Image description

শিক্ষাগত সনদ জালিয়াতি, মিথ্যা পরিচয়ে সুবিধা আদায়, হালাল সনদ বাণিজ্য এবং সহকর্মীর বিরুদ্ধে জাল কাগজের ভিত্তিতে মামলা। একের পর এক এমন নানা গুরুতর অভিযোগ উঠছে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের নবনিযুক্ত মহাপরিচালক (ডিজি) মুহিববুল্লাহিল বাকীর বিরুদ্ধে।

তার বিভিন্ন শিক্ষাগত সনদ, দাপ্তরিক নথি, একাধিক তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন, সরকারি চিঠি, আদালতের কাগজ এবং বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন ঘেঁটে এসব অভিযোগের সপক্ষে তথ্যপ্রমাণ পেয়েছে এশিয়া পোস্ট।

ইসলামের প্রকৃত আদর্শ ও মূল্যবোধের প্রচার, প্রসারে কাজ করে ইসলামিক ফাউন্ডেশন (ইফা)। এমন একটি প্রতিষ্ঠানে ডিজি হিসেবে নিয়োগ পাওয়া মুহিববুল্লাহিল বাকীর নানা কর্মকাণ্ড একদিকে যেমন অনৈতিক অন্যদিকে ইসলামি মূল্যবোধ ও নীতির সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।

বিধি লঙ্ঘন করে একাধিক ব্যাংকের শরিয়াহ বোর্ড ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সদস্য হয়ে আর্থিক সুবিধাও নিয়েছেন মুহিববুল্লাহিল বাকী।

১৩ বছর বয়সে দাখিল, ১৪ বছরে দাওরা

চাকরির আবেদনে মুহিববুল্লাহিল বাকী জন্মতারিখ উল্লেখ করেছেন ১ মে ১৯৭৪। স্থায়ী ঠিকানা দিয়েছেন কক্সবাজারের কুতুবদিয়া উপজেলার ধুরং বাজার। সেই হিসাবে ১৯৮৮ সালে দাখিল (এসএসসি) পাস করার সময় তার বয়স ছিল মাত্র ১৩ বছর ৩ মাস।

তার দাবি অনুযায়ী, ১৯৮৯ সালে একই শিক্ষাবর্ষে চার বছর মেয়াদি দাওরায়ে হাদিস (মাস্টার্স) এবং হিফজ; দুটোই সম্পন্ন করেছেন তিনি। অর্থাৎ মাত্র ১৪ বছর ৭ মাস বয়সে দাওরা পাস করেছেন। সেই হিসাবে দাখিলের আগেই তাকে দাওরা শুরু করতে হয়েছে।

শুধু তাই নয়, তিনি ১৯৯১ সালে আলিম পাস করেছেন বলে দাবি করছেন। অথচ ১৯৮৮ সালে দাখিল পাস করলে আলিম পাস হওয়ার কথা ছিল ১৯৯০ সালে।

আবার ১৯৯১ সালেই তিনি ভারতের দারুল উলুম নদওয়াতুল উলামা থেকে দুই বছর মেয়াদি আলমিয়াত পাস করেছেন বলে দাবি করেন। অর্থাৎ একই শিক্ষাবর্ষে দুই দেশে পড়ালেখা করেছেন, যা বাস্তবে অসম্ভব।

এরপর ১৯৯৪ সালে ফাজিল (ডিগ্রি) পাসের কথা সার্টিফিকেটে উল্লেখ আছে। সে হিসাবে শিক্ষাবর্ষ হওয়ার কথা ১৯৯২-১৯৯৩। কিন্তু ফাজিলের সনদ ও মার্কশিটে শিক্ষাবর্ষ নিয়ে গরমিল রয়েছে। মার্কশিটে শিক্ষাবর্ষ লেখা ১৯৯১-১৯৯২, আর সাময়িক সনদে লেখা ১৯৯২-১৯৯৩। অর্থাৎ, দুই নথি পরস্পরবিরোধী।

