জুলাই-আগস্ট ২০২৪ ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম নাটকীয় মুহূর্ত। পনেরো বছরের আওয়ামী লীগ শাসনের অবসান, শেখ হাসিনার পতন, একটি জনঅভ্যুত্থানের বিজয়। কিন্তু যে মানুষগুলো একসময় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে এই অভ্যুত্থান ঘটিয়েছিলেন, তারা এখন পরস্পরের বিরুদ্ধে শব্দ-বাক্য খরচ করছে!
মাহফুজ আলম—অভ্যুত্থানের "মাষ্টারমাইন্ড" হিসেবে পরিচিত, অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক তথ্য উপদেষ্টা — লিখলেন একটি দীর্ঘ ফেসবুক পোস্ট। তাঁর মূল দাবি: আওয়ামী লীগ "ব্যাক" করেছে, এবং এর দায় বহুলাংশে অভ্যুত্থান-পরবর্তী শাসনের ব্যর্থতার।
দিলশানা পারুল — সাবেক বামপন্থী, বর্তমানে এনসিপির যুগ্ম মূখ্য সমন্বয়ক, ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থী — পাল্টা লিখলেন: মাহফুজ নিজেই "আরবান সেকুলার সুশীলের রাজনীতিতে সাবস্ক্রাইব" করে ফেলেছেন, এবং এটাই আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তনের আসল পথ।
দুটি লেখা। দুটি রাজনৈতিক অবস্থান। একটি অভিন্ন ব্যর্থতার দুটি ভাষ্য। দুইজনের লেখা নিয়েই এই পর্যালোচনা, দেখাতে চেয়েছি এই অহেতুক বিতর্ক আসলে কোন মৌলিক প্রশ্নটিকে এড়িয়ে যাচ্ছে।
১.১ মাহফুজের থিসিস: বিপ্লব নিজেই নিজের শত্রু:
মাহফুজের যুক্তির কাঠামোটি প্রায় কাব্যিক — বারবার পুনরাবৃত্ত "লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন..." — একটি রেটরিকাল অনুক্রম যা প্রতিটি ব্যর্থতার মুহূর্তকে আওয়ামী লীগের পুনরুজ্জীবনের সাথে সংযুক্ত করে। তাঁর অভিযোগের তালিকাটি সংক্ষেপে:
ক. বাহ্যিক প্রেক্ষাপটগত ব্যর্থতা: '২৪-কে '৭১-এর বিরুদ্ধে দাঁড় করানো; উগ্রবাদীদের মাজার ও মসজিদে আধিপত্য; হিন্দু নিপীড়ন নিয়ে নীরবতা; ডানপন্থার উত্থানে সেকুলার জনগোষ্ঠীর আতঙ্ক।
খ. শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতা: আইনের বদলে মবের শাসন; রাজনৈতিক সরকার আমলাতান্ত্রিক হয়ে পড়া; কিচেন ক্যাবিনেটে স্বার্থগোষ্ঠীর কর্তৃত্ব; জুলাই ঘোষণাপত্রের প্রক্রিয়া নষ্ট হওয়া।
গ. আন্দোলনের অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা: ছাত্রদের বিপ্লবী সংগঠনে রূপান্তরিত না হওয়া; লুম্পেন মবে পরিণত হওয়া; মিডিয়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে হামলা; নতুন মিডিয়া অনুমোদনে বাধা; সংস্কারের বদলে নির্বাচনি বাটোয়ারা।
মাহফুজের মূল দাবি: যারা "বিপ্লব" করেছিল, তারাই বিপ্লবের মূল্যবোধকে বিসর্জন দিয়েছে — এবং এই শূন্যস্থানেই আওয়ামী লীগ ফিরে এসেছে।
১.২ পারুলের পাল্টা থিসিস: মাহফুজ নিজেই আওয়ামীকরণের হাতিয়ার:
পারুলের যুক্তিটি কম কাঠামোগত, তবে তীক্ষ্ণ। তিনি মূলত বলছেন:
ক. ক্ষমতার দ্বন্দ্ব: "মাস্টারমাইন্ড" পরিচয় নিয়ে অভ্যুত্থানের নেতাদের মধ্যে কোন্দলই আওয়ামী লীগের রাস্তা খুলে দিয়েছে — মাহফুজের পোস্ট নিজেই সেই কোন্দলের একটি পর্ব।
