বসুন্ধরা গ্রুপের মালিকানাধীন দৈনিক কালের কণ্ঠে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। মাত্র ১২ ঘণ্টার ব্যবধানে তিনজন সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত) দেখেছেন পত্রিকাটির সংবাদকর্মীরা।
গতকাল ১৫ জুন সকাল পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন হাসান হাফিজ। ওইদিন সকালেই পত্রিকাটির হেড অব নিউজ ফারুক মেহেদীকে জানানো হয় তাকে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এর প্রেক্ষিতে হাসান হাফিজের অনুপস্থিতিতে বিকাল ৪টার দিকে তিনি সম্পাদকের চেয়ারে বসেন। তবে এরপর হাসান হাফিজ অফিসে এসে রাত ৮টা পর্যন্ত ছিলেন বলে কালের কণ্ঠের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।
তবে গতকাল রাতেই আবার ফারুক মেহেদীকে সরিয়ে নতুন আরেকজনকে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক করা হয়। তিনি হলেন চীফ রিপোর্টারের দায়িত্বে থাকা মেহেদী হাসান তালুকদার।
একটি জাতীয় দৈনিকে এত অল্প সময়ের ব্যবধানে সর্বোচ্চ পদে একাধিক পরিবর্তনের ঘটনা ঢাকার গণমাধ্যম অঙ্গনে আলোচনা তৈরি করেছে। এই রদবদলের কারণ সম্পর্কে কালের কণ্ঠ কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি। তবে পত্রিকাটির ভেতরের একাধিক সূত্র বলছে, সম্পাদক পদে এই পরিবর্তনের পেছনে অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য ও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতা প্রভাব ফেলতে পারে।
সকালে সম্পাদক হয়ে রাতে বাতিল লীগের মনোনয়ন কেনা ফারুক মেহেদী
৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর বিএনপিপন্থী বলয়ের সাংবাদিক হিসেবে পরিচিত হাসান হাফিজকে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে নিয়োগ দেয় বসুন্ধরা গ্রুপের মালিকানাধীন দৈনিক কালের কণ্ঠ কর্তৃপক্ষ। গতকাল সোমবার (১৫ জুন) সকালে হঠাৎ করে তাকে সরিয়ে নতুন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক করা হয় পত্রিকাটির হেড অব নিউজ দায়িত্ব পালন করা ফারুক মেহেদীকে।
এর পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে অভিনন্দন জানিয়ে পোস্ট দেন সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা। ফারুক মেহেদীর নিয়োগ নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমেও খবর প্রকাশিত হয়।
তবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পরিস্থিতি বদলে যায়। ওইদিন রাতেই ফারুক মেহেদীকে সরিয়ে চীফ রিপোর্টার মেহেদী হাসান তালুকদারকে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এবার তালুনকাদের শুভাকাঙ্খীরা সামাজিক মাধ্যমে তাকে অভিনন্দন জানাতে থাকেন।
এই আকস্মিক এরকম একাধিক পরিবর্তনের বিষয়ে 'দ্য ডিসেন্ট'-এর পক্ষ থেকে কালের কণ্ঠের যুগ্ম সম্পাদক সাঈদ খানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, "নামের বিভ্রাট হয়ে গেছে। ভুল করে ফারুক মেহেদী লেখা হয়। দুইজন মেহেদী থাকায় এমন হয়েছে। ওইটা ঠিক করা হয়েছে। রাতে কারেকশন করে দিছে।"
তিনি আরও নিশ্চিত করেন যে, হাসান হাফিজ পুরোপুরি দায়িত্ব থেকে সরে গেছেন এবং মেহেদী হাসান তালুকদার নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।
হাসান হাফিজের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে মন্তব্য করতে চাননা।
অন্যদিকে, মাত্র এক বেলার জন্য ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করা ফারুক মেহেদী বিষয়টিকে কর্তৃপক্ষের ‘সাধারণ সিদ্ধান্ত’ হিসেবেই অভিহিত করে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন।
'দ্য ডিসেন্ট'-এর প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, "এগুলা নিয়ে কিছু বলার নাই আসলে। এটা নিয়ে কর্তৃপক্ষ যে ডিসিশন নিবে, সেটাই হবে। আমি কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাজ করব এবং যাকে নিছে, তাকে নিয়ে তার সাথে আমরা কাজ করব।"
পদ পরিবর্তনের বিষয়টি তাৎক্ষণিক নির্দেশনায় হয়েছে বলেও তিনি জানান।
নতুন দায়িত্ব পাওয়া মেহেদী হাসান তালুকদারের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি চিঠি পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তবে ফারুক মেহেদীর নিয়োগ ও বাতিলের বিষয়ে তিনি অবগত নন বলে জানান। নেটওয়ার্ক জটিলতার কারণে তার সাথে বিস্তারিত কথা বলা সম্ভব হয়নি।
এত রদবদলের নেপথ্যে কী?
