Image description

সরু গলির জালে আটকা পুরান ঢাকা। বুকভরে শ্বাস নিতে চাইলেও উঠতে হয় বাড়ির ছাদে। সেই ভিড় ও ঘিঞ্জির মধ্যে একটুখানি স্বস্তির জায়গা বাহাদুর শাহ পার্ক। সেখানেও শান্তি নেই, বাতাস ভরা বিষে! গাঁজাসেবীদের আড্ডা ও সিগারেটের ধোঁয়ায় বিশ্রাম তো দূরের কথা, নিঃশ্বাস নেওয়াও দুষ্কর। কারণ, পাশের টং দোকানগুলোতে হরদম ধূমপান করায় দূষিত হয় আশপাশের বায়ু। অকারণে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে পার্কে ঘুরতে আসা শিশু, নারী ও অধূমপায়ী মানুষ।

বাহাদুর শাহ পার্কে নিয়মিত হাঁটতে আসেন অনেক নারী। শিশুসন্তানদের কিন্ডার গার্টেনে রেখে বসে অপেক্ষা করেন অনেক মায়। পাশেই টং দোকানগুলোতে বসে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়েন বেশ কিছু ধূমপায়ী। এতে অস্বস্তি ও বিরক্তিতে অন্যত্র বসার জায়গা খুঁজতে হয় নারীদের।
সকালের সতেজ বাতাসে শ্বাস নিতে পার্কে এসে উল্টো ফুসফুসের ক্ষতি হচ্ছে বলে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানালেন এক নারী। হয়রানি এড়াতে নাম না জানিয়ে তিনি বললেন, এ জিনিস ফুঁকে কী লাভ, জানি না। এতে তাদের স্বাস্থ্য এবং টাকা দুটোই নষ্ট হয়। যদি ফুঁকতেই হয় তাহলে পাবলিক প্লেসে কেন? এতে তো আমাদের ক্ষতি হচ্ছে; কিন্তু দেখার যেন কেউ নেই।

না, দেখার জন্য আছে কর্তৃপক্ষ ও আইন। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সুপারিশে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি কার্যকর হয় ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫। সে অনুযায়ী, দেশে সব ধরনের পাবলিক প্লেস (জনসমাগমস্থল) ও গণপরিবহনে ধূমপান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আইন অমান্যে জরিমানা দুই হাজার টাকা। ২০০৫ এবং ২০১৩ সালের (সংশোধনী) আইনে যা ছিল যথাক্রমে ৫০ ও ৩০০ টাকা।

আইন অনুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ক্লিনিক, আদালত ভবন, বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর, নৌবন্দর, রেলওয়ে স্টেশন, বাস টার্মিনাল, শপিংমল, হোটেল, রেস্তোরাঁ, অফিস ও জনসমাগমস্থলে ধূমপান নিষেধ। এ ছাড়া গণপরিবহনের মধ্যে— বাস, ট্রেন, লঞ্চ ও সব ধরনের গণপরিবহন।
কিন্তু লাভ হয়েছে কী? আইনে শাস্তি বাড়ানোর পরও পরিস্থিতি বদলায়নি বলে অভিযোগ ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির সামনে পায়রা চত্বরে বসে চা খাচ্ছিলেন শিক্ষার্থী রাহাত। তার পাশেই বসে ধূমপান করছিলেন কয়েক যুবক। সিগারেটের ধোঁয়া আসছিল ওই ছাত্রের সামনে। ‘প্রতিদিন এখানে বসে ধূমপান করে অনেকে। আবার জনসমাগমও থাকে। এতে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হচ্ছি আমরা। সরকার জরিমানার পরিমাণ বাড়ালেও কার্যকরের পদক্ষেপ নেই। তাই পরিস্থিতি আগের মতোই। তাহলে আইন করে কী লাভ?— ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া তার।

আইনের বাস্তবায়ন না থাকায় পাবলিক প্লেসে ধূমপানের কথা স্বীকার করলেন এক যুবক। সম্মানহানি এড়াতে নাম না জানিয়ে তিনি বললেন, ‘আইন সংশোধন করার পর ভেবেছিলাম— যেখানে-সেখানে আর ধূমপান করব না। কিন্তু পরে দেখলাম; দায়িত্বশীল কারও থেকে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। বরং সবাই আগের মতোই ধূমপান করছে। প্রায় সময়েই দেখি অনেক পুলিশ সদস্যও পাবলিক প্লেসে ধূমপান করছেন। এই আইনের যথাযথ প্রয়োগ শুরু হলে আমিও পরিবর্তন করব অভ্যাসের। সঙ্গে কমবে ধূমপানের মাত্রাও।’