খ. আদর্শিক আত্মসমর্পণ: মাহফুজ আওয়ামী লীগের নিজস্ব বাইনারিতে — "মুক্তিযুদ্ধ বনাম রাজাকার" — পুনরায় সাবস্ক্রাইব করেছেন। এই ভাষাটি ব্যবহার করেই আওয়ামী লীগ ১৫ বছর ক্ষমতায় ছিল।
গ. শ্রেণিগত বিচ্ছিন্নতা: মাহফুজ "আরবান সেকুলার সুশীলের রাজনীতি"তে প্রত্যাবর্তন করেছেন, নিজের উৎস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে। এই শ্রেণিগত অবস্থানই মুজিববাদী সংস্কৃতির ভিত্তি।
ঘ. বৈধতার প্রশ্ন: মাহফুজের পোস্টের প্রধান ভাইরালকারীরা "মুজিববাদী বুদ্ধিজীবী ও মিডিয়া" — অর্থাৎ আওয়ামী ঘনিষ্ঠ শ্রেণি। তাদের উৎসাহ প্রমাণ করে মাহফুজ কার রাজনীতি করছেন।
২.১. মাহফুজের যেসব পয়েন্ট অখণ্ডনীয়
হিন্দু নিপীড়নে নীরবতার প্রশ্ন: ৫ আগস্টের পর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কেউ কেউ আক্রান্ত হয়েছিলেন। সেসব হামলাকে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের তরফে 'সাম্প্রদায়িক' হামলা হিসেবে দাবী করা হলেও, ইন্টেরিম থেকে সেগুলোকে রাজনৈতিক নিপীড়ন আকারে দেখা হয়। কারন যাই হোক না কেন, স্পর্শকাতর এই ইস্যুতে অভ্যুত্থানের নেতৃস্থানীয় অংশের দ্বিধান্বিত মনোভাব সেকুলার-প্রগতিশীল জনগোষ্ঠীকে যে বিচ্ছিন্ন করেছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। যে রাজনীতি সংখ্যালঘুর নিরাপত্তার প্রশ্নে নীরব থাকতে পারে, সে রাজনীতি নৈতিক কর্তৃত্ব হারায়।
আমলাতন্ত্রের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর: বিপ্লব-পরবর্তী যেকোনো রাজনৈতিক পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় বিপদ হলো আমলাতান্ত্রিক জড়তায় আটকে যাওয়া। অন্তর্বর্তী সরকারের রাজনৈতিক চরিত্র থেকে আমলাতান্ত্রিক চরিত্রে রূপান্তর — এবং সেই আমলাতন্ত্রে বিভিন্ন পুরাতন স্বার্থগোষ্ঠীর অনুপ্রবেশ — এই পর্যবেক্ষণটি মাহফুজের অন্যতম শক্তিশালী যুক্তি।
ছাত্র আন্দোলনের লুম্পেনায়ন: বিপ্লব টিকে থাকে কেবল সংগঠনের শক্তিতে। ছাত্রশক্তি যখন বিপ্লবী সংগঠনের পরিবর্তে দলীয় “মবে” পরিণত হয়, তখন বিপ্লবের আদর্শিক ভিত্তি ভেঙে পড়ে। এই পর্যবেক্ষণটি ইতিহাস দ্বারা বারবার প্রমাণিত।
২.২. পারুলের যেসব পয়েন্ট উড়িয়ে দেওয়া যায় না
• "কারা শেয়ার করছে" প্রশ্নের বৈধতা: পারুলের সবচেয়ে ধারালো পর্যবেক্ষণ হলো: যদি মাহফুজের পোস্টটি মুজিববাদী মিডিয়া ও বুদ্ধিজীবীরা উৎসাহের সাথে ছড়িয়ে দেন, তাহলে সেই পোস্টের ফ্রেমিং ও ভাষা নিয়ে প্রশ্ন তোলা স্বাভাবিক। কোনো বিশ্লেষণ কার কাজে আসছে, সেটি বিশ্লেষণের নিজের সীমাবদ্ধতার একটি সূচক হতে পারে।