কালের কণ্ঠের এই অস্থিরতার পেছনের কারণ কী তা বুঝার জন্য পত্রিকাটির একাধিক কর্মীর সাথে কথা বলেছে দ্য ডিসেন্ট (যাদের কেউই নাম প্রকাশে রাজি হননি)। তাদের কেউই নির্দিষ্ট করে কোন কারণ বলতে পারেননি। তবে তাদের অন্তত দুইজনের ধারণা, আওয়ামীপন্থী সাংবাদিকদেরকে পত্রিকাটিতে ক্ষমতায়িত করার চেষ্টা এবং অফিসের সিনিয়র একাধিক ব্যক্তির মধ্যকার অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব থেকে এমনটি হয়ে থাকতে পারে।
হাসান হাফিজকে সরিয়ে নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত দুইজনকেই তাদের কালের কণ্ঠের একাধিক সহকর্মী আওয়ামীপন্থী সাংবাদিক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এদের মধ্যে প্রথমে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্ব পাওয়া ফারুক মেহেদী সাংবাদিকতা অঙ্গনে পরিচিত মুখ এবং অর্থনীতি ও বাণিজ্য বিষয়ক রিপোর্টিংয়ে তার দীর্ঘ ক্যারিয়ার ও খ্যাতি রয়েছে। তিনি এনবিআর এবং ডিআরইউ-এর মতো প্রতিষ্ঠান থেকে সেরা সাংবাদিকের পুরস্কারও পেয়েছেন।
তবে তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথেও সংশ্লিষ্ট। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি) পড়ার সময় থেকেই তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। ছাত্ররাজনীতির গণ্ডি পেরিয়ে পরবর্তীতে তিনি সরাসরি জাতীয় রাজনীতিতে যুক্ত হতে চান এবং ২০২১ সালে কুমিল্লা-৫ (বুড়িচং-ব্রাহ্মণপাড়া) আসনের উপনির্বাচনে অংশ নিতে তিনি আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছিলেন। সে সময় প্রকাশিত একাধিক সংবাদ প্রতিবেদনে তাকে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
এছাড়াও তিনি মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ও ভারতে পলতাক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে ২০১৯ সালে ‘গ্লোবাল লিডার শেখ হাসিনা দ্য প্রাইম মিনিস্টার অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি সংকলিত বই সম্পাদনা করেছিলেন। তিনি শেখ হাসিনাকে ‘বিশ্বের মুকুটহীন রানী’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
তাকে সরিয়ে দায়িত্ব পাওয়া মেহেদী হাসান তালুকদারকেও একাধিক সহকর্মী আওয়ামীপন্থী বলে জানলেও, দ্য ডিসেন্ট অনলাইনে তার আওয়ামী সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে কোন তথ্য পায়নি। যদিও তালুকদারের ফেসবুক আইডিটি বর্তমানে ডিএক্টিভ রয়েছে।
কালের কণ্ঠের একাধিক কর্মী বলেছেন, বর্তমান নির্বাহী সম্পাদক হায়দার আলীর সাথে অন্য নিউজরুম ম্যানেজারদের কারো কারো ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বও অস্থিরতার পেছনে কিছু ভূমিকা রাখতে পারে। ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে নির্বাহী সম্পাদককে দায়িত্ব দেয়ার বদলে তার অধীনে থাকা দুইজনকে পরপর এই দায়িত্বে নিয়ে আসা থেকে এই দ্বন্দ্বের ইঙ্গিত মেলে বলে তাদের ধারণা।
পত্রিকাটির নির্বাহী সম্পাদক হায়দার আলীকে ফোন করা হলে তিনি ‘আমি মিটিংয়ে আছি। পরে কথা বলব’ বলে কেটে দেন। পরবর্তীতে একাধিকবার একই নম্বর থেকে ফোন করা হলে তার ফোনে আর কল যায়নি।
তবে অন্য নম্বর থেকে তাকে কল করা হলে কল ঢুকলেও তিনি রিসিভ করেননি।