ঈদুল আজহা সামনে এলেই রাজধানীতে কোরবানির পশুর হাটের ইজারা নিয়ে শুরু হয় দৌড়ঝাঁপ। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। রাজধানীর অস্থায়ী পশুর হাটের ইজারা কার্যক্রমে প্রাধান্য দেখা যাচ্ছে বিএনপি-সংশ্লিষ্টদের। জামায়াতের নেতাকর্মীরাও চেষ্টা চালালেও এখন পর্যন্ত তেমন সফলতা পায়নি। এ ছাড়া ৫ আগস্টের পর গঠিত রাজনৈতিক দল এনসিপির নেতারাও কয়েকটি হাটের ইজারা পাওয়ার চেষ্টা করছেন।
আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকায় মোট ২৬টি পশুর হাট বসবে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত ১৬টি হাটের ইজারা সম্পন্ন হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ইজারা পাওয়া হাটগুলোর বেশির ভাগই বিএনপি-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দখলে গেছে। যেসব হাটের ইজারা এখনো চূড়ান্ত হয়নি, সেগুলো নিয়েও দুই দলের নেতাকর্মীদের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
ইজারার বিষয়ে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীরা বলছেন, প্রায় দুই দশক ধরে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সিন্ডিকেটের কারণে প্রতিযোগিতা ছাড়াই তুলনামূলক কম মূল্যে হাটের ইজারা হতো। তবে এবার প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে দরপত্র জমা পড়েছে।
ডিএসসিসিতে প্রতিযোগিতা
ডিএসসিসির হাট ইজারা ঘিরে নগরভবনে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। ইজারাকে কেন্দ্র করে দুইপক্ষের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটেছে।
গরু বাঁধার খুটি পোঁতা শেষের পথে। ছবি: নাসিরুল ইসলাম
বিএনপির নেতাকর্মীরা বলছেন, হাট ইজারার ক্ষেত্রে পেশিশক্তি দেখানোর কিছু নেই। নিয়ম অনুযায়ী সর্বোচ্চ দরদাতাই ইজারা পাবেন। অন্যদিকে জামায়াতের নেতাকর্মীরা বলছেন, ব্যবসা হালাল জিনিস এবং দল থেকেও ইজারা নেওয়ার বিষয়ে কোনও নিষেধাজ্ঞা নেই।
ডিএসসিসি সূত্র জানায়, পোস্তগোলা শ্মশানঘাট সংলগ্ন নদীর পাড়ের খালি জায়গার হাটটির ইজারা মূল্য ছিল ২ কোটি ৭১ লাখ টাকা। স্থানীয় জামায়াত নেতাদের সমর্থনে মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন ৩ কোটি ৩১ লাখ টাকা দর দেন। পরে বিএনপি নেতা কাজী মাহবুব মওলা হিমেল ৪ কোটি ১ লাখ টাকা দর দিয়ে হাটটির ইজারা পান।
আমুলিয়া মডেল টাউনের খালি জায়গার হাটটির সরকারি মূল্য ছিল ৫৩ লাখ টাকা। গত বছর ডেমরা থানা বিএনপির সাবেক সভাপতি জয়নাল আবেদিন রতন ৫৫ লাখ টাকায় হাটটি নিয়েছিলেন। এবার তিনি ২ কোটি ১৫ লাখ টাকায় ইজারা পেয়েছেন। এই হাটেও জামায়াতের নেতারা দরপত্রে অংশ নেন।
দনিয়া কলেজের পূর্ব পাশে এবং সনটেক মহিলা মাদ্রাসার পূর্ব-পশ্চিম পাশের খালি জায়গার হাটটির জন্য স্থানীয় জামায়াত নেতা শামীম খানের প্রতিষ্ঠান কে বি ট্রেড সর্বোচ্চ ৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকা দর দেয়। গত বছর স্থানীয় বিএনপি নেতা তারিকুল ইসলাম তারেক হাটটি ইজারা নিয়েছিলেন। এবার তিনি ১ কোটি ৫৫ লাখ টাকার পে-অর্ডার জমা দিলেও কোনও দর উল্লেখ করেননি।