দাওরার জাল সনদ

১৯৯৬ সালের ৪ সেপ্টেম্বর আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদে পেশ ইমাম হিসেবে যোগ দেন মুহিববুল্লাহিল বাকী। পেশ ইমাম হিসেবে হিফজ সনদ জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তিনি তা জমা দেননি। তবে চাকরির আবেদনে হিফজ পাসের কথা উল্লেখ করেছিলেন।

নিয়োগের পরপরই ১৯৯৬ ও ১৯৯৭ সালে দৈনিক রূপালী ও দৈনিক দিনকালে ‘চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে ভুয়া সার্টিফিকেটধারী ইমাম নিয়োগ’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। মুসল্লিদের পক্ষে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ডিজি বরাবর আবেদন জমা পড়ে।

আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ। ছবি: সংগৃহীত

আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ। ছবি: সংগৃহীত

এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৫ সালের ৭ জুলাই ইসলামিক মিশনের তৎকালীন পরিচালক আবু হেনা মোস্তফা কামালকে প্রধান করে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে ইসলামিক ফাউন্ডেশন।

কমিটি সরেজমিনে চট্টগ্রামের হাটহাজারীর দারুল উলূম মঈনুল ইসলাম মাদ্রাসায় যায়। রমজান মাস হওয়ায় মাদ্রাসা বন্ধ ছিল। তবে দুজন শিক্ষকের সঙ্গে আলাপ করে বিভিন্ন বিষয় যাচাই করা হয়।

মুহিববুল্লাহিল বাকীর চাকরির আবেদনের সঙ্গে দাখিল করা সার্টিফিকেট ও মার্কশিটের ফটোকপি দেখানো হলে শিক্ষকরা জানান, সার্টিফিকেটের আকার, বর্ণনা ও মনোগ্রাম মাদ্রাসার আসল সার্টিফিকেটের সঙ্গে মেলে না।

২০১৫ সালের ১৪ জুলাই জমা দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘মুহিব্বুল্লাহিল বাকীর সনদপত্র জাল।’

তদন্ত দলকে মাদ্রাসার শিক্ষকরা আরও জানান, তিন বা চার বছরের মার্কশিট কখনও একসঙ্গে দেওয়া হয় না। প্রত্যেক বছরের জন্য পৃথক মার্কশিট দেওয়ার নিয়ম। কিন্তু মুহিবুল্লাহর দাখিলকৃত নম্বরপত্রে চার বছরের মার্কশিট একত্রে দেওয়া হয়েছে, যা মাদ্রাসার প্রচলিত নিয়মের সম্পূর্ণ বিপরীত।

২০০৮ সালে সাময়িক বরখাস্ত

২০০২ সালে চট্টগ্রাম থেকে বায়তুল মোকাররম মসজিদে বদলির আবেদন করেন মুহিববুল্লাহিল বাকী। ২০০৩ সালের ৩১ জানুয়ারি তিনি সেখানে যোগ দেন। এরপর অফিস ফাঁকি দেওয়া ও অন্য ইমামদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।

কর্তৃপক্ষ ২০০৮ সালের ১২ আগস্ট তাকে ফের আন্দরকিল্লায় বদলির আদেশ দেয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যোগ না দিলে ‘স্ট্যান্ড রিলিজড’ বলে গণ্য করার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি যোগ দেননি।

২০০৮ সালের ২৮ অক্টোবরের অফিস আদেশে তার আচরণকে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের চাকরি বিধিমালার ২(খ) ধারায় ‘অসদাচরণ’ এবং ৩৯(ক)(খ) ধারায় ‘দায়িত্ব পালনে অবহেলা’ ও ‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বৈধ আদেশ লঙ্ঘন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ওই বছরের ১ ডিসেম্বর তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় এবং ২০০৯ সালের ৪ জানুয়ারি অভিযোগ গঠন করা হয়।

মুহিবুল্লাহ বদলির বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করেছিলেন। তবে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের তৎকালীন মহাপরিচালক সামীম মোহাম্মদ আফজালের কাছে লিখিতভাবে ক্ষমা চান। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৯ সালের ১ জুন সাময়িক বরখাস্তের আদেশ বাতিল করা হয়।

