Image description

ঘর-বাইরে প্রতিনিয়ত শিশুরা যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। শতকরা প্রায় ৮৫ ভাগ ক্ষেত্রে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু বা বিশ্বস্তজনদের হাতে শিশুরা যৌন নিপীড়নের শিকার হয়। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের একটি নিবন্ধে এমন তথ্য উঠে এসেছে। ‘চাইল্ড সেক্সুয়াল এবিউজ ইন বাংলাদেশ’ গবেষণায় বলা হয়েছে- নির্যাতনকারীরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই শিশুর পরিচিত হয়ে থাকে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী-দেশে ২০১৬ সাল থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ১০ বছরে ১১ হাজার ৯৩৪টি শিশু নির্যাতনের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। ছয় হাজার ৩১ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ধর্ষণের পর ৩১০ শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। ১৬ বছরে দেশে ৬১ জনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে। সংঘবদ্ধ ও এককভাবে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় সাতজনের ফাঁসি হয়েছে। ছেলে শিশুও যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। ২০২৪ সালে ৩৬ জন ছেলে শিশু বলাৎকারের শিকার হয়েছে। চলতি বছরের ১ জানুযারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত ১১৮ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ৪৬ শিশু ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে। ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছে ১৪ শিশু। ধর্ষণচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে তিন শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। এছাড়া ধর্ষণের শিকার দুই শিশু আত্মহত্যা করেছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, শুধু কন্যাশিশু নয়, নিরাপত্তা পাওয়া মানুষের অধিকার। এটা রক্ষা করা রাষ্ট্র ও সরকারের দায়িত্ব। তিনি আরও বলেন, ঘর অথবা বাইরে কন্যাশিশুকে চোখে চোখে রাখতে হবে কেন! নিরাপত্তার অভাব কিন্তু চরম অসম্মানেরও। সংশ্লিষ্ট কারও কারও বক্তব্য-অন্দরমহলে যৌন নিপীড়ন ও সহিংসতা রোধে সরকার বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কী করবে? তিনি বলেন, রাষ্ট্রের দায়িত্ব দেশের সব নাগরিককে সুরক্ষা দেওয়া। সুরক্ষা দেওয়া মানে-সবার ঘরে পুলিশ মোতায়েন করা সুরক্ষা নয়। সুরক্ষা দেওয়ার জন্য, সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্রের নীতি থাকতে হবে। এ নীতি বাস্তবায়নে আইন থাকতে হবে। আইন প্রয়োগ করা না হলে সেজন্য কঠোর শাস্তির বিধান থাকতে হবে। শাস্তির বিধান যথাযথ কার্যকর করতে হবে। তাহলে স্বাভাবিকভাবেই ধর্ষণ-সহিংসতা কমে আসবে। ডা. ফওজিয়া মোসলেম আরও বলেন, সমাজ আজ বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য দ্বারাও যৌন নির্যাতনের নজির আছে। এমন ন্যক্কারজনক সংস্কৃতি থেকে বের হতে না পারলে-শিশু ধর্ষণ, ধর্ষণ শেষে হত্যা বা যে কোনো বয়সি নারীর প্রতি যৌন সহিংসতা বন্ধ করা সম্ভব নয়।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান অধ্যাপক কাজী গোলাম মোখলেছুর রহমান বলেন, শিশু ধর্ষণের ধরন পরিবর্তন হচ্ছে। সহিংসতা বাড়ছে। ২০২৫ সালে ধর্ষণের অভিযোগ নিয়ে এক হাজার ১০০ জন নারী শিশু ঢামেক হাসপাতালে এসেছেন। সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ-সদস্য ও বিএনপির নেত্রী নিপুণ রায় চৌধুরী বলেছেন, শিশুরা এখন চার দেয়ালের মধ্যেও নিরাপদ নয়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো-অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরিচিত ব্যক্তি বা নিকটাত্মীয়দের হাতেই শিশুরা যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. নাহরীন আই খান বলেন, সমাজে শুধু কন্যাশিশু নয়, ছেলে শিশুও যৌন নির্যাতন-বলাৎকারের শিকার হচ্ছে। সমাজের এক শ্রেণির মানুষ বলছে, শিশুদের চোখে চোখে রাখতে, পর্দায় রাখতে। ২-৩ বছরের শিশুর বেলায় পর্দাটা কী? ব্রেকিং দ্য সাইলেন্সের (বিটিএস) পরিচালক জাহিদুল ইসলাম জানান, মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে তারা দেখেছেন-শিশু নির্যাতন বা ধর্ষণের যতগুলো ঘটনায় মামলা হয়েছে তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। এসব ঘটনায় অনেকে ভয় বা সংকোচে আইনি লড়াইয়ে যেতে চায় না।