আইনগতভাবে বিচ্ছেদের আগেই নতুন করে বিয়ে করার অভিযোগে ক্রিকেটার নাসির হোসন ও তার স্ত্রী তামিমা সুলতানা তাম্মি অপরাধ করেছেন কিনা, তা জানা যাবে বুধবার।
বিচার শুরুর আদেশ দেওয়ার চার বছরের বেশি সময় পরে যে রায় আসছে, তাতে কী সাজা হতে পারে তাদের?
বাদীপক্ষের আইনজীবী ইসরাত হাসানের দাবি করেছেন, আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করতে পেরেছেন। সে জন্য তাদের ‘সর্বোচ্চ সাজা’ প্রত্যাশা করছেন তিনি।
তবে আসামিপক্ষের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু বলেছেন, তারা কেন খালাস পাবেন, যুক্তিতর্কে তিনি বলেছেন।
এই আইনজীবী আশা করছেন, আসামিরা খালাস পাবেন।
তবে নাসির ও তামিমার সাজা হবে, নাকি তারা খালাস পাবেন তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে।
ঢাকার অ্যাডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলাম আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণা করবেন।
মামলায় বলা হয়, ২০১১ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি তামিমার সঙ্গে রাকিব হোসেনের বিয়ে হয়। তাদের আট বছরের একটি মেয়েও রয়েছে। কিন্তু রাকিবের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক চলমান থাকা অবস্থায় ২০২০ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি তামিমা ও নাসির বিয়ে করেন।
২০২১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি তামিমা ও ক্রিকেটার নাসির হোসেনের বিয়ের ছবি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়লে তা রাকিবের নজরে আসে। এরপর ২৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে তিনি এই মামলা দায়ের করেন।
সে বছর ৩০ সেপ্টেম্বর নাসির, তামিমা ও তার মা সুমি আক্তারকে আসামি করে আদালতে প্রতিবেদন দেন তদন্ত কর্মকর্তা শেখ মিজানুর রহমান।
২০২২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে নাসির ও তামিমার বিচার শুরুর আদেশ দেয় আদালত। তবে নাসিরের শাশুড়ি সুমি আক্তারকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
ওই বছরের ৬ মার্চ মহানগর দায়রা আদালতে নাসির ও তামিমার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের আদেশের বিরুদ্ধে রিভিশন করেন তাদের আইনজীবী কাজী নজিবুল্লাহ হিরু।
অন্যদিকে সুমি আক্তারকে অব্যাহতির আদেশের বিরুদ্ধে রিভিশন দায়ের করেন বাদীপক্ষের আইনজীবী ইশরাত হাসান।
২০২৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি দুটো আবেদনই আদালতে নাকচ হয়ে যায়। ফলে নাসির-তামিমার বিরুদ্ধে মামলা চলতে আইনি বাধা কাটে। সে বছর ২০ মার্চ বাদী রাকিবের সাক্ষ্যগ্রহণের মধ্য দিয়ে এ মামলার বিচার শুরু হয়।
২০২৫ সালের ১৬ এপ্রিল সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়। সব মিলিয়ে ১০ জনের সাক্ষ্য শোনে আদালত। এরপর গত ১০ মার্চ আসামিদের আত্মপক্ষ শুনানি হয়। শুনানিতে তারা নিজেদের নির্দোষ দাবি করে ন্যায়বিচার চান।
গত ৩০ মার্চ নিজের পক্ষে সাফাই সাক্ষ্য দেন সাউদিয়া এয়ারলাইন্সের সাবেক বিমানবালা তামিমা। তিনি দাবি করেন, ‘সাংসারিক এবং মানসিক বনিবনা’ না হওয়ায় আগের স্বামী রাকিবকে তালাক দিয়ে বৈধভাবেই তিনি ক্রিকেটার নাসিরকে বিয়ে করেন।
ক্রিকেটার নাসির হোসেনের বিরুদ্ধে পৃথক দুই ধারায় এবং তামিমার বিরুদ্ধে আলাদা তিন ধারায় অভিযোগ গঠন করে মামলার বিচার শুরু হয়।
