ছয় নবজাতকের মৃত্যুর পর রাজধানীর মগবাজারের আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করায় হাসপাতালজুড়ে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে আশঙ্কাজনক অবস্থায় থাকা রোগীদের অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর করতে গিয়ে অনেক পরিবার চরম দুশ্চিন্তার মধ্যে পড়েছে।
সরকারের এই সিদ্ধান্তের পর অনেক রোগীর পরিবার ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও তাদের অন্য হাসপাতালে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বৃহস্পতিবারের এক বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, সরকারের সিদ্ধান্ত ঘোষণার সময় হাসপাতালে মোট ৪১৬ জন রোগী ভর্তি ছিলেন।
হাসপাতালের বিশেষায়িত ইউনিটগুলোতেও বেশ কয়েকজন সংকটাপন্ন রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন। এর মধ্যে নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে ৬০ শিশু, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে ২০ জন রোগী এবং হৃদরোগ নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চারজন রোগী ভর্তি ছিলেন।
লাইসেন্স বাতিলের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর রোগী স্থানান্তরের হিড়িক শুরু হয়। শুক্রবার বিকাল পর্যন্ত ১৭৩ রোগীকে অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। এখনও ২৪৩ জন রোগী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে থাকা ৬০ নবজাতকের মধ্যে ১৫ জনকে এরইমধ্যে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বাকি নবজাতকদেরও শনিবারের মধ্যে স্থানান্তরের চেষ্টা চলছে।
নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র ও উচ্চ নির্ভরশীলতা ইউনিটে ১৩ রোগী এবং হৃদরোগ নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চারজন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ টাইমস অব বাংলাদেশকে জানিয়েছে, বর্তমানে ভর্তি থাকা রোগীদের চিকিৎসা নিরবচ্ছিন্নভাবে চালিয়ে যাওয়া হবে। স্থানান্তর প্রক্রিয়া চলাকালে সংকটাপন্ন রোগীদের চিকিৎসা ও নিবিড় পর্যবেক্ষণ অব্যাহত থাকবে বলেও তারা আশ্বস্ত করেছে।
তবে শুক্রবার হাসপাতাল পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা অনেক রোগী পরিস্থিতির কথা জেনে ফিরে যাচ্ছেন।
কেবল রোগীরাই নয়, নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন হাসপাতালের কর্মীরাও। হাসপাতাল বন্ধ হয়ে গেলে তাদের জীবিকা কীভাবে চলবে, তা নিয়ে শঙ্কায় আছেন তারা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নার্স বলেন, ‘হাসপাতাল বন্ধ হয়ে গেলে আমরা কী করব? পরিবার-পরিজন নিয়ে কীভাবে চলব?’
রোগীদের স্বজনরা ছয় শিশুর মৃত্যুর পেছনে দায়ীদের জবাবদিহির দাবি জানালেও হাসপাতাল পুরোপুরি বন্ধের বিষয়ে অনাগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
আদ-দ্বীনে ভর্তি এক রোগীর স্বজন আবদুল্লাহ আল মামুনের মতে, নবজাতকদের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তবে হাসপাতাল পুরোপুরি বন্ধ করে দিলে মানবিক সংকট তৈরি হতে পারে, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি হাসপাতালের সেবা চালু রাখা উচিত। কম আয়ের অসংখ্য মানুষ সাশ্রয়ী চিকিৎসার জন্য আদ-দ্বীনের ওপর নির্ভরশীল।’
অন্য রোগীদের স্বজনরাও চিকিৎসা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা জানিয়েছেন।
কুমিল্লা থেকে আসা মফিজুল ইসলাম জানান, বিভিন্ন স্থানে ভুল রোগ নির্ণয়ের পর তার গর্ভবতী স্ত্রীকে আদ-দ্বীনে ভর্তি করা হয়েছিল। সেখানে চিকিৎসার পর তার অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আগে তিনি হাঁটতেও পারতেন না। এখন স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে ও খেতে পারছেন।’ হঠাৎ অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর করলে তার সুস্থতা ব্যাহত হতে পারে বলে উদ্বেগ জানান তিনি।
বাগেরহাটের মোহাম্মদ নূর ইসলাম শেখের মতে, নতুন রোগী ভর্তি বন্ধ রেখে বর্তমানে চিকিৎসাধীন রোগীদের চিকিৎসা শেষ করার সুযোগ দেওয়া হলে সেটি আরও মানবিক সিদ্ধান্ত হতো।
আদ-দ্বীন হাসপাতালের পরিচালক মো. তারিকুল ইসলাম মুকুল শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘নবজাতকদের মৃত্যুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডটি ঘটনার পরপরই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আগামী তিন মাসে সেখানে ব্যাপক সংস্কার ও আধুনিকায়নের কাজ করা হবে।’
হাসপাতাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সব নির্দেশনা মেনে চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘রোগীর নিরাপত্তাকেই আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিই।’
তিনি আরও জানান, বৃহস্পতিবার থেকে নতুন রোগী ভর্তি বন্ধ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি সরকারের নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার জন্য আনুষ্ঠানিক আবেদন করা হবে।