রাত নেমে এসেছে। বিশাল পাহাড়ের বুক চিরে তৈরি একমাত্র সুড়ঙ্গটির দরজা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। শেষ গাড়িটিও শহরে ঢুকে পড়েছে। এখন ভোর হওয়ার আগে আর কেউ আসতে পারবে না, বেরও হতে পারবে না। চারদিকে বরফে ঢাকা পাহাড়, সামনে সমুদ্রের খাঁড়ি, আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে একটি বিশাল দালান। সেই দালানের ভেতরেই ঘুমাতে যাচ্ছে শহরের প্রায় সব মানুষ। শুনতে বিজ্ঞান কল্পকাহিনির মতো লাগলেও এটি বাস্তব। যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কা অঙ্গরাজ্যের ছোট্ট শহর হুইটারে এমনই এক জীবনযাত্রা গড়ে উঠেছে। প্রায় পুরো শহরই যেন একটি ভবনের মধ্যে বাস করে। তাই অনেকেই হুইটারকে বলেন, ‘এক ছাদের নিচের শহর’।
হুইটারের জনসংখ্যা তিন শ’রও কম
যে শহরে প্রতিবেশী মানেই প্রায় পুরো শহর
হুইটারের জনসংখ্যা তিন শ’রও কম। এর মধ্যে প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ মানুষ বাস করেন ১৪ তলা একটি ভবনে, যার নাম বেগিচ টাওয়ার। ভবনটিতে রয়েছে প্রায় দুই শতাধিক আবাসিক ইউনিট। অধিকাংশ পরিবার বছরের পর বছর এখানেই বসবাস করে আসছে। এখানে বসবাস করলে প্রতিবেশী বলতে কেবল পাশের ফ্ল্যাটের মানুষকে বোঝায় না। একই ভবনের লিফটে উঠতে গিয়ে দেখা হয়ে যেতে পারে শহরের মেয়রের সঙ্গে। করিডোরে হাঁটতে গিয়ে দেখা মিলতে পারে স্কুলশিক্ষক, পুলিশ কর্মকর্তা কিংবা মাছধরা নৌকার মালিকের। ছোট্ট এই জনপদে প্রায় সবাই সবাইকে চেনে। অনেক বাসিন্দা মজা করে বলেন, শহরে কোনো গোপন খবর বেশিক্ষণ গোপন থাকে না। কারণ এক দালানের ভেতরে বসবাস করলে সুখ-দুঃখ, উৎসব-অনুষ্ঠান, এমনকি দৈনন্দিন ঘটনাগুলোও খুব দ্রুত সবার জানা হয়ে যায়।
বছরের বড় অংশজুড়ে এখানে বৃষ্টি কিংবা তুষারপাত হয়
যুদ্ধের জন্য নির্মিত, পরে হয়ে উঠল শহর
আজ যে ভবনটিকে সাধারণ আবাসিক ভবন হিসেবে দেখা যায়, তার জন্ম হয়েছিল সামরিক প্রয়োজন থেকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আলাস্কার এই অঞ্চলকে গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি হিসেবে বেছে নিয়েছিল মার্কিন সেনাবাহিনী। চারদিকে উঁচু পাহাড়ে ঘেরা হওয়ায় জায়গাটি আড়াল করে রাখা সহজ ছিল। পাশাপাশি সমুদ্রপথেও যোগাযোগের সুবিধা ছিল। যুদ্ধের পর এবং পরে শীতল যুদ্ধের সময় এখানে সামরিক স্থাপনা গড়ে ওঠে। হাজারের বেশি সৈন্য ও তাদের পরিবারের থাকার ব্যবস্থা করতে বিশাল আবাসিক ভবন নির্মাণ করা হয়। পরবর্তীতে সেনাবাহিনী এলাকা ছেড়ে চলে গেলে ধীরে ধীরে সামরিক ঘাঁটি রূপ নেয় বেসামরিক শহরে। আর সেই সামরিক আবাসনই হয়ে ওঠে বর্তমানের বেগিচ টাওয়ার। ভবনটির নামকরণ করা হয়েছে মার্কিন কংগ্রেস সদস্য Nick Begich–এর স্মরণে। একটি বিমান দুর্ঘটনায় তার মৃত্যুর পর ভবনটির নতুন নামকরণ করা হয়।
দালানের ভেতরেই শহরের প্রয়োজনীয় সবকিছু
বেগিচ টাওয়ারকে কেবল আবাসিক ভবন বললে ভুল হবে। এটি অনেকটা একটি ক্ষুদ্র শহর। এখানে রয়েছে ডাকঘর, ছোট দোকান, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, কাপড় ধোয়ার ব্যবস্থা, প্রশাসনিক কার্যালয় এবং পুলিশ বিভাগের অফিস। শহরের বিদ্যালয়টি অবশ্য আলাদা ভবনে। তবে সেটিও বেগিচ টাওয়ারের সঙ্গে সংযুক্ত। শীতকালে যখন বাইরে তুষারঝড় বয়ে যায়, তখন শিক্ষার্থীরা উষ্ণ পথ ধরে স্কুলে যেতে পারে। বাইরে বরফের স্তূপ জমলেও তাদের ক্লাস বন্ধ হয় না। এই কারণেই হুইটারের বাসিন্দাদের অনেকেই দিনের পর দিন ভবনের বাইরে না গিয়েও স্বাভাবিক জীবন কাটাতে পারেন।
