Image description

ঈদকে সামনে রেখে নিম্নআয়ের বহু মানুষ ট্রাক ও পিকআপে করে বাড়ি ফিরছেন। অতিরিক্ত ভাড়া এড়াতে তারা বেছে নিচ্ছেন অনিরাপদ এই যাতায়াত ব্যবস্থা। গতকাল ২৫ মে টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে রডবোঝাই ট্রাক উল্টে ১৫ জন নিহতের ঘটনার পরও থেমে নেই ঝুঁকিপূর্ণ এই যাতায়াত ব্যবস্থা। যেন মৃত্যু ভয়কে পেছনে ফেলে শ্রমজীবী মানুষগুলোর কাছে কিছু টাকা বাঁচানোর চেষ্টাই এখন বাস্তবতা।

গাজীপুরের চন্দ্রা ত্রিমোড় এলাকায় পোশাক শ্রমিক রাহেলা বেগমের সঙ্গে কথা হয় ঢাকা পোস্টের। তিনি কাজ করেন গাজীপুরের কালিয়াকৈরে উপজেলার মৌচাক এলাকার একটি পোশাক কারখানায়। ঈদ উপলক্ষে তিনি পেয়েছেন বেতনের ১২ হাজার টাকা ও কিছু বোনাস। ঈদের বাজার ও কিশোরী দুই মেয়ের জন্য কেনাকাটা করেছেন সেই টাকা থেকেই। এরপর নিজ ঠিকানা সিরাজগঞ্জে যেতে গাজীপুরের চন্দ্রা বাস স্টেশন এলাকায় মেয়েদের নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন অল্প ভাড়ার একটি পরিবহনে ওঠার জন্য। তবে যাত্রীবাহী বাসে জনপ্রতি ভাড়া ৮শ টাকা। তাই এই নারী উঠেছেন একটি ট্রাকে, যেখানে জনপ্রতি তার খরচ পড়েছে ৪শ টাকা। ১২শ টাকা বাঁচাতে দুই সন্তানসহ তার জীবনের ঝুঁকি আছে জেনেও ট্রাকেই বাড়ি যাচ্ছেন তিনি। 

শুধু রাহেলা বেগম নন, গাজীপুরের চন্দ্রা ত্রিমোড় এলাকায় এভাবে ঝুঁকি নিয়ে বাড়ি ফিরছেন শত শত ঘরমুখী মানুষ। এতে মহাসড়কে দুর্ঘটনার শঙ্কা বাড়ছে। অথচ প্রকাশ্যে এসব নিষিদ্ধ যানবাহনে যাত্রী পরিবহন চললেও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে দেখা যাচ্ছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে।

মঙ্গলবার (২৬ মে) সকাল থেকে জেলার ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের চন্দ্রা ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ভোগড়া এলাকায় দেখা যাচ্ছে ট্রাক ও পিকআপে ঘরমুখী মানুষের যাত্রার এমন চিত্র। 

সরেজমিনে দেখা যায়, চন্দ্রা ত্রিমোড় এলাকা থেকে উত্তরাঞ্চলমুখী যাত্রীরা ভাড়া বাঁচাতে দূরপাল্লার বাসের পরিবর্তে খোলা ট্রাক, পিকআপে উঠছেন। অনেকে পরিবারের সদস্যদের নিয়েও এমন ঝুঁকি নিচ্ছেন। দূরের এ পথে যানজট, বৃষ্টিসহ নানা ভোগান্তি মাথায় নিয়েই পাড়ি জমাচ্ছেন যাত্রীরা। এতে যে কোনো মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার শঙ্কা রয়েছে। 

এদিকে চন্দ্রা এলাকায় সড়কের নিরাপত্তা ও যানজট নিরসনে কাজ করছে দুই শতাধিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পুলিশের তৎপরতার মধ্যে দিয়েও উত্তরাঞ্চলমুখী মালবাহী ট্রাক, ছোট পিকআপ সড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে থেমে যাত্রী নিতে দেখা গেছে। 

শামীম হোসেন নামে এক পিকআপের চালকের কাছে যাত্রী তোলার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমরা সিরাজগঞ্জের যাত্রী নিচ্ছি মাথাপিছু ৪শ টাকা করে। আর বাসের ভাড়া ৬শ টাকা। তাই অনেক যাত্রীরা পিকআপে উঠছে। আমাদের কেউ যাত্রী নিতে বাধা দেয় না। এখানে কিছু লোক আছে তারা আমাদের যাত্রী তুলে দেয়। বিনিময়ে তাদের ২শ থেকে ৩শ টাকা দিতে হচ্ছে। 

রাশেদুল নামে এক মালবাহী ট্রাকের চালক বলেন, একটু ফাঁকা স্থানে দাঁড়ালেই যাত্রী পাওয়া যাচ্ছে। বাসের চেয়ে ভাড়া কম নিচ্ছি তাই যাত্রীরা ট্রাকে উঠছে। আবার বাস স্টেশনে কিছু লোক আছে যারা ট্রাকে যাত্রী তুলে দিচ্ছে। তাদের যাত্রী প্রতি ৫০ টাকা কমিশন দিতে হয়। 

ট্রাকে ওঠা যাত্রী হাফেজ মিয়া বলেন, মাত্র ১৫ হাজার টাকা বেতনের চাকরি করি। স্ত্রী ও দুই বাচ্চা নিয়ে বাড়ি যাইতেছি। বাসে গেলে চারজনের জন্য দুই সিটের ভাড়া ১৬০০ টাকা তাই ভাড়া বাঁচাইতে ট্রাকে উঠছি। জ্যাম না থাকলে অল্প সময়েই পৌঁছে যাব। আর যদি আল্লাহ এই যাত্রায় মরণ লেইখা রাখে, তাইলে মইরা যামু। কিন্তু তখন আর কেউ জিজ্ঞাসা করব না ট্রাকে কেন যাইতেছি। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, যেখানে সাধারণ সময়ে বাসের ভাড়া ৪০০ টাকা, সেখানে এখন ৮০০ টাকা দিতে হয়। আমাদের এই কষ্ট দেখব কে। সরকারের কেউ আইসা তো বলছে না বাস ভাড়া কম নিতে। 

গাজীপুর রিজিয়নের নাওজোড় হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাউগাতুল আলম ঢাকা পোস্টকে বলেন, বাস্তবতা বড়ই নিষ্ঠুর, প্রয়োজন আইন মানে না। আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকা সত্বেও যত মানুষ তত গাড়ির ব্যবস্থা না থাকার বিষয়টি আমাদের মাথায় রাখতে হচ্ছে। 

প্রসঙ্গত, ঈদযাত্রার প্রথম দিন সোমবার (২৫ মে) সকালে গাজীপুর থেকে যাত্রী নিয়ে নওগাঁর উদ্দেশে যাওয়া একটি রডবোঝাই ট্রাক টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই ১৫ জন নিহত হন। এবারের ঈদযাত্রায় এটিই এখন পর্যন্ত দেশের সবচেয়ে বড় সড়ক দুর্ঘটনা।