ঢাকাবাসীকে নির্ধারিত স্থানে পশু কোরবানি দেওয়ায় উদ্বুদ্ধ করতে না পেরে চরম হতাশ নগর কর্তৃপক্ষ। বাড়ির নিচে বা অলিগলিতে পশু জবাইয়ের চিরাচরিত অভ্যাসের কারণে ২০১৫ সাল থেকে শুরু হওয়া দুই সিটি করপোরেশনের এই উদ্যোগটি বছরের পর বছর ধরে সংকুচিত হয়ে আসছে।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, মানুষের আচরণ ও মানসিকতার পরিবর্তন না হলে মেগাসিটি ঢাকাকে কখনো পুরোপুরি পরিচ্ছন্ন ও দুর্গন্ধমুক্ত রাখা সম্ভব হবে না।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) অতিরিক্ত প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মো. আরিফুর রহমান বলেন, ‘নাগরিকদের সচেতন করতে মাইকিং, ব্যানার ও ইমামদের মাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হলেও নির্ধারিত স্থানে মানুষের অংশগ্রহণ খুবই কম। সবাই মনে করেন, নিজের বাড়ির নিচেই কোরবানির প্রসেসিং করতে সুবিধা হয়।’
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. রাসেল রহমান বলেন, ‘জনগণ কেন নির্ধারিত স্থানে আগ্রহ দেখায় না, সেটি তারাই ভালো বলতে পারবে। তবে এ বিষয়ে সিটি করপোরেশন প্রচার কার্যক্রম চালাচ্ছে।’
নগরবাসী কেন নির্ধারিত স্থান এড়িয়ে চলছেন, তা জানা গেল পুরান ঢাকার বাসিন্দা আসিফ হায়দারের কথায়। তিনি বলেন, ‘বাড়ির নিচে কোরবানি করলে পরিবারের সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে অংশ নেওয়া যায়। কিন্তু নির্ধারিত স্থান দূরে হওয়ায় সেখানে গরু নিয়ে যেতে হয়, সিরিয়াল দিয়ে অপেক্ষা করতে হয় এবং পরে মাংস কেটে আবার বাসায় আনতেও বাড়তি খরচ পড়ে।’
তবে তিনি স্বীকার করেন, নির্দিষ্ট স্থানে কোরবানি দিলে নিজের আঙিনা ও চারপাশ পরিষ্কার থাকে।
বশির আহমেদ নামের আরেক বাসিন্দা জানান, যাতায়াত ও আসা-যাওয়ার ঝামেলার কারণেই মূলত মানুষ সেখানে যেতে চান না।
নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আব্দুর রাকিব খান একে মানুষের আচরণগত সমস্যা উল্লেখ করে বলেন, ‘এটি একদিনে পরিবর্তন সম্ভব নয়। নির্ধারিত স্থানে যদি পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও দ্রুত সেবা নিশ্চিত করা যেত, তাহলে মানুষ ধীরে ধীরে সেদিকে আগ্রহী হতো। কিন্তু বাস্তবে দীর্ঘ অপেক্ষা, অব্যবস্থাপনা এবং পরিবহন সংকটের কারণে নাগরিকরা আগ্রহ হারাচ্ছেন।’
তবে জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ রক্ষা ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার ক্ষতি এড়াতে ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট স্থানে কোরবানির কোনো বিকল্প নেই বলেও তিনি সতর্ক করেন।
দুই সিটির বর্জ্য অপসারণ পরিকল্পনা
উদ্যোগটি সফল না হলেও কোরবানির বর্জ্য দ্রুত অপসারণে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে দুই সিটি করপোরেশন। ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রশাসক আব্দুস সালাম জানান, তিন দিনে মোট ৩৩ হাজার ৯৪২ টন বর্জ্য অপসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম দিনে প্রায় ১৫ হাজার ৯৩৫ টন, দ্বিতীয় দিনে ১১ হাজার ৭৭৬ টন এবং তৃতীয় দিনে ৬ হাজার ২৩১ টন বর্জ্য অপসারণ করা হবে।
এই বিশাল কর্মযজ্ঞে প্রায় ১৩ হাজার ৪৫৩ জন জনবল এবং ট্রাক, কম্প্যাক্টর, কন্টেইনার ক্যারিয়ার, পে-লোডার ও ডোজারসহ মোট ২ হাজার ১১৭টি যানবাহন ও যন্ত্রপাতি নিয়োজিত থাকবে। এ ছাড়া নাগরিকদের সচেতন করতে ডিএসসিসির ৭৫টি ওয়ার্ডে ৪৬ টন ব্লিচিং পাউডার, ১ হাজার ৫০ লিটার স্যাভলন এবং ১ লাখ ৪০ হাজার বায়োডিগ্রেডেবল ব্যাগ বিতরণ করা হচ্ছে।
অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটির জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. জোবায়ের হোসেন জানান, কোরবানির একদিন আগেই পশু জবাইয়ের স্থান এবং বর্জ্যের চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য ল্যান্ডফিল প্রস্তুত রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সঠিকভাবে পশু জবাই ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ৫৪টি ওয়ার্ডে ১ হাজার মাংস প্রস্তুতকারীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। মনিটরিং জোরদারে গঠন করা হয়েছে ১০টি জোনে ১০টি মনিটরিং টিম।
ডিএনসিসির অতিরিক্ত প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা আরিফুর রহমান বলেন, ‘বর্জ্য সংগ্রহ ও অপসারণে ৭০০-এর বেশি যানবাহন প্রস্তুত রাখা হয়েছে। নির্ধারিত পয়েন্টের পাশাপাশি অলিগলিতে কোরবানি হওয়া স্থান থেকেও দ্রুত বর্জ্য সংগ্রহ করে নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের।’