২০২৪ সালে ইফার বোর্ড অব গভর্নরসের সিদ্ধান্তে তাকে আবারও আন্দরকিল্লায় বদলি করা হয়। তৎকালীন ধর্ম সচিব আবদুল হামিদ জমাদ্দার ও ইফা মহাপরিচালক মহা. বশিরুল আলমের সময়ে এ বদলি হয়। মহা. বশিরুল আলম বদলির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। কিন্তু জুলাই অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি আবারও বায়তুল মোকাররমে যোগ দেন।

হালাল সনদ বাণিজ্য

২০১৫ সালের ২০ মে এক অফিস আদেশে মুহিববুল্লাহিল বাকীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। অভিযোগ ছিল, ইফার কর্মচারী হিসেবে দায়িত্বে থাকার সময় তিনি চট্টগ্রামের ‘হালাল বাংলাদেশ সার্ভিসেস লিমিটেড’-এর মুফতি ইনচার্জ হিসেবে প্রায় ১০০টি প্রতিষ্ঠানকে অবৈধভাবে হালাল সনদ দিয়ে আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন। এতে সরকার ও ইসলামিক ফাউন্ডেশন বড় অঙ্কের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

শোকজ নোটিশে উল্লেখ করা হয়, ২০০৭ সালের ২৭ মে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় এবং ২০০৩ সালের ২৫ আগস্ট ইফার বোর্ড অব গভর্নরসের ১৮৯তম সভায় হালাল সনদ দেওয়ার একক দায়িত্ব ইসলামিক ফাউন্ডেশনকে দেওয়া হয়েছে। সে সিদ্ধান্ত জেনেও মুহিবুল্লাহ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই ব্যক্তিগতভাবে হালাল সনদ দিয়ে গেছেন।

শোকজ নোটিশে তার এই কর্মকাণ্ডকে চাকরি বিধিমালার ৩৯(খ) ও (ছ) ধারায় ‘অসদাচরণ’ এবং ‘ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ক্ষতিকর কার্যে লিপ্ত থাকা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

অন্যের পদোন্নতি আদেশ জাল করে রিট

২০১৯ সালে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের সিনিয়র পেশ ইমাম মিজানুর রহমানের ২০১৫ সালের পদোন্নতি আদেশ জাল করে এবং ভুয়া জ্যেষ্ঠতার তালিকা তৈরি করে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করেন মুহিববুল্লাহিল বাকী।

বিষয়টি তদন্তে ২০২২ সালে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করে ইফা। তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদনে স্পষ্ট করে জানায়, রিট পিটিশনে সংযুক্ত ‘সংযুক্তি-এফ ও জি’-এর কোনো প্রকৃত দাপ্তরিক অস্তিত্ব নেই। অর্থাৎ কাগজ দুটি জাল।

বাইতুল মোকাররম মসজিদ। ছবি: সংগৃহীত

বাইতুল মোকাররম মসজিদ। ছবি: সংগৃহীত

তদন্তে আরও বেরিয়ে আসে, মুহিবুল্লাহ তথ্য অধিকার আইনে মিজানুর রহমানের পদোন্নতি আদেশ, সিলেকশন কমিটির কার্যবিবরণীসহ বিভিন্ন কাগজ চেয়ে ইফায় আবেদন করেন। আরটিআই কর্মকর্তা নিজামউদ্দিন যেসব কাগজ সত্যায়িত করে সরবরাহ করেন, সেগুলো নয়; বরং জাল কাগজ দিয়ে মামলা করা হয়।

