চট্টগ্রামে গত বছর সরকার নির্ধারিত দামও না পেয়ে কোরবানির পশুর চামড়া রাস্তায় ফেলে দিতে দেখা গিয়েছিল। তবে এবার যে সেরকম হবে না—তেমন নিশ্চয়তা মিলছে না প্রশাসনের পক্ষ থেকে।
চামড়ার পচে যাওয়া ঠেকাতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের গঠিত কমিটির একমাত্র অস্ত্র ‘সচেতনতা’। কমিটির চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমন্বয়ক বলছেন, চামড়ার পচন ঠেকাতে এবং সঠিক পদ্ধতিতে চামড়া ছাড়াতে ঈদের দিন মসজিদে মসজিদে সচেতনতামূলক বক্তব্য রাখার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এদিকে, সরকার এবছর চামড়ার দাম বাড়ালেও উল্টো গত বছরের চেয়ে কম দাম দিয়ে চামড়া কিনতে চাইছে সিন্ডিকেট। আবার চামড়া বিক্রিতে এসব সিন্ডিকেটের বাইরে যাওয়ার ‘সুযোগ নেই’ বলে অভিযোগ চামড়া সংগ্রহকারীদের। অন্যদিকে, চামড়া সংরক্ষণে বিনামূল্যে দেওয়া সরকারি লবণ বিতরণেও উঠেছে অনিয়মের অভিযোগ।
বৃহত্তর চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির নেতারা বলছেন, গত বছরের মতো চট্টগ্রামে এবারও প্রায় কোরবানির পশুর সোয়া চার লাখ চামড়া সংগ্রহ হবে। তবে কাঁচা চামড়া রাস্তায় ফেলে দেওয়ার ঘটনাকে ‘গণমাধ্যমের অতিরঞ্জন’ বলে দাবি তাদের।
দেশীয় ব্যবহারের পাশাপাশি রপ্তানিযোগ্য পণ্য হওয়ার পরও দেশে বরাবরই ‘ফেলনা পণ্য’ হয়ে দাঁড়ায় কোরবানির পশুর চামড়া। লাখ টাকার গরুর চামড়ার দাম দুইশো টাকাও মেলে না। কোরবানির পশু হিসেবে জবাইকৃত গরু, মহিষ কিংবা ছাগলের চামড়া চট্টগ্রামের বেশিরভাগ কোরবানিদাতা ধর্মীয় ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানে বিনামূল্যে দান করে দেন। লাভ না হওয়াতে গ্রাম থেকে চামড়া সংগ্রহ করতে আগ্রহ দেখান না মৌসুমী ব্যবসায়ীরাও।
কোরবানিতে পশুর চামড়া বিক্রির পুরো টাকাই কোরবানিদাতারা হতদরিদ্র গরিব মানুষদের মাঝে দান করে দেন। পশুর চামড়ার ন্যায্য দাম না মেলায় সমাজের হতদরিদ্র শ্রেণির মানুষরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। তবে দীর্ঘদিন ধরেই কোরবানি পশুর চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা সম্ভব না হলেও এবারের ঈদুল আজহা ঘিরে চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার নির্দেশনা দিয়েছে সরকার।
এবার চামড়া সংগ্রহে সরকারের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হচ্ছে। ব্যাংকগুলো থেকেও ব্যবসায়ীরা ঋণ পেয়েছেন। পুরো চট্টগ্রামে গত বছর ৪ লাখ ১৫ হাজার চামড়া সংগ্রহ হয়েছিল। এবারও চার থেকে সাড়ে ৪ লাখ পিস পশুর চামড়া সংগ্রহ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।—মো. মুসলিম উদ্দিন
এবছর কোরবানির পশুর লবণযুক্ত চামড়ার দাম গত বছরের তুলনায় প্রতি বর্গফুটে দুই টাকা বাড়ানো হয়েছে। ঢাকায় প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত গরু ও মহিষের চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৬২ থেকে ৬৭ টাকা, যা গত বছর ছিল ৬০ থেকে ৬৫ টাকা। অন্যদিকে, ঢাকার বাইরে প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত গরু ও মহিষের চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৭ থেকে ৬২ টাকা, যা গত বছর ছিল ৫৫ থেকে ৬০ টাকা।
