দুই দিন পর পবিত্র ঈদুল আজহা। পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে এরই মধ্যে রাজধানী ছাড়তে শুরু করেছে মানুষ। তবে দেশের বিদ্যমান হাম পরিস্থিতিতে ঈদের ছুটিতে শিশুদের ব্যাপারে অভিভাবকদের সজাগ থাকার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের। এক্ষেত্রে হামে আক্রান্ত শিশুকে আত্মীয়ের বাড়িতে না নেওয়া এবং ভিড় এড়িয়ে চলার তাগিদ দিয়েছেন তারা।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘এই মুহূর্তে হামের পিক পয়েন্ট (সর্বোচ্চ সংক্রমণ) চলছে। ফলে অসুস্থ বাচ্চাকে নিয়ে কেউ বাড়িতে গেলে সেখানে অন্য শিশুরা সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। এতে ভাইরাসটির বিস্তার ঘটতে পারে, দীর্ঘ হতে পারে সর্বোচ্চ সংক্রমণের মেয়াদ।’
তার মতে, যাদের পক্ষে সম্ভব বাচ্চাদের নিয়ে ঈদের পরে ভ্রমণ করা উচিত। ভিড় কমে গেলে তারপর যাওয়া ভালো। যারা শ্রমজীবী তারা এমনিতেই পরে যায়। কিন্তু মধ্যবিত্ত ও অন্যরা এই সময়ে যায়। কাজেই তাদের বিষয়টি মেনে চলার অনুরোধ করব। অন্যথায় বিদ্যমান হাম পরিস্থিতি আরও প্রলম্বিত হতে পারে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনও সচিবালয়ে এক অনুষ্ঠানে ঈদে শিশুদের বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। হাম আক্রান্ত শিশু যাতে সুস্থ শিশুর সঙ্গে মিশতে না পারে সেজন্য অভিভাবকদের সজাগ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা অনুরোধ করব, ঈদের সময়ে মায়েরা যেন হামে আক্রান্ত বাচ্চাকে নিয়ে আত্মীয়ের বাসায় বেড়াতে না যায়। একই সঙ্গে অনেক ভিড় আছে এমন জায়গায় না যাওয়ার পরামর্শ আমাদের। ভালো বাচ্চা কিংবা হামে আক্রান্ত শিশু যেন অন্য কারও সঙ্গে মিশতে না পারে, সে ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।’
মঙ্গলবার (২৬ মে) দুপুর পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে এ সংক্রান্ত কোনো লিখিত নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। এমনকি সরকারের প্রস্তুতি কি সে বিষয়েও কিছু জানানো হয়নি।
হামের চিকিৎসায় দেশের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র রাজধানীর শ্যামলীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট। হামের বিশেষায়িত ওয়ার্ডে কোনো শয্যা খালি নেই। শয্যার অভাবে অনেক রোগীকে ফিরে যেতে হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও নার্সরা।
পুরান ঢাকা থেকে সাত মাসের ছেলেকে নিয়ে এই হাসপাতালের হাম ওয়ার্ডে দিন কাটাচ্ছেন প্রিয়া দত্ত। তিনি বলেন, ‘ছেলের জ্বর সবসময়ই বেশি থাকে। হামের কারণে নিউমোনিয়া হয়েছে। এখন শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। স্বামী চায়ের দোকান করেন। ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও দুজন মানুষের খাবার খরচ মিলে অনেক টাকা গেছে। কবে নাগাদ রিলিজ পাব, জানি না।’
হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম বলেন, ‘টিকার কাভারেজ প্রায় শতভাগ, তবুও সতর্ক থাকতে হবে। এখনও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। রোগীর চাপ অনেক বেশি। এ হাসপাতালে এখন পর্যন্ত ৮২০ জন হামে আক্রান্ত শিশু চিকিৎসা নিয়েছে। মৃত্যু হয়েছে ৩০ জনের।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রথম হাম রোগী শনাক্ত হয়। মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে দেশের বেশিরভাগ এলাকায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। এরপর সারা দেশে বিস্তার ঘটে।
প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে গত ৫ এপ্রিল উচ্চ সংক্রমণপ্রবণ ১৮ জেলার ৩০ উপজেলায় বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে সরকার। এরপর ঢাকাসহ চার সিটি করপোরেশনে কার্যক্রম শুরু হয় ১২ এপ্রিল। ২০ এপ্রিল থেকে সারা দেশে একযোগে ছয় থেকে ৫৯ মাস বয়সি শিশুদের টিকা দেওয়া শুরু হয়। সরকার বলছে, লক্ষ্যমাত্রার বেশি টিকাদান সম্পন্ন হয়েছে। তবে টিকা দেওয়ার পরও থামছে না সংক্রমণ।