মামলায় মুজাফ্ফর আহমদ নামে একজনকে ব্যবহার করতেন মুহিবুল্লাহ। মুজাফ্ফর আহমদ বলেন, ‘আমি আসলে প্রথমে মুহিবুল্লাহর ষড়যন্ত্র ও অসৎ উদ্দেশ্য বুঝতে পারিনি। তার সঙ্গে বায়তুল মোকাররমের অন্য ইমামদের দ্বন্দ্ব দেখা দিলে তিনি আমাকে দিয়ে কিছু কাজ করিয়েছেন। আসলে তিনি একজন প্রতারক। পরে বুঝেছি সেগুলো করা ঠিক হয়নি।’

সিনিয়র পেশ ইমাম পরিচয়ে বাড়তি সুবিধা

মুহিববুল্লাহিল বাকী মূলত চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদের পেশ ইমাম ছিলেন। তবে দীর্ঘদিন ধরে তিনি নিজেকে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের ‘সিনিয়র পেশ ইমাম’ পরিচয় দিয়ে আসছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ধর্মীয় ও সরকারি মহলে প্রভাব বিস্তার ও বাড়তি সুবিধা আদায়ে এই পরিচয় ব্যবহার করেন তিনি।

এ ছাড়া বিধি লঙ্ঘন করে একাধিক ব্যাংকের শরিয়াহ বোর্ডের সদস্য ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সদস্য হয়ে সুবিধা নেন বলেও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে প্রায় প্রতি বছর হজ মৌসুমে সরকারি খরচে হজ মিশনে অন্তর্ভুক্ত হয়ে সৌদি আরব যান তিনি। চলতি মৌসুমেও হজে গেছেন। ইফার একাধিক কর্মকর্তার অভিযোগ, প্রতি বছর একক প্রভাব খাটিয়ে এই সুবিধা নেওয়ায় অন্য যোগ্য ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা সৌদি আরব যাওয়া ও ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এটি সরকারি নীতিমালার পরিপন্থি এবং চরম বৈষম্যমূলক।

নিয়োগ বাতিল ও তদন্তের দাবি

গত ২১ মে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে মুহিববুল্লাহিল বাকীকে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের নতুন মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগের কথা জানানো হয়। তবে তার বিরুদ্ধে ওঠা নানা অভিযোগের বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আলেমদের অনেকে।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যাপক আশরাফ আলী আকন বলেন, ‘অভিযোগ-অসংগতির বিবরণ শুনে মনে হলো মুহিববুল্লাহিল বাকী প্রতারণা করেছেন। এমন লোককে ডিজি বানাল কে? তার মতো লোক দেশের প্রধানতম ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে থাকতে পারেন না। আফজালও (সামীম আফজাল) একজন ডিজি ছিলেন। তিনি তো আওয়ামী লীগের গুণগান ছাড়া আর শেখ মুজিবের ছবি টাঙানো ও তাকে নিয়ে বই লেখা ছাড়া কিছু করেননি। বিএনপিও যদি দলীয় লোক নিয়োগ দেয় তাহলে তো ভালো হলো না। এ ধরনের অনিয়ম কেন হচ্ছে বুঝতে পারছি না। বাকীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’

ইসলামিক ফাউন্ডেশন ভবন। ছবি: সংগৃহীত

ইসলামিক ফাউন্ডেশন ভবন। ছবি: সংগৃহীত

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মতো সংবেদনশীল ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে জালিয়াতির অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তির আসীন হওয়ার ঘটনায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। আলেমরা বলছেন, সরকারের উচিত অবিলম্বে তার নিয়োগ বাতিল করে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা। একইসঙ্গে তার নিয়োগের পেছনে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধেও তদন্তসাপেক্ষে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। কেননা, একজন বিতর্কিত ব্যক্তি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে ডিজি হলে আলেমদের নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হবে।

হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মূসা বিন ইজহার বলেন, ‘আমি তো মুহিববুল্লাহিল বাকীকে একজন ভালো আলেম হিসেবে চিনি-জানি। তার প্রতি আস্থা আছে। তবে তার বিষয়ে কোনো সমস্যা থাকলে সরকারের উচিত হবে অধিকতর তদন্ত করা।’