• "মুক্তিযুদ্ধ বনাম রাজাকার" বাইনারির সমস্যা: পারুল ঠিকই চিহ্নিত করেছেন যে এই বাইনারিটি আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক মূলধন। মাহফুজ যখন "স্বাধীনতার বিরুদ্ধের শক্তি" ব্যবহার করেন, তখন তিনি আওয়ামী লীগের পরিচিত ফ্রেমে কথা বলছেন — এবং এতে করে যারা '৭১ নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করেন না কিন্তু আওয়ামী লীগেরও সমালোচক, তাদের "শত্রুর দলে" ঢেলে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
• বিপ্লবের অলংকার বনাম বাস্তব কর্মসূচির প্রশ্ন: পারুলের অভিযোগ যে "বিপ্লবের ডিলিউশনাল রেটরিক" বাস্তব সংস্কারকর্মের বিকল্প হয়ে উঠেছিল — এটি মাহফুজের নিজের সমালোচনার সাথেও মেলে। কিন্তু পারুল এই সমালোচনাটি মাহফুজের বিরুদ্ধে ঘুরিয়ে দিচ্ছেন, বলছেন মাহফুজ নিজেও সেই অলংকারের উৎপাদক।
৩.১. মাহফুজের যুক্তির গলদ
• আত্মদায়মুক্তির সমস্যা: মাহফুজ যে ব্যর্থতার তালিকা তৈরি করেছেন, তাতে নিজের ভূমিকা অনুপস্থিত। "কিচেন ক্যাবিনেট" যখন জনবিচ্ছিন্ন সিদ্ধান্ত নিচ্ছিল, তথ্য উপদেষ্টা হিসেবে তিনি কোথায় ছিলেন? "মিডিয়া অনুমোদনে বাধা" যখন দেওয়া হচ্ছিল, তখন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন তিনিই। ব্যর্থতার তালিকা তৈরি করতে গিয়ে নিজেকে সেই তালিকার বাইরে রাখার প্রবণতা এই রচনার বুদ্ধিবৃত্তিক সততাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
• "সেকুলার মূল্যবোধ" কার জন্য? মাহফুজ লেখেন, "সেকুলার মূল্যবোধে বিশ্বাসী মানুষজন ভয় পেয়েছিল।" কিন্তু বাংলাদেশের ৯০ ভাগ মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিরাট অংশ — যারা অভ্যুত্থানে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিল — কি "সেকুলার মূল্যবোধের" সংজ্ঞায় পড়েন? যদি না পড়েন, তাহলে কি তাদের বিপ্লবের অংশীদার হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে? এই অনুচ্চারিত প্রশ্নটি মাহফুজের বিশ্লেষণকে অসম্পূর্ণ করে রাখে।
• "মজলুমগণ" ব্যঙ্গের নৈতিকতা: মাহফুজ বারবার "মজলুমগণ" শব্দটি ব্যঙ্গার্থে ব্যবহার করেছেন তাদের জন্য যারা আওয়ামী লীগের আমলে নিপীড়নের শিকার হয়েছেন কিন্তু পরবর্তীতে "মবতন্ত্রে" অংশ নিয়েছেন বলে তিনি মনে করেন। কিন্তু যারা সত্যিই ১৫ বছর নিপীড়িত হয়েছেন, তাদের ক্ষোভের বৈধতা ও ক্ষোভের প্রকাশের অনৈতিকতা — এই দুটি বিষয়কে আলাদা করার পরিবর্তে এক কাতারে ফেলে দেওয়া একটি বিপজ্জনক সরলীকরণ।
• "ইনকিলাবি কালচার" ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যের প্রশ্ন: মাহফুজ যখন "কাওয়ালী/ইনকিলাবি কালচার"-কে "রিগ্রেসিভ" বলেন, তখন একটি নির্দিষ্ট শ্রেণিগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের রাজনীতি স্পষ্ট হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের গ্রামীণ ও কর্মজীবী জনগোষ্ঠীর বড় অংশ যে সাংস্কৃতিক জগতে বাস করেন, তাকে "রিগ্রেসিভ" বলে চিহ্নিত করার ক্ষমতাটি আসে কোথা থেকে? এই ভাষাটি কি আসলে ঢাকার মধ্যবিত্তের সাংস্কৃতিক কর্তৃত্বেরই প্রকাশ?
