Image description

‘আমার ফুয়াগুরে (ছেলেকে) কোনলাখান বাঁচাইতাম ফারলাম না। ইলান (এভাবে) বাচ্চাটা দুনিয়াত থাকি যাইবগি বুঝতামওউ ফারছি না’। হাসপাতালের বারান্দায় দাঁড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে কথাগুলো বলছিলেন সিলেট শহরতলির শাহপরান এলাকার রফিকুল ইসলাম। গতকাল শুক্রবার বিকেলে শহীদ শামসুদ্দিন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে মারা যায় তাঁর ১ বছর ৩ মাস বয়সী ছেলে আরবি আহমদ। 
শিশু আরবির মৃত্যুতে মুষড়ে পড়েন রফিকুল ও তাঁর স্ত্রী। স্বজনরা দুজনকে দ্রুত হাসপাতাল থেকে নিয়ে যান। আরবির স্বজন ছালেহা বেগম বলেন, গত ১৭ মে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। এর পর তার অবস্থার অবনতি হয়। আরবিকে টিকা দেওয়া হয়েছিল কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, দেওয়া হয়নি। তবে হাসপাতালে আনার পর টিকা দেওয়া হয়েছে কিনা তা তিনি বলতে পারবেন না।

গতকাল বিকেল ৪টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় সিলেট বিভাগে হামের উপসর্গ নিয়ে আরবিসহ ৬ শিশু মারা গেছে। মারা যাওয়া অন্যরা হলো হবিগঞ্জের নবীগঞ্জের আব্দুল মালিকের ৫ মাস বয়সী মেয়ে রাইসা, সুনামগঞ্জের ছাতকের ইশাক আলীর ৬ বছর বয়সী ছেলে আলী আফসান, দিরাইর মুসাদ্দিক মিয়ার ১০ মাস বয়সী মেয়ে মুসলিমা, বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার আজিজুল হকের ৪ বছর ২ মাস বয়সী মেয়ে শামিমা আক্তার, সিলেট সদরের বাহরাম আহমেদের ১ বছর ২ মাস বয়সী ছেলে মো. রাশেদ আহমেদ। রাইসা ও আলী আফসান সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, মুসলিমা ও রাশেদ শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে এবং শামীমা সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে মারা গেছে। 

এদিকে শুক্রবার সকাল পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৭৪ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩২ রোগী ভর্তি হয়েছে শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে। বর্তমানে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ২৮৩ জন চিকিৎসাধীন রয়েছে। এর মধ্যে শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ৮০, ওসমানী হাসপাতালে ৫৯, সুনামগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে ৫৫, মৌলভীবাজার জেলা সদর হাসপাতালে ১৪, হবিগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে ১৯ জন চিকিৎসাধীন। অন্যরা বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ।
চিকিৎসকদের অবহেলার অভিযোগ

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে শিশু শামীমা আক্তার। পরিবারের অভিযোগ, হাসপাতালে আইসিইউ সুবিধা না থাকায় এবং চিকিৎসকদের অবহেলার কারণে শামীমার মৃত্যু হয়েছে। বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার মণিপুরীহাটি গ্রামের আজিজুল হক ও নাজমিন বেগমের তৃতীয় সন্তান শামীমা। জন্মের পরে টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়ে শারীরিক সমস্যা দেখা দেয় তার। পরে কয়েক দফায় সিলেটে তার চিকিৎসা করানো হয়। তাকে হামের টিকা দেওয়া হয়নি। কয়েকদিন আগে পেটের পীড়ার কারণে শামীমাকে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে তার শরীরে রেশ দেখা দেয়। চিকিৎসকরা ধারণা করেন শিশুটি হামে আক্রান্ত হয়েছে। পরিবারের অভিযোগ, কয়েকদিন ধরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শামীমার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। উন্নত চিকিৎসার জন্য সিলেটে নেওয়ার পরামর্শ দেননি চিকিৎসকরা।
শিশুটির মা নাজমিন বেগম বলেন, ‘এই হাসপাতালে আইসিইউ নেই। একথা জানালে আমরা শামীমাকে সিলেটে নিয়ে যেতাম। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকরা সিলেটে নিতে বলেন। কিছুক্ষণ পরই সে মারা যায়।’ শামীমার বাবা মো. আজিজুল হক বলেন, ‘এটি জেলার সবচেয়ে বড় হাসপাতাল হলেও আইসিইউ নেই। আমি চাই দ্রুত আইসিইউ সুবিধা চালু হোক, যাতে আর কোনো শিশুর এমন পরিণতি না হয়।’
এ বিষয়ে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘রোগীর অবস্থা খারাপ হলে আমরা সিলেটে রেফার করি। হাসপাতালে আইসিইউ চালু করা গেলে রোগীদের আরও ভালো সেবা দেওয়া সম্ভব হবে।’