হুইটারে পৌঁছানোর সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো এর প্রবেশপথ
পাহাড়ের ভেতর লুকিয়ে থাকা একমাত্র প্রবেশদ্বার
হুইটারে পৌঁছানোর সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো এর প্রবেশপথ। শহরটিতে স্থলপথে পৌঁছাতে হলে যেতে হবে মেনার্ড পর্বতের ভেতর দিয়ে তৈরি অ্যান্টন অ্যান্ডারসন স্মারক সুড়ঙ্গ পেরিয়ে। প্রায় চার কিলোমিটার দীর্ঘ এই সুড়ঙ্গ উত্তর আমেরিকার দীর্ঘতম যৌথ রেল ও সড়ক সুড়ঙ্গগুলোর একটি। একই পথে ট্রেন ও মোটরযান চলাচল করে। আরও অদ্ভুত ব্যাপার হলো, সুড়ঙ্গটি একসঙ্গে দুই দিকের যানবাহনের জন্য খোলা থাকে না। নির্দিষ্ট সময় পরপর এক দিকের যান চলাচল বন্ধ করে অন্য দিকের যানবাহন ছেড়ে দেওয়া হয়। রাত গভীর হলে সুড়ঙ্গ বন্ধ হয়ে যায়। তখন জরুরি অবস্থা ছাড়া শহরে ঢোকা বা বের হওয়া প্রায় অসম্ভব। ফলে অনেকের কাছেই হুইটার পৃথিবীর সবচেয়ে বিচ্ছিন্ন শহরগুলোর একটি।
বরফ, বৃষ্টি আর সমুদ্রের রাজত্ব
হুইটারের প্রকৃতি যেমন সুন্দর, তেমনি কঠিনও। বছরের বড় অংশজুড়ে এখানে বৃষ্টি কিংবা তুষারপাত হয়। প্রিন্স উইলিয়াম প্রণালির তীরে অবস্থিত হওয়ায় শহরটি প্রচুর বৃষ্টিপাতের জন্য পরিচিত। শীতকালে তীব্র ঠান্ডা আর ঝোড়ো বাতাস পুরো এলাকাকে প্রায় সাদা চাদরে ঢেকে দেয়। তবে গ্রীষ্ম এলে দৃশ্যপট বদলে যায়। বরফগলা পাহাড়, হিমবাহ, জলরাশি আর বন্য প্রাণীর টানে পর্যটকেরা ভিড় জমাতে শুরু করেন। তখন ছোট্ট শহরটির ব্যস্ততা কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
পর্যটকদের পছন্দের এক গন্তব্য এই শহর
পর্যটকদের কাছে কেন এত জনপ্রিয়?
হুইটার কেবল এক দালানের শহর বলেই বিখ্যাত নয়। এটি আলাস্কার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দরও। এখান থেকে পর্যটকেরা প্রমোদতরীতে চড়ে হিমবাহ দেখতে যান, সমুদ্রে মাছ ধরেন কিংবা বন্য প্রাণী পর্যবেক্ষণ করেন। বিশাল পর্বত, নীল জলরাশি এবং দূরের বরফঢাকা চূড়া মিলিয়ে জায়গাটি যেন প্রকৃতির আঁকা এক জীবন্ত ছবি। অনেক ভ্রমণকারী প্রথমে বেগিচ টাওয়ারের অদ্ভুত জীবনযাত্রা দেখতে এলেও পরে মুগ্ধ হয়ে যান আশপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে।
এখান থেকে পর্যটকেরা প্রমোদতরীতে চড়ে হিমবাহ দেখতে যান
পৃথিবীর সবচেয়ে অদ্ভুত শহর?
হুইটারকে কেউ বলেন ভবনের মধ্যে লুকিয়ে থাকা শহর, কেউ বলেন বিশ্বের সবচেয়ে বিচিত্র জনপদ। কিন্তু বাসিন্দাদের কাছে এটি কেবল একটি শহর নয়, বরং একটি বড় পরিবারের মতো। যেখানে একই লিফটে চড়ে স্কুলশিক্ষক, জেলে, পুলিশ কর্মকর্তা আর মেয়র প্রতিদিন নিজেদের কাজে যান। যেখানে তুষারঝড়ের রাতে শত শত মানুষ একই ছাদের নিচে নিরাপদে ঘুমায়। আর যেখানে পুরো শহরকে খুঁজে পেতে আপনাকে ঘুরতে হবে না অসংখ্য রাস্তা, একটি ভবনের ভেতরেই মিলবে প্রায় সব মানুষের দেখা। এ কারণেই আলাস্কার হুইটার পৃথিবীর মানচিত্রে একটি শহর হলেও বাস্তবে একটি বিশাল বাড়ি, যার বাসিন্দারাই মিলে তৈরি করেছে এক অনন্য নগরজীবন।
সূত্র: ট্রাভেল আলাস্কা, স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন, স্নোপস, আলাস্কা পাবলিক মিডিয়া, বিবিসি ট্রাভেল