Image description

পাবনার রত্নাই নদী ও শংকরপুর খাল পুনঃখনন প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রভাবশালী দখলদারদের অবৈধ স্থাপনা ও পুকুর রক্ষা করতে গিয়ে অনুসরণ করা হচ্ছে না খনন প্রকল্পের নির্ধারিত সরকারি নকশা। ফলে ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে নদীর পাড়ের শতাধিক পরিবারের বসতভিটা।

আজ মঙ্গলবার সকালে নকশা অনুযায়ী খননের দাবিতে কাজ বন্ধ করে দেয় এলাকাবাসী। পরে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রত্নাই নদী পরিদর্শনে যান পাবনার জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম। স্থানীয়দের ক্ষতি না করে নকশা অনুযায়ী কাজ সম্পন্ন করতে ঠিকাদারদের নির্দেশ দেন তিনি।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন দখল ও দূষণের কারণে মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছিল রত্নাই নদী। নদীর তলদেশে পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি প্রভাবশালী একটি চক্র নদীর মধ্যে আড়াআড়ি বাঁধ নির্মাণ করে গড়ে তোলে বাণিজ্যিক মাছ চাষের পুকুর। এতে স্বাভাবিক পানি প্রবাহসহ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হয়। বর্ষা মৌসুমে পাবনা সদর উপজেলার মালিগাছাসহ কয়েকটি ইউনিয়নের শত শত বিঘা কৃষিজমি জলাবদ্ধতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতো।

এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সম্প্রতি রত্নাই নদী ও শংকরপুর খালের ১০ কিলোমিটার অংশ পুনঃখননের উদ্যোগ নেয় পানি উন্নয়ন বোর্ড। প্রকল্পটির জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয় ৬ কোটি ৯ লাখ টাকা। দরপত্রের মাধ্যমে কাজ পান কুষ্টিয়ার ঠিকাদার নাসিরুদ্দিন মোল্লা। স্থানীয়ভাবে কাজ বাস্তবায়ন করছেন কাওছার আহমেদ কনকসহ কয়েকজন সাব-ঠিকাদার।

সরেজমিনে মালিগাছা ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পাবনা-দাশুড়িয়া মহাসড়কসংলগ্ন মজিদপুর তারা মসজিদ এলাকার দৃশ্যমান অংশে নকশা অনুযায়ী খনন করা হলেও নিয়ম মানা হচ্ছে না ভেতরের গ্রামীণ এলাকায়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের স্থাপনা ও পুকুর রক্ষা করতে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তন করে খননকাজ চালানো হচ্ছে দরিদ্র মানুষের বসতঘেঁষে।

ধরবিলা গ্রামের বাসিন্দা ইদ্রিস আলী অভিযোগ করেছেন, নিয়ম অনুযায়ী উত্তোলিত মাটি দিয়ে নদীর দুই পাড়ে সুরক্ষা বাঁধ নির্মাণের কথা থাকলেও তা করা হচ্ছে না।

তার ভাষ্য, ‘অধিকাংশ মাটি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ায় সামান্য বৃষ্টি বা পানির স্রোতেই পাড় ধসে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এতে নদীপাড়ের শতাধিক পরিবারের ঘরবাড়ি ঝুঁকির মুখে পড়েছে।’

নারায়ণপুর গ্রামের হালিমা খাতুন বলেছেন, ‘নকশা অনুযায়ী খনন না করে রক্ষা করা হচ্ছে প্রভাবশালীদের স্থাপনা। আর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।’

তার আশঙ্কা, ‘আগামী বর্ষায় অনেকের ভিটেমাটি নদীগর্ভে বিলীন হতে পারে।’

তিনি জানান, অনিয়মের প্রতিবাদে স্থানীয়রা একপর্যায়ে কাজ বন্ধ করে দিয়েছিলেন। পরে জেলা প্রশাসকের আশ্বাসে আবার শুরু হয়েছে কাজ।

অনিয়মের অভিযোগ করেছেন স্থানীয় মালিগাছা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সৈয়দ মুনতাজ আলীও। তিনি বলেছেন, নদী খননের উদ্যোগকে স্বাগত জানানো হলেও সিএস নকশা অমান্য করে প্রভাবশালীদের সুবিধা দেওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। এতে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে সরকারের কোটি টাকার প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য।

পাবনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন, কিছু প্রভাবশালী দখলদারের অবৈধ স্থাপনা এবং কয়েকটি আইনি জটিলতায় মাঠপর্যায়ে সিএস নকশা পুরোপুরি বাস্তবায়নে কিছু বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে। তবে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।

জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বার্থ রক্ষা করে অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী কাজ সম্পন্ন করতে পাউবো ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আইনি জটিলতা দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তার ভাষ্য, ‘কোনো ধরনের অনিয়ম বরদাশত করা হবে না।’