দুয়েক বছর নয়, দীর্ঘ ২৫০ বছর ধরে পশুর হাটে নেই হাসিল। হাট সংশ্লিষ্টরা পূর্বসূরির এই ঐতিহ্য এখনো লালন করছেন। কোরবানির ঈদ ঘিরে প্রতিদিন দূরদূরান্ত থেকে মানুষ পশু হাটে তুলছেন। কোনো ঝামেলা ছাড়াই নিজের মতো বিক্রি করে বাড়ি ফিরছেন।
ব্যতিক্রমী এই হাট ভোলা সদরের উত্তর দিঘলদী ইউনিয়নে। এলাকাবাসীর কাছে ‘বালিয়া মিঞা বাড়ির পশুর হাট’; আবার ‘গজারিয়া হাট’ নামেও পরিচিত। সরেজমিন হাটে পশু বেচাকেনায় কাউকে কোনো খাজনা দিতে দেখা যায়নি। টেবিল-চেয়ার বসিয়ে হাসিল আদায়েও কাউকে পাওয়া যায়নি।
প্রতি হাটে কমপক্ষে ৫ কোটি টাকার পশু বেচাকেনা হচ্ছে। বিক্রেতা ও ক্রেতারা স্বস্তিতে লেনদেন করতে পারছেন। মিঞা পরিবারের সদস্য আইনুর রহমান জুয়েল জানান, ২৫০ বছর আগে তাদের পূর্বসূরি আরব আলী মিঞা কোরবানির পশু কিনতে দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের বাংলাবাজার খাষেরহাটে যান। সেখান থেকে পশু কিনে ফেরার পথে খাজনা আদায়কারীরা তাঁকে হয়রানি করেন। বিষয়টি আত্মসম্মানে লাগলে বাড়ির সামনের বিশাল মাঠে আরব আলী খাজনামুক্ত পশুর হাট চালু করেন। সেই থেকে আজও এটি খাজনা মুক্ত।
শত বছরের পুরোনো এই হাটে এক সময় নদীপথে গরু-মহিষ নিয়ে আসতেন ব্যবসায়ীরা। সময়ের পরিবর্তনে এখন সড়ক পথে আসছে গবাদিপশু। ন্যায্যমূল্য, ভালো পরিবেশ এবং হাসিলমুক্ত সুবিধার কারণে এটি এখন জেলার অন্যতম বড় পশুর হাটে পরিণত হয়েছে।
দালাল ও খাজনামুক্ত হওয়ায় জেলার চরফ্যাশন, তজুমদ্দিন, লালমোহন, দৌলতখান, চরপাতা এবং ভোলা সদরের ভেলুমিয়া, আলীনগর, চরসামাইয়া, বাঘমারা, রাজাপুর, চর চন্দ্রপ্রসাদসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে গরু, ছাগল, ভেড়া নিয়ে আসেন খামারি ও ব্যবসায়ীরা। ছোট, বড় ও মাঝারি– সব ধরনের পশু পাওয়া যায় এখানে। ঈদ ঘিরে পুরো মাঠে থাকে উপচেপড়া ভিড়। হাট ছাড়িয়ে আশেপাশের এলাকাতেও পশুতে পূর্ণ হয়ে যায়। হাটের আগের দিন বিক্রেতারা মাঠে খুঁটি পুঁতে নিজেদের জায়গা নির্ধারণ করেন।
কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে হাটটি ইজারা দেওয়া হয়নি। ফলে খাজনা আদায়ের সুযোগও নেই। স্ট্রিম ছবি
গত শুক্রবার হাটে ক্রেতা-বিক্রেতাদের ব্যাপক উপস্থিতি ছিল। সদরের রাজাপুর এলাকার খামারি মো. সেলিম বলেন, ‘আমি প্রায় ১২ বছর ধরে এই হাটে গরু বিক্রি করি। গজারিয়া বাজারের পরিবেশ ভালো, ক্রেতাও বেশি আসেন। সবচেয়ে বড় কথা, এখানে খাজনা না থাকায় আমরা স্বস্তিতে ব্যবসা করতে পারি।’
চরফ্যাশন থেকে গরু কিনতে আসা আবদুল কাদের বলেন, ‘অনেক হাটে অতিরিক্ত খাজনা দিতে হয়। এতে বিক্রেতার ওপর চাপ পড়ে, শেষ পর্যন্ত ক্রেতাকেও বেশি দাম দিতে হয়। কিন্তু এখানে খাজনা না থাকায় দাম তুলনামূলক সহনীয় থাকে।’
স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা হাফিজ উদ্দিন বলেন, এই হাট শুধু কেনাবেচার জায়গা নয়। এটি আমাদের এলাকার ইতিহাসের অংশ। ঈদের আগে এখানে উৎসবের আমেজ তৈরি হয়।
হাট পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় বাসিন্দা আবুল কালাম ও হোসেন মিয়া জানান, দীর্ঘ ২৫০ বছর ধরে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে হাটটি ইজারা দেওয়া হয়নি। ফলে খাজনা আদায়ের সুযোগও নেই। এতে বিক্রেতারা যেমন স্বস্তি পান, তেমনি ক্রেতারাও তুলনামূলক কম দামে পশু কিনতে পারেন।
উত্তর দিঘলদী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আবু নোমান মো. সফিউল্লাহ বলেন, ঐতিহ্যবাহী এই হাটকে পরিকল্পিতভাবে সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করা উচিত। তাহলে এটি দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ পশুর হাটে পরিণত হবে।