাজ করছে বিদেশি নাগরিকরা। তাদের একটি অংশ বাংলাদেশে বিশেষ করে ঢাকা শহরে, আরেকটি অংশ দুবাই, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য, ভারত, পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশে অবস্থান করে অনলাইন জুয়া নিয়ন্ত্রণ করছে। বাংলাদেশে অবস্থানকারীদের বেশির ভাগই চীন ও নাইজেরিয়ার নাগরিক।

এদিকে জুয়ার নিয়ন্ত্রক বিদেশি ওইসব নাগরিককে সহায়তা করছে বাংলাদেশি একাধিক চক্র; যারা এজেন্ট নামে পরিচিত। অনলাইন জুয়ার বাংলাদেশি এসব এজেন্ট ১৪ থেকে ২০ ভাগ কমিশন পেয়ে থাকে। অনলাইন জুয়ার এসব চক্রের কাছে অনেকটাই অসহায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। প্রযুক্তি জ্ঞানে দক্ষ বিদেশি নাগরিকদের শনাক্তে খুব একটা সাফল্যও পাচ্ছে না তারা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যারা খুব বেশি ঝুঁকি নিতে পছন্দ করে তারাই অনলাইন জুয়ায় আসক্ত বা আগ্রহী হয়। এতে হার-জিত দুটোই আছে। তবে পূর্বপরিকল্পিতভাবে অনলাইন জুয়ার সফটওয়্যার এমনভাবে ডিজাইন করা, যার ফলে মাঝে মাঝে খেলোয়াড় জয়ের মুখ দেখে। তখন খেলোয়াড় মনে করে এর আগে যেটা লস করেছে সেটা এবার উসুল করে নেবে। কিন্তু জুয়া খেলার নিয়মটাই এমন থাকে বা এমনভাবে প্রলুব্ধ করা হয় যে, শেষ পর্যন্ত খেলোয়াড় লাভ নিয়ে বের হতে পারে না।

জানা গেছে, ১৩ মে অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে বাংলাদেশে অবস্থানকারী ছয় চীনা নাগরিকসহ নয়জনকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের সাইবার ইউনিট। তাদের জিজ্ঞসাবাদে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসে। অনলাইন জুয়ার সঙ্গে বিকাশ ও নগদসহ অন্যান্য এমএফএস প্রতিষ্ঠানের একশ্রেণির অসাধু কর্মীও জড়িত। এর মধ্যে নজরদারিতে আছে বেশ কয়েকজন। ওইসব প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দেওয়ারও উদ্যোগ নিয়েছে তদন্তসংশ্লিষ্টরা।

এছাড়া সিআইডির সাইবার ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড রিস্ক ম্যানেজমেন্ট ইউনিট অনলাইন জুয়া প্রতিরোধে নিয়মিত সাইবার মনিটরিং কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। জুয়ার চারটি সাইট পরিচালনা করে দিনে দুই কোটি টাকার বেশি হাতিয়ে নেওয়া এক চক্রের আট সদস্যকে ৬ মে গ্রেফতার করেছে সিআইডি।

সিআইডি জানিয়েছে, ১ মে থেকে ১৬ জুন পর্যন্ত পরিচালিত সাইবার প্যাট্রোলিংয়ে জুয়ার সঙ্গে জড়িত ওয়েবসাইট শনাক্ত করে সেগুলো বন্ধ করার জন্য বিটিআরসিতে ২৬৮টি ওয়েবসাইটের তথ্য দিয়েছে সিআইডি। এছাড়াও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে জুয়ার লেনদেন করে এমন ৮৭৯ মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট ও বিভিন্ন ব্যাংকের ৪৩টি অ্যাকাউন্ট বন্ধ করতে এবং ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গোয়েন্দা বিভাগকে (বিএফআইইউতে) অনুরোধ জানিয়েছে সিআইডি।

সিআইডি প্রধান (ভারপ্রাপ্ত) ডিআইজি আলি আকবর খান যুগান্তরকে বলেন, সম্প্রতি অনলাইন জুয়া পরিচালনার সঙ্গে সম্পৃক্ত ১১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অনেক সাইট আমরা বিটিআরসির মাধ্যমে বন্ধ করেছি। আরও কিছু প্রক্রিয়াধীন আছে। তবে অনলাইন জুয়া ইন্টারন্যাশনাল লিংকের অংশ। ফলে মূল জায়গায় হাত দেওয়া যাচ্ছে না। তবুও এটিকে সহনশীল পর্যায়ে কিভাবে নিয়ে আসা যায় সেই চেষ্টা করছি।

সূত্র বলছে, বাংলাদেশিদের সহজে প্রলুব্ধ করা যায় বলেই বিদেশি চক্রগুলো এখানে সক্রিয় হচ্ছে। জুয়ায় আসক্ত তরুণরা টাকা জোগাড়ে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি এমনকি খুনের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। ১ মে রাতে কুমিল্লার বরুড়ায় অনলাইন জুয়া খেলা নিয়ে বিরোধের জেরে বন্ধুদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে ১৬ বছর বয়সি কিশোর রাকিব হোসেন গুরুতর আহত হয়। চার দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ৫ মে দুপুরে তার মৃত্যু হয়। ২৬ মে রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরে অনলাইন জুয়ায় আসক্ত মাহবুব নামের এক যুবক তার স্ত্রী আকলিমা আক্তারকে নির্মম নির্যাতনে হত্যা করে। এ ঘটনায় আকলিমার ভাই সুমন বাদী হয়ে একটি মামলা করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সৈয়দ তানভীর রহমান যুগান্তরকে বলেন, অনলাইন জুয়ার নেশা মাদকাসক্তির চেয়েও ভয়ংকর হতে পারে। ব্রেনের (মস্তিষ্ক) যে প্লেজার সেন্টার থাকে বা আনন্দের কেন্দ্র থাকে সেটাকে ফিজিওলজিক্যালি দখল করে ফেলে। যার ফলে এত সহজে কেউ অনলাইন জুয়া থেকে বের হয়ে আসতে পারে না। অনেক লস করার পরও জুয়াড়ির মধ্যে একটা মোটিভেশন কাজ করে; যাকে বলা হয়, রিকভারি মোটিভেশন। তার সাইকোলজি কাজ করে, আগের লস রিকভারি করতে হবে। কিন্তু দিন শেষে ওই জুয়ার সফটওয়্যার বা ওই ক্যাসিনোই লাভবান হয়।