পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে দেশের কাঁচা চামড়ার বাজারে বড় প্রস্তুতি নিয়েছেন আড়তদার ও ট্যানারি মালিকেরা। সংগ্রহের লক্ষ্যও এবার বড়। ইতিমধ্যে চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিপণনের প্রস্তুতি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে। তবে প্রতি বছরের মতো এবারও সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে নগদ অর্থের সংকট।
ট্যানারিগুলোর কাছে আড়তদারদের বিপুল বকেয়া, ব্যাংকঋণে অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ার চাপ-সব মিলিয়ে ঈদের আগে চামড়া খাত আবারও জটিল বাস্তবতার মুখে।
সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর দেশে এক কোটির বেশি পশু কোরবানি হতে পারে। এই বিপুল চাহিদাকে কেন্দ্র করে ট্যানারি মালিকরা ৭৫ থেকে ৮০ লাখ পিস চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্য ঠিক করেছেন। রাজধানী ঢাকায় কোরবানি হওয়া চামড়ার প্রায় ৮০ শতাংশই সরাসরি সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। গত বছরের তুলনায় সংগ্রহ বাড়ানোর লক্ষ্য থাকলেও বাস্তব পরিস্থিতি সেই পরিকল্পনাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।
চামড়া ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রস্তুতির ঘাটতি নেই, কিন্তু মূল সংকট অর্থের। কাঁচা চামড়া আড়তদারদের সংগঠন বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক টিপু সুলতান ঢাকাপোস্টকে বলেন, বছরের বড় অংশের চামড়া কোরবানির সময়ই সংগ্রহ হয়, তাই এ সময় নগদ অর্থ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। কিন্তু ট্যানারিগুলোর কাছে আগের পাওনা আটকে থাকায় আড়তদাররা চরম আর্থিক চাপে আছেন। তার মতে, ঋণ বিতরণের কথা থাকলেও অধিকাংশ ট্যানারি ঋণখেলাপি হয়ে পড়ায় নতুন অর্থায়নও সহজ হচ্ছে না।
মৌসুমী ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, সরকার নির্ধারিত দামের বাইরে গিয়ে বেশি লাভের আশায় চামড়া কেনা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। পশুর আকার নয়, বর্গফুট হিসাবেই চামড়ার দাম নির্ধারিত হবে। পাশাপাশি তিনি দ্রুত লবণ দিয়ে চামড়া সংরক্ষণ করে যত দ্রুত সম্ভব আড়তে পৌঁছে দেওয়ার পরামর্শ দেন। তার ভাষায়, দেরি হলে চামড়ার মান কমে যায়, আর তাতেই লোকসানের ঝুঁকি বাড়ে।
ট্যানারি মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান সাখাওয়াত উল্লাহ ঢাকাপোস্টকে বলেন, আড়তদারদের পাওনা টাকা পুরোপুরি পরিশোধ না হওয়ার বিষয়টি সত্য। তার ভাষায়, ট্যানারিগুলোর সঙ্গে আড়তদারদের ব্যবসা সারা বছর চলমান একটি প্রক্রিয়া। তবে সাভারে ট্যানারি স্থানান্তরের পর অনেক কারখানা এখনো পুরো সক্ষমতায় চালু না হওয়ায় অর্থ পরিশোধে কিছুটা চাপ তৈরি হয়েছে।
আর্থিক সংকটের বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি আরও বলেন, আমাদের চাহিদার ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ চামড়া এই কোরবানির ঈদে সংগ্রহ করা হয়। ফলে এ সময় নগদ টাকার প্রয়োজনও সবচেয়ে বেশি থাকে। কিন্তু ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার চাহিদা কমেছে এবং আমাদের ব্যবসাও ভালো হয়নি। এছাড়া ব্যাংকের শর্ত ও বাজারের চাপে অনেক ব্যবসায়ী প্রয়োজনীয় ঋণ সুবিধা পাচ্ছেন না। ফলের সব মিলিয়ে কঠিন বাস্তবতার মধ্যে পড়েছে চামড়া খাত। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের কাছে সহজ শর্তে নগদ অর্থের সহায়তা চান ট্যানারি মালিকরা
মৌসুমী ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে এই ট্যানারি মালিকের পরামর্শ, বেশি লাভের আশায় চামড়া ধরে না রেখে দ্রুত বিক্রি করাই ভালো। তার মতে, সন্ধ্যার মধ্যেই চামড়া বিক্রি করা গেলে তুলনামূলক ভালো দাম পাওয়া যায়, কারণ সময় যত গড়ায় চামড়ার মান ও দাম-দুটোই কমে যায়।
চামড়া খাতে অর্থায়নের চিত্রও উদ্বেগজনক। চলতি বছর রাষ্ট্রায়ত্ত তিন ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংক চামড়া কেনার জন্য মোট ২৯৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। কিন্তু অতীতের ঋণখেলাপি ও কঠোর শর্তের কারণে বাস্তবে এর বড় অংশ বিতরণ না হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, কার্যকর বিতরণ ১০০ কোটি টাকার নিচে নেমে যেতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে চামড়া কেনার জন্য লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬৪৪ কোটি টাকা, কিন্তু বিতরণ হয়েছিল মাত্র ৬৫ কোটি টাকা। এর আগের বছর ২০২৪ সালে বিতরণ হয়েছিল ১২৫ কোটি টাকা। ফলে বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবে অর্থ না পৌঁছানোর চিত্র এবারও বদলাবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
এদিকে সরকার এ বছর কোরবানির চামড়ার দাম আগেই নির্ধারণ করে দিয়েছে। ঢাকায় লবণযুক্ত গরুর চামড়া প্রতি বর্গফুট ৬২ থেকে ৬৭ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৫৭ থেকে ৬২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। খাসির চামড়া ২৫ থেকে ৩০ টাকা এবং বকরির চামড়া ২২ থেকে ২৫ টাকা দরে নির্ধারিত।
তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, কাগজে দাম নির্ধারিত থাকলেও বাস্তবে চামড়ার মান, সংরক্ষণ এবং পরিবহন ব্যয়ই শেষ পর্যন্ত বাজার নির্ধারণ করবে। তাদের আশঙ্কা, এসব খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে কাঁচা চামড়ার প্রকৃত দাম প্রতি পিস ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
সব মিলিয়ে, ঈদের চামড়া বাজারে পুরোনো সংকটই এবার নতুন করে সামনে এসেছে। প্রস্তুতির ঘোষণা থাকলেও মাঠের বাস্তবতা বলছে, নগদ অর্থের ঘাটতি, বকেয়া জট ও ঋণসংকট না কাটলে এই গুরুত্বপূর্ণ খাত আবারও চাপের মুখে পড়তে পারে। ফলে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে-চামড়া থাকবে, কিন্তু বাজারে টাকা থাকবে তো?