এবার সারাদেশে প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত খাসির চামড়া ২৫ থেকে ৩০ টাকা এবং বকরির চামড়া ২২ থেকে ২৫ টাকা নির্ধারণ করেছে সরকার। তবে বিগত বছরগুলোতে খাসি কিংবা বকরির চামড়া চট্টগ্রামের আড়তগুলোতে তেমন বেচাকেনা হতে দেখা যায়নি। শেষ পর্যন্ত কোরবানির পশুর এসব চামড়ার স্থান হয় ডাস্টবিনে।
চট্টগ্রামে গত বছর ডাস্টবিন থেকে চামড়া সংগ্রহের পর তা সংরক্ষণ উপযোগী করতে দেখা যায়/ফাইল ছবি
চট্টগ্রামে কোরবানির পশুর চামড়া সংরক্ষণের বড় স্থান নগরীর হামজার বাগ ও আতুরার ডিপো এলাকা। এখানে ৪০-৫০টির মতো স্থায়ী ও অস্থায়ী গুদামে কাঁচা চামড়া সংরক্ষণ করা হয়। চট্টগ্রামের কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বছর আতুরার ডিপো এলাকায় আকারভেদে গড়ে দুইশো থেকে চারশো টাকায় প্রতিটি গরু ও মহিষের চামড়া কিনেছেন আড়তদার ব্যবসায়ীরা।
তারা বলছেন, কোরবানিতে ফড়িয়া ব্যবসায়ীরা গ্রাম পর্যায় থেকে চামড়া সংগ্রহ করে এখানকার আড়তগুলোতে নিয়ে আসেন। ২০২৫ সালে বিক্রি করতে না পেরে হাজার হাজার চামড়া পুরো নগরীর রাস্তাগুলোতে ফেলে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। ডাম্পার ট্রাকে করে পচে যাওয়া এসব চামড়া সরাতে হিমশিম খেতে হয়েছিল চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনকে।
চট্টগ্রামের চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির নেতারা জানিয়েছেন, আতুরার ডিপো বাদেও নগরীর চাক্তাই, বাকলিয়া, মাঝিরঘাট, হালিশহর, পতেঙ্গা, নাছিরাবাদ শিল্প এলাকা, সাগরিকা শিল্প এলাকায় মৌসুমী ব্যবসায়ীরা লবণযুক্ত চামড়া সংরক্ষণ করেন। ৭ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে ঢাকার ট্যানারি মালিকদের কাছে এসব চামড়া বিক্রি করে দেন তারা।
নগরীর বাইরেও উপজেলা পর্যায়ে মৌসুমী চামড়া ব্যবসায়ীরা অস্থায়ী সামিয়ানা তৈরি করে চামড়া লবণ নিয়ে সংরক্ষণ করেন। অন্যদিকে, ধর্মীয় ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলো কোরবানিদাতাদের কাছ থেকে বিনামূল্যে সংগ্রহ করে চামড়া নিয়ে আসেন আতুরার ডিপো এলাকায়।
সরকার এবছর চামড়ার দাম বাড়িয়েছে। কিন্তু গত বছর যে দামে চামড়া বিক্রি করেছি ওই দামেও এবার ক্রেতা মিলছে না। সিন্ডিকেটের বাইরে অন্য ক্রেতাদের এখানে আসতে দেওয়া হচ্ছে না। এবার গত বছরের চেয়ে প্রতি পিস চামড়া একশো টাকা কমে কিনতে চাইছে।—মোহাম্মদ মনজুর আলম