৩.২. পারুলের যুক্তির গলদ
• Genetic Fallacy — একটি গুরুতর যুক্তি-বিভ্রাট: পারুলের সবচেয়ে মৌলিক সমস্যা হলো তিনি "কারা শেয়ার করছে" দিয়ে "কী বলা হচ্ছে" খণ্ডন করার চেষ্টা করছেন। দার্শনিক পরিভাষায় এটি Genetic Fallacy — একটি বক্তব্যের উৎস বা সমর্থকদের পরিচয় দিয়ে সেই বক্তব্যের সত্যতা নির্ধারণ। মাহফুজের পর্যবেক্ষণগুলোর কোনটি কি ভুল? পারুল সেটা খণ্ডন করেননি।
• "তৌহিদী জনতা" ও সহিংসতার বাস্তবতা: পারুল অভিযোগ করেছেন যে "ছাত্র জনতা" ও "তৌহিদী জনতা"র মধ্যে পার্থক্য তৈরি করে গণভিত্তি সংকুচিত করা হয়েছে। কিন্তু এই পার্থক্যটি কি সত্যিই কৃত্রিম? মাজারে হামলা, সংখ্যালঘু পরিবারে অগ্নিসংযোগ, মসজিদ থেকে ভিন্নমতাবলম্বীদের বিতাড়ন — এই ঘটনাগুলি কোন "জনতা"র নামে হয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে পার্থক্যকে "কৃত্রিম" বলা, বাস্তবিক সহিংসতাকে আড়াল করার নামান্তর।
• "আরবান সেকুলার সুশীল" — একটি অস্ত্র, একটি বিভাজন: পারুল যে পরিভাষাটি বারবার ব্যবহার করেছেন তা রাজনৈতিকভাবে কার্যকর কিন্তু বিশ্লেষণাত্মকভাবে দুর্বল। "সেকুলার" বা "নগরকেন্দ্রিক" চেতনাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে "মুজিববাদী" বা "এলিটপন্থী" বলে দাগিয়ে দেওয়া মানে বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধধারী মানুষকে — যারা সরকারি কর্মচারী থেকে শুরু করে গ্রামীণ শিক্ষক পর্যন্ত বিস্তৃত—"শত্রুর দলে" ঠেলে দেওয়া।
• নিজের অরিজিন সম্পর্কে নীরবতা: পারুল মাহফুজকে "নিজের অরিজিন নিয়ে হীনমন্যতায় ভোগার" অভিযোগ করেছেন। কিন্তু পারুল নিজে একজন সাবেক বামপন্থী — যার "অরিজিন" ছিল শ্রমিকশ্রেণির মুক্তির আন্দোলনে। সেই অরিজিন থেকে জামায়াতের কাছাকাছি আসার যাত্রাটির কোনো আত্মব্যাখ্যা তাঁর লেখায় নেই। নিজের রাজনৈতিক রূপান্তর সম্পর্কে নীরব থেকে অন্যের আদর্শিক পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন তোলা সমান্তরাল সততার দাবি রাখে।
৪. যে প্রশ্নটি দুজনেই এড়িয়ে গেছেন
এই বিতর্কের মধ্যে একটি মৌলিক প্রশ্ন অনুচ্চারিত থেকে গেছে: বাংলাদেশে একটি কার্যকর প্রগতিশীল রাজনীতির ভিত্তি কী হবে? মাহফুজ বলছেন, বিপ্লবের মূল্যবোধ—ধর্মনিরপেক্ষতা, আইনের শাসন, সংখ্যালঘুর সুরক্ষা — থেকে বিচ্যুত হওয়াই পরাজয়ের কারণ। কিন্তু বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মপ্রাণ জনগোষ্ঠী এই মূল্যবোধকে নিজেদের জীবনের সাথে সংযুক্ত করবে কীভাবে, সে প্রশ্নের উত্তর তাঁর কাছে নেই।পারুল বলছেন, "সাধারণ মানুষের" রাজনীতি করতে হবে, "আরবান সুশীলের" নয়। কিন্তু "সাধারণ মানুষের" নামে জামায়াতের সাথে জোটবদ্ধ হওয়া কি সেই একই মানুষের মুক্তির পথ? যে সংখ্যালঘু হিন্দু পরিবারের ঘর জ্বলেছে, সে কি "সাধারণ মানুষ" নয়? যে নারী ইসলামপন্থীদের ভয়ে থাকেন, তিনি কি গণনার বাইরে?
