Image description

রাজধানীজুড়ে ভারী বৃষ্টির কারণে ব্যাপক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। গত দুদিনের বৃষ্টিতেই ঢাকার প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলি পর্যন্ত তলিয়ে গেছে। সামনে ঈদুল আজহা থাকায় এই অকাল জলাবদ্ধতা নগরবাসীকে এক চরম দুর্ভোগের মুখে দাঁড় করিয়েছে। সহজে এই দুর্ভোগ থেকে পরিত্রাণের লক্ষণ নেই। আবহাওয়া দপ্তর আগামী তিনদিন রাজধানীতে বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে।

 

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল সন্ধ্যা ছয়টা নাগাদ ৫৭ মিলিমিটার বৃষ্টিতেই রাজধানীজুড়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। রাতে আরো বৃষ্টি হয়, এতে মঙ্গলবার সকাল ছয়টায় আগের ২৪ ঘণ্টায় রাজধানীতে ৮০ আর সকাল থেকে বিকাল ৩টা নাগাদ ৪২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এতে মানুষের দুর্ভোগ ক্রমেই বেড়ে চলেছে। এছাড়া দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও ভারী বৃষ্টি হচ্ছে। সকাল থেকে দুপুর ১২টা নাগাদ চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে ৭৪, ফেনিতে ৬৯, চট্টগ্রামে ৩৫ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে।

এর আগে সকালে আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়, মঙ্গলবার রংপুর, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায়; ঢাকা, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় এবং খুলনা ও বরিশাল বিভাগের দু’এক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা বা ঝড়ো হাওয়া ও বিদ্যুৎ চমকানোসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি কিংবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সাথে রংপুর, রাজশাহী, ঢাকা, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী থেকে ভারী বর্ষণ হতে পারে।

বর্ধিত ৫ দিনের আবহাওয়ার অবস্থায় পূর্বমধ্য বঙ্গোপসাগর এলাকায় একটি লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে। এছাড়া ঢাকা ও আশাপাশের আবহাওয়ার পূর্বাভাসে দুপুর ১টা থেকে পরবর্তী ছয় ঘন্টায় রাজধানীর আকাশ মেঘলাসহ বৃষ্টি কিংবা বজ্রবৃষ্টির সম্ভাবনার কথা জানানো হয়েছে।

 

rain4

 

বিকাল ৩টার পর আবহাওয়াবিদ তরিফুল নেওয়াজ কবির আমার দেশকে বলেন, আগামী ৩ দিন ঢাকাতে হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। আগামীকাল বুধবারও বৃষ্টি হবে। ঈদের দিন সকালেও বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া রংপুর, রাজশাহী, ঢাকা, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী থেকে ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকবে।

তিনি আরো বলেন, ২-৩ দিন পর পূর্বমধ্য বঙ্গোপসাগর এলাকায় (মায়ানমার সীমান্তে) একটি লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে। ওইসময় উত্তরের বৃষ্টি কমে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে বৃষ্টির প্রবণতা বাড়তে পারে।

 

rain1

 

এদিকে ঈদের ছুটিতে ঘরমুখো মানুষের ঢল নেমেছে বাস টার্মিনাল ও রেলস্টেশনগুলোতে। কিন্তু গাবতলী, মহাখালী, সায়েদাবাদ রুটের সংযোগ সড়কগুলো এবং ঢাকার প্রবেশপথ গাজীপুর ও সাভার রুটের ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক পানিতে তলিয়ে থাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট লেগে আছে। একদিকে গণপরিবহনের তীব্র সংকট, অন্যদিকে অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে সাধারণ যাত্রীদের স্টেশনে পৌঁছাতেই নাকাল হতে হচ্ছে।

কোরবানির পশুর হাটগুলো বৃষ্টির পানিতে একাকার হয়ে গেছে। বিশেষ করে নিচু এলাকার হাটগুলোতে হাঁটু সমান কাদা ও পানি জমে যাওয়ায় ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয় পক্ষই পড়েছেন মহাবিপাকে। হাটে গরু নিয়ে আসা খামারিরা গবাদিপশু শুষ্ক স্থানে রাখা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন, আর ক্রেতারাও কাদা-পানি মাড়িয়ে হাটে ঢুকতে পারছেন না।

নিউমার্কেট, নীলক্ষেত, আজিমপুর, মালিবাগ ও পুরান ঢাকার মতো জনাকীর্ণ বাণিজ্যিক এলাকাগুলোর রাস্তায় নদীসম পানি জমে গেছে। ঈদের ঠিক আগমুহূর্তে যেখানে ব্যবসায়ীদের সবচেয়ে বেশি বিক্রির কথা, সেখানে অনেক দোকানের ভেতর পানি ঢুকে মালামাল নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। ক্রেতা না থাকায় বিক্রেতারা চরম লোকসানের আশঙ্কা করছেন। নিষ্কাশন ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে প্রতিবারই সামান্য বৃষ্টিতে ঢাকাবাসীকে এই চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে রাস্তার খোলা ম্যানহোল বা গর্ত সম্পর্কে সতর্ক থাকা জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