মুহিববুল্লাহিল বাকীর বক্তব্য

নিজের বিরুদ্ধে উত্থাপিত বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে এশিয়া পোস্টের সঙ্গে কথা বলেছেন মুহিববুল্লাহিল বাকী। তিনি বলেন, তখন ১৪ বছর বয়স পর্যন্ত দাখিল পরীক্ষা দেওয়া যেত। ১৯৭৪ থেকে ১৯৮৮ পর্যন্ত হিসাব করলে এবং মে মাস পর্যন্ত মাসগুলো গণনা করলে বয়স ১৪ বছর হয়। বছরের অর্ধেক বা মাসগুলো বাদ দিয়ে হিসাব করা ঠিক নয়। আর দাওরায়ে হাদিস এক বছরের কোর্স, চার বছরের নয়। কওমি মাদ্রাসার সনদের তখন সরকারি স্বীকৃতি না থাকায় একই সঙ্গে আলিয়া ও কওমিতে পড়াশোনা চালানো যেত। ১৯৮৮ সালে দাখিল পাসের পর এক বছর দেশের বাইরে (নদওয়াতুল উলামা) পড়াশোনা করে এসে আবার আলিম পরীক্ষা দিয়েছি।

দাওরার সনদ জালের তদন্তের ব্যাপারে তিনি বলেন, তদন্ত রিপোর্টে আসলে কী লেখা আছে? কেউ আমার দাওরায়ে হাদিসের সনদকে জাল বলেনি। যে কেউ চাইলে আমার সনদ পরীক্ষা করে দেখতে পারেন। হাটহাজারী মাদ্রাসার শিক্ষকদের বক্তব্যের বিষয়ে তিনি বলেন, হাটহাজারী মাদ্রাসা তো এটা বলে নাই। তদন্তকারী কর্মকর্তা হাটহাজারী মাদ্রাসায় যাওয়ার কথা বলেছেন। মাদ্রাসা তখন বন্ধ ছিল। শুধু দুজন হুজুরকে পেয়েছে। তাহলে আপনি বন্ধের সময় গিয়ে দুজন হুজুরের বক্তব্য নেবেন কেন? বন্ধের পর আজ পর্যন্ত সময় ছিল না যাওয়ার জন্য?

চার বছরের মার্কশিট একসঙ্গে দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, হাটহাজারী মাদ্রাসা থেকে মার্কশিট আপনি চাইলে একসঙ্গে নিতে পারেন, আবার আলাদা আলাদাও নিতে পারেন। আপনি যেভাবে চাইবেন সেভাবেই নিতে পারবেন। আমার কাছে আলাদা আলাদা মার্কশিটও আছে।

পেশ ইমাম পদে নিয়োগের সময় হিফজ সনদ জমা না দেওয়ার ব্যাপারে তিনি বলেন, হিফজ কোনো কাগুজে সনদের বিষয় নয়, এটি মুখস্থ রাখার বিষয়। আমার সময়ে হিফজ সনদ নেওয়ার প্রচলন ছিল না। আমি কোনো ভুয়া সনদ তৈরি করে জমা দেইনি। বরং সত্য কথাটি লিখেছি যে, আমার সনদ নেই। হিফজ সনদের বিষয় নাকি? হিফজ তো কোরআন মেমোরাইজেশনের জিনিস। ২৭ বছর তারাবি পড়াচ্ছি, এটা হিফজের সনদ নয়?

২০০৮ সালে বদলির আদেশ অমান্যের ব্যাপারে তিনি বলেন, আদেশ মানি নাই। তো সে জন্য আমাকে শাস্তি দেয়নি কেন? আসল ব্যাপার হচ্ছে, আমি এই আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে মামলা করেছিলাম। পরে কর্তৃপক্ষ মামলায় হেরে যাওয়ার ভয়ে বদলি ও সাময়িক বরখাস্তের আদেশ নিজেরাই প্রত্যাহার করে নেয়।

লিখিতভাবে ক্ষমা চাওয়ার কথা অস্বীকার করে তিনি বলেন, আমি কেন লিখিতভাবে ক্ষমা চাইব? ক্ষমা চাইলে তো আমার মামলা থাকা অবস্থায় তারা বলত, তুমি মামলা উইথড্র কর, তারপর আমরা করব। আমি তো উইথড্র করি নাই, তারা নিজেরাই প্রত্যাহার করেছে। তারপর আমিও উইথড্র করেছি। তাহলে কে হকের মধ্যে বেশি আছে?