বৃহত্তর চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতি মো. মুসলিম উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘এবার চামড়া সংগ্রহে সরকারের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হচ্ছে। ব্যাংকগুলো থেকেও ব্যবসায়ীরা ঋণ পেয়েছেন। পুরো চট্টগ্রামে গত বছর ৪ লাখ ১৫ হাজার চামড়া সংগ্রহ হয়েছিল। এবারও চার থেকে সাড়ে ৪ লাখ পিস পশুর চামড়া সংগ্রহ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘কোরবানিতে আমরা যথেষ্ট সোচ্চার থাকি, যেন সংরক্ষণের অভাবে চামড়া নষ্ট হয়ে না যায়। লবণ দিয়ে সময়মতো সংরক্ষণ করা না গেলে কাঁচা চামড়া পচে নষ্ট হয়ে যায়। আবহাওয়া গরম থাকলে দ্রুত লবণ দিয়ে চামড়া সংরক্ষণ করতে হবে। অন্যথায় পচে যাবে। পচে যাওয়া চামড়া বিক্রি করা যায় না।’
গত বছর চামড়া রাস্তায় ফেলে দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এগুলো মিডিয়ার বাড়াবাড়ি। চামড়া তেমন একটা নষ্ট হয়নি। টেলিভিশনগুলো বেশি বেশি করে দেখিয়েছে।’
চামড়ার দাম নিয়ে সিন্ডিকের দৌড়াত্ম্য নিয়ে এবারও শঙ্কায় সংগ্রহকারীরা/ফাইল ছবি
চট্টগ্রামে চামড়া ব্যবসায়ীদের বাইরে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ চামড়া সংগ্রহ করে লবণজাত করে থাকেন আনজুমানে রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্ট। তারা নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় মিসকিন ফান্ডের জন্য বিনামূল্যের চামড়া সংরক্ষণ করেন। লবণজাত চামড়া বিক্রির জন্য গত বছর পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়েও উন্মুক্ত টেন্ডারে ক্রেতা পাওয়া যায়নি বলে জানান ট্রাস্টের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মনজুর আলম।
তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা ৩০ হাজারের মতো চামড়া সংগ্রহ করেছিলাম। এগুলো সাধারণ মানুষ মাদরাসার মিসকিন ফান্ডের জন্য দিয়ে থাকে। আমরা গত বছর টেন্ডারের মাধ্যমে চামড়া বিক্রির জন্য টাকা খরচ করে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়েছি। কিন্তু কোনো দরদাতা পাওয়া যায়নি। পত্রিকায় দেওয়া বিজ্ঞাপনের টাকাও আমাদের লোকসানে গেছে।’
‘সরাসরি ট্যানারি কিংবা কারখানায় চামড়া বিক্রির ব্যবস্থা করতে হবে সরকারকে। এখন আমরা যার কাছে আগে বিক্রি করেছি, তার বাইরে যাওয়া যাচ্ছে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘সরকার এবছর চামড়ার দাম বাড়িয়েছে। কিন্তু গত বছর যে দামে চামড়া বিক্রি করেছি ওই দামেও এবার ক্রেতা মিলছে না। সিন্ডিকেটের বাইরে অন্য ক্রেতাদের এখানে আসতে দেওয়া হচ্ছে না। এবার গত বছরের চেয়ে প্রতি পিস চামড়া একশো টাকা কমে কিনতে চাইছে।’ ‘গরিব মিসকিনের হক আমরা কাদের পেটে তুলে দেবো’—প্রশ্ন রাখেন মোহাম্মদ মনজুর আলম।
গত বছর সবচেয়ে বেশি চামড়া নষ্ট হয়েছিল চট্টগ্রামে। সরকারি সমন্বয়হীনতার কারণে তেমনটি হয়েছিল বলে ধারণা অনেকের। প্রতিবছর চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের গঠিত সমন্বয় কমিটিতে গত বছর চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমন্বয়কের দায়িত্বে ছিলেন চা বোর্ডের সদস্য (অর্থ ও বাণিজ্য) ইয়াছমিন পারভীন তিবরীজি। এবার চামড়া সংগ্রহ ব্যবস্থাপনা কমিটির চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমন্বয়ক করা হয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক (সরকারের যুগ্ম সচিব) মোহাম্মদ মোস্তফা জামাল হায়দারকে।
