বিশ্বের ন্যানোটেকনোলজি বা ন্যানোপ্রযুক্তির বাজার যখন ৩৯৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে গেছে বাংলাদেশের এ বাজারে প্রবেশের স্বপ্ন। ন্যানোপ্রযুক্তির মূল কথা সবচেয়ে ছোট কণা দিয়ে সবচেয়ে বড় অর্থনীতি গড়ে তোলা। অথচ সাভারে পরিকল্পিত ৩৮০ কোটি টাকার একটি জাতীয় গবেষণা কেন্দ্র তৈরির কাজ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
এর ফলে বাংলাদেশের সবচেয়ে মেধাবী তরুণ বিজ্ঞানীরা বিপদে পড়েছেন। তাদের সামনে এখন দুটি পথ খোলা–হয় গবেষণার বিষয় বদলে ফেলতে হবে, না হলে বিদেশে পাড়ি দিতে হবে।
গবেষণা কেন্দ্রের প্রকল্প পরিচালক ও বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম খান জানান, প্রকল্পটি বাতিল করা হয়নি। তবে এটি এখন পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
২০২৩ সালে ৩৮০ কোটি টাকা ব্যয়ে সাভারে এই ‘ইনস্টিটিউট অব ন্যানোটেকনোলজি’ তৈরির পরিকল্পনা করে তৎকালীন সরকার। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীনে এটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয় পরমাণু শক্তি কমিশনকে।
নজরুল জানান, বাজেট পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিতর্কের কারণে সাভার ক্যাম্পাসের প্রাথমিক কাজ বন্ধ রয়েছে। তবে কাজ যেন আবার শুরু হয়, সেজন্য সরকারের কাছে একটি আবেদন করা হয়েছে। তারা এখন মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছেন।
গবেষনা কেন্দ্র নির্মাণে এই দেরির কারণে ঝুঁকিতে পড়েছে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা। কারণ, সরকারের ‘রূপকল্প ২০৪১’ ও ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ পরিকল্পনায় চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের জন্য ন্যানোপ্রযুক্তিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলা হয়েছে। বিশেষ করে ন্যানো-সার ও ন্যানো-পোশাক তৈরিকে এতে বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।
ন্যানোপ্রযুক্তির ক্ষমতা
ন্যানোপ্রযুক্তি হলো পরমাণু ও অণু স্তরে অতি ক্ষুদ্র পদার্থ নিয়ে কাজ করার বিজ্ঞান। সহজভাবে বললে, এক মিটারের একশ কোটি ভাগের এক ভাগকে এক ন্যানোমিটার বলে। মানুষের মাথার চুল যতখানি মোটা, এই প্রযুক্তির কণাগুলো তার চেয়েও হাজার গুণ ছোট হয়। এই ছোট স্তরে এসে পদার্থের গুণাগুণ পুরোপুরি বদলে যায়। ফলে খুব কম খরচ ও অল্প উপাদান দিয়ে অনেক বড় এবং ভালো ফল পাওয়া যায়।
বর্তমানে চিকিৎসা থেকে শুরু করে সব খাতেই এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। যেমন–ক্যানসারের সুনির্দিষ্ট কোষে ওষুধ পৌঁছানো, কাপড়ে ব্যাকটেরিয়ারোধী সুতা ব্যবহার, কৃষিতে উন্নত ন্যানো-সার, সস্তা সৌরবিদ্যুৎ এবং পানি পরিষ্কার করার ফিল্টার।
পরমাণু শক্তি কেন্দ্রের বিজ্ঞানী শেখ মনজুরা হক বলেন, ‘আমরা আজ যে মোবাইল ফোন ব্যবহার করছি, তা রিকশাচালক থেকে সবজি বিক্রেতা—সবাই কিনতে পারছেন। ন্যানোপ্রযুক্তির উন্নতি না হলে এই ফোন এত ছোট, কার্যকর ও সস্তা হতো না।’
বুয়েটের শিক্ষক মো. আবদুল্লাহ জুবায়ের বলেন, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা রয়েছে কৃষি, ওষুধ ও জ্বালানি খাতে। মনজুরাও মনে করেন, ন্যানোপ্রযুক্তি ছাড়া ভবিষ্যতের বড় কোনো অগ্রগতির কথা চিন্তাই করা যায় না।
বিশ্বের বড় বিনিয়োগ ও গবেষণা
বিশ্ববাজারের দিকে তাকালে দেখা যায়, অন্য দেশগুলো এই খাতে বিপুল টাকা খরচ করছে। ২০২৫ সালে এই বাজার ছিল ১০৫ বিলিয়ন ডলারের, যা ২০৩৪ সালের মধ্যে ৩৯৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে।
গবেষণার দিক থেকেও তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে। ২০২৪ সালে ন্যানোপ্রযুক্তির যত লেখালেখি বা গবেষণা বের হয়েছে, তার ৪৬ শতাংশই করেছে চীন। এর পরেই রয়েছে ভারতের স্থান। নতুন আবিষ্কারের অধিকার বা পেটেন্টের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন সবার ওপরে।
এই সাফল্যের কারণ হলো, সেসব দেশের সরকার দীর্ঘ সময় ধরে বিজ্ঞানীদের সাহায্য করেছে। চীন ২০০৬ সাল থেকে এবং ভারত ২০০৭ সাল থেকে শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগ করে এই কাজ করছে। ফলে এই প্রযুক্তিতে খুব দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে এশিয়ার এসব দেশ।