অভিযোগ প্রমাণিত হলে নাসিরের সর্বোচ্চ সাত বছরের এবং তামিমার সর্বোচ্চ ২১ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে বলেছেন বাদীপক্ষের আইনজীবী ইসরাত হাসান।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডট্কমকে বলেন, “আমরা চাই, আসামিদের শাস্তির মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হোক। আদালতের উপর ভরসা করেই মামলা করেছিলাম। বিভিন্ন বিষয় চ্যালেঞ্জ করে তারা উচ্চ আদালতে রিভিশন করেছে। তবে ফলাফল তাদের দিকে যায়নি। ১০ জন সাক্ষীর মাধ্যমে মামলার অভিযোগ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি।”
তিনি বলেন, “সর্বোচ্চ শাস্তির মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে আশা করছি। আর সাজা নিশ্চিত হলে সমাজ থেকে ব্যাভিচার দূর হবে। অন্যের বউকে নিয়ে নেওয়ার আগে শাস্তির কথা চিন্তা করবে। এ প্রবণতা কমে আসবে। আমরা চাই, শাস্তির মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হোক।”
আসামিপক্ষের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু বলেন, “আমাদের আশা ইতিবাচক। আসামিরা খালাস পাবেন আশা করছি। তারা কেন খালাস পাবেন যুক্তিতর্কে তুলে ধরেছি।”
এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, “বাদীপক্ষ যদি ‘মিডিয়া ক্যাম্পেইন’ করে রায় পক্ষে নিতে চায় তাহলে এটা আদালত অবমাননার শামিল। যে ধারায় আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন হয়নি, বাদীপক্ষ সেই ধারাও আদালতে তুলে ধরেছে। তারা দেখেই নাই, কোন ধারায় আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন হয়েছে। ইনশাআল্লাহ, আসামিরা খালাস পাবেন।”
মামলার বাদী রাকিব বলেন, “ইনশাআল্লাহ, ন্যায় বিচার হোক। এ ধরণের কাজ যেন আর না হয়। রায়ের মাধ্যমে একটা বার্তা যাক সমাজে। আমার সাথে যেমনটা ঘটেছে, যেন আর কারো সাথে এমনটা না হয়।”
এ বিষয়ে নাসির হোসেনের বক্তব্য জানতে তাকে ফোন করে বন্ধ পাওয়া গেছে।
কোন ধারায় কী সাজা
নাসির হোসেনের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪৯৭ ও ৪৯৮ ধারায় অভিযোগ গঠন করা হয়েছে।
দণ্ডবিধির ৪৯৭ ধারায় আনা ব্যভিচার বা পরকীয়ার অভিযোগ প্রমাণ হলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। এ ছাড়া অর্থদণ্ডও রয়েছে। আদালতকে দোষীকে উভয় দণ্ড দিতে পারে।
৪৯৮ ধারা অনুযায়ী, কোনো বিবাহিত নারীকে অপরাধজনক উদ্দেশ্যে প্রলুব্ধ করা, ফুসলিয়ে নিয়ে যাওয়া বা বেআইনিভাবে আটকে রাখা দণ্ডনীয় অপরাধ। এই অপরাধ প্রমাণিত হলে অপরাধী সর্বোচ্চ দুই বছর পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।
তামিমার বিরুদ্ধে ৪৯৪, ৪৬৮ ও ৪৭১ ধারায় অভিযোগ গঠন করা হয়।
৪৯৪ ধারায় স্বামী বা স্ত্রী জীবিত ও বৈবাহিক সম্পর্ক বলবৎ থাকা অবস্থায় গোপনে বা তালাক ব্যতীত পুনরায় বিবাহ করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অপরাধ প্রমাণিত হলে আসামি সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদে সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। সেই সঙ্গে অর্থদণ্ডও দিতে পারে আদারত।
৪৬৮ ধারা হল প্রতারণা বা ঠকানোর উদ্দেশ্যে কোনো জাল দলিল বা ইলেকট্রনিক রেকর্ড তৈরি করার অপরাধ। অর্থাৎ কাউকে ধোঁকা দেওয়ার বা নিজের কোনো অনৈতিক সুবিধা আদায়ের লক্ষ্যে মিথ্যা বা বানোয়াট কাগজপত্র তৈরি করা হল এই ধারার মূল অপরাধ। তামিমার বিরুদ্ধে রাকিব হাসানকে আইনগতভাবে তালাক না দিয়েই জাল কাগজপত্র ও মিথ্যা তালাক নোটিস সৃজনের অভিযোগ রয়েছে। এই অপরাধ প্রমাণিত হলে তার সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং সেই সঙ্গে অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রয়েছে।
দণ্ডবিধির ৪৭১ অনুসারে, কোনো ব্যক্তি যদি প্রতারণামূলকভাবে বা অসাধুভাবে এমন একটি দলিলকে খাঁটি দলিল হিসাবে ব্যবহার করে, যে দলিলটি একটি জাল দলিল বলে তিনি জানেন বা তার বিশ্বাস করার কারণ রয়েছে। এমন অভিযোগে সাত বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।