জানতে চাইলে মোস্তফা জামাল হায়দার জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা মন্ত্রণালয় থেকে চামড়া সংগ্রহ মনিটরিং করছি। চট্টগ্রামে চা বোর্ডের সচিব মো. মমিনুর রশিদের নেতৃত্বে আলাদা কমিটি করে দেওয়া হয়েছে। চামড়া যেন নষ্ট না হয় সে ব্যাপারে মসজিদে মসজিদে ইমামদের মাধ্যমে এলাকাভিত্তিক সচেতনতা তৈরিতে প্রচারণা চালানোর জন্য ইসলামি ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বিনামূল্যে লবণও বিতরণ করা হয়েছে। চামড়া নষ্ট ঠেকাতে সচেতনতার প্রতি গুরুত্ব দেন তিনি।’
গত বছর অনেককে রাস্তায় চামড়া ফেলে চলে যেতে দেখা গিয়েছিল। পুরো নগরীর মোড়ে মোড়ে চামড়ার স্তূপ জমেছিল। দুর্গন্ধে নগরবাসীর কষ্ট বাড়িয়েছিল চামড়া। এবারও চামড়া যে রাস্তা কিংবা ডাস্টবিনে ফেলা হবে না—সে নিশ্চয়তা কই।—এস এমনাজের হোসাইন
অন্যদিকে, কোরবানিকৃত পশুর কাঁচা চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ, ক্রয়-বিক্রয় সংক্রান্ত চট্টগ্রাম বিভাগীয় টিম লিডার চা বোর্ডের সচিব (সরকারের উপসচিব) মমিনুর রশিদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা গত ২৪ মে চট্টগ্রামের চামড়া ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করেছি। তাদের আগের সমস্যাগুলোর কথা শুনেছি। তাদের সমস্যাগুলো সমাধানে পদক্ষেপ নিয়েছি। এবার সরকারিভাবে চামড়া প্রতি বর্গফুটে ২ টাকা বাড়ানো হয়েছে। সরকার নির্ধারিত দামে চামড়া কেনার বিষয়ে ব্যবসায়ী নেতারা আমাদের আশ্বস্ত করেছেন।’
সঠিক সংরক্ষণের অভাবে প্রতিবছর বিপুল চামড়া নষ্ট হয়/ফাইল ছবি
তিনি বলেন, ‘চামড়া সংগ্রহের কিছু পদ্ধতি রয়েছে। সঠিকভাবে চামড়া ছাড়ানো না গেলে সেই চামড়া কাজে আসে না। আবার সঠিকভাবে চামড়া লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করতে হয়। এজন্য সচেতনতা বাড়াতে সরকারের পাশাপাশি গণমাধ্যমকে ভূমিকা রাখতে হবে। সাধারণ মানুষ সচেতন না হলে চামড়া নষ্ট হওয়া ঠেকানো অসম্ভব।’
তবে চামড়া সংগ্রহে সরকারিভাবে সমন্বয়হীনতা রয়েছে বলে দাবি করেছেন ভোক্তাদের সংগঠন কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘সরকার বিনামূল্যে বিতরণের জন্য লবণ দিয়েছেন। সেই লবণ কাদের দেওয়া হয়েছে, কারা পেয়েছেন—সেই তালিকা প্রকাশ করা হয়নি। কারা পেয়েছেন সে সম্পর্কে জেলা কিংবা মহানগরের বাসিন্দারা জানেনই না।’
‘গত বছর মানুষ চামড়া সংগ্রহ করে নিয়ে এসে সঠিক দামে বিক্রি করতে পারেননি। অনেকে গাড়ি ভাড়া পর্যন্ত তুলতে পারেননি। যে কারণে অনেককে রাস্তায় চামড়া ফেলে চলে যেতে দেখা গিয়েছিল। পুরো নগরীর মোড়ে মোড়ে চামড়ার স্তূপ জমেছিল। দুর্গন্ধে নগরবাসীর কষ্ট বাড়িয়েছিল চামড়া। এবারও চামড়া যে রাস্তা কিংবা ডাস্টবিনে ফেলা হবে না—সে নিশ্চয়তা কই’—যোগ করেন নাজের হোসাইন।