এ ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ক্লিনিক, খেলার মাঠ ও শিশুপার্কের ১০০ মিটারের মধ্যে তামাকজাত দ্রব্য বিক্রি নিষিদ্ধ। শুধু তা-ই নয়, তামাকজাত পণ্যের প্যাকেটের ৭৫ শতাংশ জুড়ে রঙিন ছবিসহ স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু প্যাকেটের গায়ে সতর্কবার্তা মিললেও অন্য নিয়মের কিছুই দেখা যায় না বাস্তবে।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ) হাসপাতালের সামনে পান-সিগারেট বিক্রি করছিলেন মো. আফাজ। চিকিৎসাকেন্দ্রের আশপাশে তামাকজাত দ্রব্য বিক্রির নিষেধাজ্ঞা জানেন কি না— এমন প্রশ্নে দিলেন সরাসরি জবাব। না, কখনো কেউ তো কিছু বলেনি। তার সরল স্বীকারোক্তি, দীর্ঘদিন ধরে এই হাসপাতালের সামনে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় সিগারেট বিক্রি করছেন; কিন্তু কখনো বাধা দেয়নি কেউ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বিশ্বব্যাপী তামাকবিরোধী প্রচারণায় বহু বছর ধরে বলে আসছে, ‘তামাক হলো একমাত্র বৈধ পণ্য, যা তার ব্যবহারকারীকে সঠিকভাবে ব্যবহার করলেও হত্যা করে।’

সেই সতর্কবাণীর সত্যতা পেয়েছে অ্যাকশন অন স্মোকিং অ্যান্ড হেলথ (এসএইচ)। সংস্থাটির গবেষণায় দেখা গেছে, একজন ধূমপায়ী একটি সিগারেটের সম্পূর্ণ তামাক সরাসরি নিঃশ্বাসের মাধ্যমে গ্রহণ করে না। পোড়ানো তামাকের প্রায় ১০-১৫ টানেই শেষ হয় সিগারেটটি। এর মধ্যে তামাক ও রাসায়নিকের মাত্র ১০-১৫ শতাংশ সরাসরি ঢোকে তার ফুসফুসে। বাকি ৮৫-৯০ শতাংশ মিশে যায় বাতাসে। এই অংশই শ্বাসের মাধ্যমে গ্রহণ করে অন্যরা। যেটি পরোক্ষ ধূমপান।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, পৃথিবীতে ১২৫ কোটির বেশি মানুষ তামাক ব্যবহার করে। প্রতি বছর প্রায় ৮৭ লাখ মারা যায় এ-সংক্রান্ত রোগে। যার ৭০ লাখের সঙ্গে সরাসরি জড়িত তামাক। আর পরোক্ষ ধূমপানের কারণে অকালে মৃত্যু ঘটে ১৩ থেকে ১৬ লাখ মানুষের। তামাকের কারণে প্রতি ৬ সেকেন্ডে মৃত্যু হয় একজনের। ২০৩০ সাল নাগাদ এ সংখ্যা আরও বাড়বে, প্রতি বছর বিশ্বে তামাকের কারণে মৃত্যু হতে পারে এক কোটি মানুষের। এর মধ্যে ৭০ লাখই হতে পারে বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের।

জনসমাগমস্থল ও গণপরিবহনে ধূমপান করার অপরাধে জরিমানা করার প্রধান কর্তৃপক্ষ হলো ভ্রাম্যমাণ আদালত এবং আইনের আওতাধীন অনুমোদিত কর্মকর্তারা। আইনের ৯ ধারা অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কিছু কর্মকর্তাকে পরিদর্শনের বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু নজরে পড়ে না সেই দায়িত্ব পালনের চিত্র।

বিএমইউ জনস্বাস্থ্য ও তথ্যবিজ্ঞান বিভাগের গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২৫-৬৯ বছর বয়সী নাগরিকদের তামাক (ধূমপান ও ধোঁয়াবিহীন) ব্যবহার ২০০৯ সালে ছিল ৫৪ শতাংশ। ২০২২ সালে তা নেমেছে ৪৭-এ। তামাকের ব্যবহার কমার আপেক্ষিক হার ১৩ শতাংশ। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এনসিডি প্রতিরোধ রোডম্যাপ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে এটি নামাতে হবে ৩০ শতাংশে।

জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও তামাক নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে দেশের বেসরকারি গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি সংস্থা প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান)। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক এ বি এম জুবায়েরের আহ্বান, সর্বশেষ জরিপটি চার বছর আগের, তাতে ধূমপানের হার কমেছে। আইন সংশোধনের পর নতুন জরিপ জরুরি। তবে জনসমাগমস্থলে ধূমপান বন্ধ করতে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা প্রয়োজন।

জনসমাগমস্থলে ধূমপান নিয়ন্ত্রণে নতুন আইনের কার্যকারিতার বিষয়ে জানতে জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেলের মহাপরিচালক আখতার-উজ-জামানকে কল দিলে তিনি অফিসিয়াল কাজে ব্যস্ত বলে লাইন কেটে দেন।

সবশেষে সচেতন নাগরিকরা মনে করিয়ে দিলেন সেই প্রচলিত প্রবাদ— ‘কাজির গরু কিতাবে আছে, গোয়ালে নেই।’