আজ মঙ্গলবার ভোরের মুষলধারে বৃষ্টিতে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন পশুর হাটের ক্রেতা ও বিক্রেতারা। মঙ্গলবার ভোররাত থেকে শুরু হওয়া বিকাল ৩টা নাগাদ থেমে থেমে ভারী বৃষ্টিতে হাটের পশুর পাশাপাশি ভিজে একাকার হয়েছেন হাটে আসা মানুষ। কাদা আর পানিতে একাকার হয়ে যাওয়ায় কোরবানির পশুর হাটের স্বাভাবিক বেচাকেনা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

 

rain

 

সকালে সরেজমিনে কেরানিগঞ্জ কদমতলী ও জিঞ্জিরার পশুর হাট ঘুরে দেখা গেছে, ভোরের আকস্মিক বৃষ্টিতে হাটের ভেতরের নিচু জায়গাগুলোতে পানি জমে গেছে। কোথাও কোথাও হাঁটু সমান কাদা তৈরি হয়েছে। গোবর, আবর্জনা আর বৃষ্টির পানি মিশে একাকার হয়ে যাওয়ায় হাটের পরিবেশ হয়ে উঠেছে দুর্গন্ধময়।

হাটে গরু নিয়ে আসা কুষ্টিয়ার ব্যাপারী আলী হোসেন আমার দেশকে বলেন, ‘ভোররাতে যখন হুট করে বৃষ্টি নামল, তখন গরুগুলোকে বৃষ্টির পানি থেকে বাঁচানোর কোনো উপায় ছিল না। ত্রিপল টাঙানোর আগেই সব গরু ভিজে গেছে। এখন কাদার মধ্যে গরুগুলো দাঁড়িয়ে আছে, বসার কোনো জায়গা নেই। ঠান্ডায় গরু অসুস্থ হয়ে পড়ার ভয় পাচ্ছি।’

বৃষ্টির কারণে সকাল থেকে হাটে ক্রেতাদের উপস্থিতি ছিল অনেক কম। তবে যারা হাটে এসেছিলেন, তাদের অনেকেই পড়েছেন বিপাকে। বৃষ্টিতে ভিজে কাদা মাড়িয়ে তাদের হাটে ঘুরতে দেখা গেছে।

হাটে আসা এক ক্রেতা বেসরকারি চাকরিজীবী নজরুল ইসলাম বলেন, ভোরবেলা একটু ঠান্ডা আবহাওয়া দেখে হাটে এসেছিলাম। কিন্তু বৃষ্টির কারণে পুরো হাট এখন কাদাযুক্ত। গরু পছন্দ হলেও কাদার কারণে ঠিকমতো দাঁড়িয়ে দেখা যাচ্ছে না। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, কেনার পর গরু হাটের বাইরে নিয়ে যাওয়ার মতো গাড়ি পাওয়া যাচ্ছে না।

ভোগান্তি শুধু হাটের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নেই; যারা গরু কিনে ফেলেছেন, তাদের দুর্ভোগ যেন আরও এক কাঠি ওপরে। বৃষ্টিতে ভিজে ভিজেই অনেকে কিনে ফেলা প্রিয় পশুটিকে নিয়ে বাড়ির পথ ধরেছেন। পিকআপ চালকরা এই সুযোগে অতিরিক্ত ভাড়া হাঁকছেন বলে অভিযোগ করেছেন অনেক ক্রেতা। বৃষ্টি থেকে গরুকে বাঁচাতে অনেককে চটের বস্তা বা প্লাস্টিকের শিট দিয়ে গরুর পিঠ ঢেকে ধীরপায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরতে দেখা গেছে।

 

rain5

 

কেরানিগঞ্জ কদমতলী হাট পরিচালনা কমিটির (ইজারাদার) পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভোরের বৃষ্টির কারণে সাময়িক এই সমস্যা তৈরি হয়েছে। পশুর হাটের পানি নিষ্কাশনের জন্য দ্রুত ড্রেন পরিষ্কার করা হচ্ছে এবং কাদা কমানোর জন্য বিভিন্ন পয়েন্টে বালু ফেলা হলেও বারবার ভারী বৃষ্টির কারণে তা কাজে আসছে না। বৃষ্টি না থামলে হাটের পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হওয়া কঠিন হবে বলে মনে করছেন তারা।

আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, দিনের বাকি সময়েও আকাশ মেঘলা থাকতে পারে এবং কয়েক পশলা বৃষ্টি হতে পারে। ফলে বিকালের দিকে হাটে ক্রেতাদের ভিড় বাড়লে ভোগান্তি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।