বিশ্বজুড়ে এত কাজ হলেও বাংলাদেশ এখনো শুধু কাগজে-কলমেই আটকে আছে। দেশের বড় বড় সরকারি দলিলে ন্যানোপ্রযুক্তির কথা বেশ গুরুত্ব দিয়ে লেখা হয়েছে। যেমন-পোশাক শিল্পে ও কৃষিতে এর ব্যবহারের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে। কিন্তু এই লক্ষ্য অর্জনে যে প্রতিষ্ঠান বা ল্যাব দরকার, তা এখনো তৈরিই করা হয়নি।
সাভার ক্যাম্পাসে আটকে থাকা প্রকল্প
নজরুল ইসলাম খান জানান, নানা রকম জটিলতার কারণে প্রকল্পটি অনেক দিন ধরে আটকে আছে। কখনো বাজেট কমিয়ে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, আবার কখনো এই প্রকল্পের আদৌ কোনো দরকার আছে কি না–তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। সাভার ক্যাম্পাসে শুরুতে কিছু কাজ হলেও এখন তা পুরোপুরি বন্ধ। তাই এটি আগের পরিকল্পনা অনুযায়ী বড় আকারে তৈরি হবে, নাকি নতুন করে ছোট করা হবে, তা এখনো ঠিক হয়নি।
নজরুল বলেন, সরকার এই প্রযুক্তির গুরুত্ব বোঝে। তারা এখন শুধু মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত আদেশের অপেক্ষায় আছেন।
দেশের ভেতরের দুর্বল গবেষণা ব্যবস্থা
বাংলাদেশে ন্যানোপ্রযুক্তি গবেষণার অবস্থা কতটা খারাপ, তা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যানোটেকনোলজি সেন্টারের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। কেন্দ্রের বর্তমান পরিচালক ফরিদা বেগম জানান, তারা বছরে মাত্র ১০ লাখ টাকার মতো বাজেট পান। এই সামান্য টাকা দিয়েই অফিসের খরচ, গবেষণার কাজ ও বিজ্ঞানীদের অনুদান দিতে হয়।
ফরিদা আরও বলেন, এই কেন্দ্রের নিজস্ব কোনো ভালো ল্যাব বা আধুনিক যন্ত্রপাতি নেই। তাই আগে কিছু মৌলিক অবকাঠামো তৈরি করা দরকার, তবেই গবেষণার কাজ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।
কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক মো. আবু বিন হাসান সুসান বলেন, বাংলাদেশে ভালো গবেষকের অভাব নেই। অভাব শুধু যন্ত্রপাতির। এই গবেষণার জন্য অত্যন্ত জরুরি এক ধরনের বিশেষ অণুবীক্ষণ যন্ত্র (টিইএম), যা বাংলাদেশে জাতীয় পর্যায়ে নেই।
তিনি মনে করেন, একটি কেন্দ্রীয় ল্যাব থাকলে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা একসঙ্গে কাজ করতে পারতেন। সাভারের প্রকল্পটি এভাবে বন্ধ হয়ে থাকায় তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন।
একটি বড় গবেষণা কেন্দ্রের স্বপ্ন
সাভার ক্যাম্পাসে আগে থেকেই পরমাণু, খাদ্য, কম্পিউটার ও ইলেকট্রনিক্স বিষয়ের বেশ কয়েকটি বড় বড় সরকারি প্রতিষ্ঠান আছে। নজরুলের মতে, নতুন ন্যানোটেকনোলজি ইনস্টিটিউটটি যদি এখানে তৈরি করা যেত, তবে সাভার হতো দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী ও বড় বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র।
এদিকে, বুয়েটের শিক্ষক মো. আবদুল্লাহ জুবায়ের শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, ২০২২ ও ২০২৩ সালে তাদের বিভাগে যেসব শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছিল, তারা এখন তৃতীয় বর্ষে পড়ে। কিন্তু দেশে ভালো কাজের জায়গা না থাকায় তারা ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছে।
জুবায়ের সতর্ক করে বলেন, দেশে যদি ভালো প্রতিষ্ঠান না থাকে, তবে সেরা মেধাবীরা বিদেশে চলে যাবে। এই মেধা পাচার ঠেকানো তখন অসম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বিদেশ থেকে দামি দামি প্রযুক্তি পণ্য কিনি, কিন্তু সেগুলোর ভেতরে যে ন্যানোপ্রযুক্তি আছে, তা নিয়ে ভাবি না। আমরা কেবল ক্রেতা হয়েই থাকছি। দেশে দক্ষ কর্মী তৈরি না করলে সরকারের নীতিনির্ধারকদের বোঝানো যাবে না যে, এই প্রযুক্তি বাংলাদেশেই তৈরি সম্ভব। আমরা প্রযুক্তি ব্যবহার করছি ঠিকই, কিন্তু এর মালিক হতে পারছি না।’
আর্থিক খরচের হিসাব করলেও একটি হতাশাজনক চিত্র দেখা যায়। গত বছর সরকার এমন ২৯টি প্রকল্প বাতিল করেছে, যেখানে ইতোমধ্যে ছয় হাজার ৭৫৫ কোটি টাকা খরচ হয়ে গিয়েছিল। ন্যানোটেকনোলজি কেন্দ্রটি বন্ধ থাকায় হয়তো সরাসরি এত টাকা লোকসান হয়নি, কিন্তু বাংলাদেশ তার প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে অনেক পিছিয়ে পড়ছে।
মনজুরা হক বলেন, ‘বিজ্ঞানের পেছনে খরচকে লোকসান ভাবলে চলবে না, এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি বিনিয়োগ। ন্যানোপ্রযুক্তিই আমাদের শিল্প, কৃষি ও চিকিৎসা খাতের ভবিষ্যৎ ঠিক করবে।’
নজরুল ইসলাম জানান, তারা পুনর্বিবেচনার আবেদন করে এখন সরকারের সিদ্ধান্তের আশায় আছেন। তবে বর্তমান আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এই অপেক্ষা কতদিন চলবে, তা কেউ জানে না।