এই দুটি অসম্পূর্ণ উত্তরের মাঝখানে যে শূন্যতা, সেটিই আসলে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুনরুজ্জীবনের সত্যিকারের মাটি। মানুষ ভয় পেলে পরিচিত আশ্রয়ে ফেরে—এমনকি সেই আশ্রয় বিষাক্ত হলেও।
৫. বিতর্কের কাঠামোগত সমস্যা: ফেসবুক রাজনীতির সীমাবদ্ধতা
উভয় লেখাই ফেসবুকে প্রকাশিত। ফেসবুকের রাজনীতি মূলত বিদ্যমান মতামতকে শক্তিশালী করে, পরিবর্তন করে না। মাহফুজের পোস্ট তাঁর সমর্থকদের একমত করেছে, পারুলের প্রতিক্রিয়া তাঁর সমর্থকদের। এই ধ্বনি-প্রতিধ্বনির মধ্যে যে রাজনীতি হয়, সে রাজনীতি জনগণের কাছে পৌঁছানোর পরিবর্তে নিজেদের বৃত্তেই ঘোরে। এই পুরো বিতর্কটি একটি মৌলিক কাঠামোগত সমস্যায় আক্রান্ত। মাহফুজ ও পারুল উভয়েই বলছেন "এই ভুলটি হয়েছে, ওই ভুলটি হয়েছে।" কিন্তু কেউ বলছেন না "এই ভুলটির জন্য আমি দায়ী।" রাজনৈতিক জবাবদিহিতার অনুপস্থিতি এই বিতর্ককে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যায়ামে পরিণত করেছে, রাজনৈতিক পথনির্দেশে নয়।
মাহফুজ শেষ পর্যন্ত বলছেন: "আমরা কোন মূল্যবোধের পক্ষে?" পারুল বলছেন: "আমরা কোন জনগোষ্ঠীর পক্ষে?" দুটোই জরুরি প্রশ্ন। কিন্তু "আমরা কী করব?" — এই সুনির্দিষ্ট কর্মসূচির প্রশ্নটি দুজনের কাছেই অনুপস্থিত। পরিচয় ও মূল্যবোধের রাজনীতি কংক্রিট কর্মসূচিতে রূপান্তরিত না হলে শেষ পর্যন্ত কেবল অলংকারই থাকে।
৬. জুলাই অভ্যুত্থানের অসমাপ্ত প্রকল্প
মাহফুজ আলম ও দিলশানা পারুল — দুজনেই একই নদীর দুই কূলে দাঁড়িয়ে আছেন। নদীটির নাম: জুলাই অভ্যুত্থানের অসমাপ্ত প্রকল্প। মাহফুজের কূলে দাঁড়িয়ে দেখা যাচ্ছে: উগ্রবাদের উত্থান, সংখ্যালঘু নিপীড়ন, আইনের শাসনের অবনতি, বিপ্লবের মূল্যবোধের বিসর্জন। পারুলের কূলে দাঁড়িয়ে দেখা যাচ্ছে: সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষকে "মব" বলে দাগিয়ে দেওয়া, "আরবান সুশীল" ভাষায় জনবিচ্ছিন্ন রাজনীতি, ক্ষমতার কোন্দলে বিপ্লবকে ব্যক্তিস্বার্থের হাতিয়ার করা। উভয় দৃশ্যই বাস্তব। উভয় সমস্যাই গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু নদীর ওপারে — যেখানে বাংলাদেশের কোটি মানুষ বাস করেন, যারা এই বিতর্কের কোনো কূলেই নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পাচ্ছেন না — সেখানে যে প্রশ্নটি জ্বলছে তা হলো: অভ্যুত্থানের পর যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, সে স্বপ্নের উত্তরাধিকারীরা কি কেবল পরস্পরকে অভিযুক্ত করবেন? নাকি এমন একটি রাজনীতি নির্মাণ করবেন যেখানে ধর্মপ্রাণ কৃষক ও সেকুলার বুদ্ধিজীবী, হিন্দু সংখ্যালঘু ও মুসলিম সংখ্যাগুরু, নারীবাদী ও ধর্মীয় মানুষ—সকলে মর্যাদা নিয়ে বাঁচতে পারবেন?
এই প্রশ্নের উত্তরটি মাহফুজ বা পারুলের লেখায় অনুপস্থিত। কারণ সেই উত্তর দিতে গেলে নিজেদের অবস্থানের অসম্পূর্ণতা স্বীকার করতে হয়। এবং সেই স্বীকারোক্তির সাহসটুকুই হয়তো একটি প্রকৃত নতুন রাজনীতির প্রথম শর্ত।