জুলাই অভ্যুত্থানের পর আবার বায়তুল মোকাররমে কীভাবে যোগ দিলেন? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আমাকে আনবে না? আমি হলাম সবচেয়ে সিনিয়র ইমাম। আমাকে আওয়ামী লীগ জুলুম করতে করতে কত কিছু করেছে। আওয়ামী লীগ আমলে বদলি করেছে, তো আসব না? এগুলো হলো ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠান। তারা যে কোনো জায়গায় বদলি করতে পারে।

১০০টি প্রতিষ্ঠানকে অবৈধভাবে হালাল সনদ দেওয়ার ব্যাপারে তিনি বলেন, এই অভিযোগ ভিত্তিহীন। আমি কি কোনো হারাম জিনিসকে হালাল বলেছি? শুকরকে হালাল বলেছি? হালালকে হালাল বলেছি। হালাল জিনিসকে হালাল বলা কোনো অবৈধ কাজ হতে পারে না। যখন আমি সনদ দিয়েছি তখন ইসলামিক ফাউন্ডেশন এই দায়িত্ব পালন করত না। সরকারি রাজস্ব ও রপ্তানি আয়ের সুবিধার্থে আমি ব্যক্তিগতভাবে এই সনদ দিয়েছিলাম। কিন্তু ফাউন্ডেশন দায়িত্ব নেওয়ার পর আমি আর সনদ দেইনি।

সিনিয়র পেশ ইমাম মিজানুর রহমানের পদোন্নতি আদেশ জাল করে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়েরের অভিযোগের ব্যাপারে তিনি বলেন, যদি মিজান সাহেব পদোন্নতি পেয়েই থাকেন তবে সেই আদেশ জাল করার কোনো প্রয়োজন নেই। এতে জালিয়াতির কোনো সুযোগ নেই।

বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সদস্য হয়ে সুবিধা নেওয়ার ব্যাপারে তিনি বলেন, শরিয়াহ বোর্ডের সদস্যরা চাকরির অন্তর্ভুক্ত নাকি? এটা একটা অনারারি (সম্মানজনক) পদ। তিন মাসে একটা মিটিং হয়। আর অর্থনৈতিক সুবিধা কী? আপনি একটা ওয়াজ করলে সময় নিয়ে যাবেন না? একটা মিটিং করলে কিছু সময় দেবেন না? এটা কি বেতন? যারা আওয়ামী লীগ আমলে দুর্নীতি করেছিল তাদের সব মাথা খারাপ হয়ে গেছে এখন। এখন তারা অনলাইনে এগুলো লিখছে।

হজ মিশনে প্রভাব খাটানোর ব্যাপারে তিনি বলেন, আমার যোগ্যতার কারণেই কর্তৃপক্ষ আমাকে বারবার হজ মিশনে নেয়। কর্তৃপক্ষ যেখানে আমার বিরুদ্ধে সবসময় অবস্থান নিয়েছে এবং আমাকে শোকজ বা সাসপেন্ড করেছে, সেখানে আমার প্রভাব খাটানোর প্রশ্নই আসে না। আর আমার চেয়ে সিনিয়র তো কেউ নেই এখানে। সিনিয়র কেউ বঞ্চিত হবে কীভাবে?

একাধিক গুরুতর অভিযোগ ও তদন্ত কমিটির প্রতিকূল প্রতিবেদনের পরও ইফার মহাপরিচালক পদে আপনার নিয়োগ নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যদি অভিযোগগুলো প্রমাণিত হয় তবেই নিয়োগ প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। যেহেতু এই অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন, তাই আমার নিয়োগ নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকার কথা নয়।