গোলাপবাগ মাঠ সংলগ্ন খালি জায়গার হাটটির সরকারি মূল্য ছিল ৫৩ লাখ ৯৩ হাজার টাকা। ছয়টি দরপত্রের মধ্যে স্থানীয় বিএনপি নেতা আহসানউল্লাহ ২ কোটি ৫ লাখ টাকা দর দিয়ে হাটটির ইজারা পান।
উত্তর শাহজাহানপুর মৈত্রী সংঘ ক্লাব সংলগ্ন খালি জায়গার হাটটির সরকারি মূল্য ছিল ১ কোটি ৭৪ লাখ ৭২ হাজার ৩৩৪ টাকা। সাবেক কাউন্সিলর ও বিএনপি নেতা আনিসুর রহমান টিপু ৩ কোটি ১২ লাখ ৩৬ হাজার টাকায় হাটটির ইজারা পেয়েছেন।
ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাবের দক্ষিণ পাশের খালি জায়গার হাটটির ইজারা পেয়েছেন স্থানীয় বিএনপি নেতা মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেন। এ জন্য তাকে ৩ কোটি ১ লাখ টাকা দিতে হয়েছে।
এরইমধ্যে কয়েকটি গরু নিয়েও এসেছেন ব্যবসায়ীরা। ছবি: নাসিরুল ইসলাম
সাদেক হোসেন খোকা মাঠের দক্ষিণ পাশের খালি জায়গার সরকারি মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ২ কোটি ৮০ লাখ টাকা। ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য হামিদুর রহমান হামিদের ছত্রছায়ায় বিএনপি নেতা তুষার আহমেদ ইমরান ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা দর দিয়েছেন এই হাটের জন্য।
ডিএনসিসিতে বিএনপির একচ্ছত্র প্রাধান্য
ডিএনসিসির ১৫টি হাটের মধ্যে এখন পর্যন্ত আটটির ইজারা সম্পন্ন হয়েছে। এসব হাটের সবগুলোর ইজারা পেয়েছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা।
উত্তরা দিয়াবাড়ির ১৬ ও ১৮ নম্বর সেক্টর সংলগ্ন বউবাজার এলাকার খালি জায়গার হাটটির সর্বোচ্চ দর উঠেছে ১৪ কোটি ১৫ লাখ টাকা। হাটটির ইজারা পেয়েছেন ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক এবং এস এফ করপোরেশনের মালিক শেখ ফরিদ হোসেন।
তেজগাঁওয়ে ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট সংলগ্ন খালি জায়গার হাটটির সরকারি দর ছিল ১ কোটি ১৩ লাখ ৫ হাজার ৯০০ টাকা। শিকদার এন্টারপ্রাইজের মালিক আমিনুল ইসলাম ৩ কোটি ৮৭ লাখ টাকা দর দিয়েছেন। মিরপুর ৬ নম্বর সেকশনের ইস্টার্ন হাউজিংয়ের খালি জায়গার হাটটির জন্য ইসলাম এন্টারপ্রাইজের মালিক সিরাজুল ইসলাম সর্বোচ্চ ১ কোটি ৭৯ লাখ টাকা দর দিয়েছেন। দুজনই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত।
মিরপুরের কালশী বালুর মাঠের ১৬ বিঘা খালি জায়গার হাটটির সরকারি দর ছিল ৩০ লাখ টাকা। স্থানীয় বিএনপি নেতা রেদওয়ান রহমান ৩০ লাখ ১১ হাজার টাকা দর দিয়ে হাটটির ইজারা পেয়েছেন।
কাঁচকুড়া বাজার সংলগ্ন রহমাননগর আবাসিক এলাকার খালি জায়গার হাটটির সরকারি মূল্য ছিল ১৫ লাখ ৫ হাজার টাকা। বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলাম সর্বোচ্চ ২৭ লাখ টাকা দর দিয়েছেন।
ডিএনসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মোহাম্মদ শওকত ওসমান বলেন, ‘কে কোন দলের, সেটা বিবেচনা করে হাটের ইজারা দেওয়া হচ্ছে না। দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি পে-অর্ডারসহ যাবতীয় নথিপত্র যাচাই বাছাই করে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। কোনও হাটের দরপত্র নিয়ে অংশগ্রহণকারীদের অভিযোগ থাকলে লিখিতভাবে দিতে হবে। যেসব হাটের ইজারা এখনও হয়নি, সেগুলোর জন্য পুনরায় দরপত্র আহ্বান করা হবে।’
১৬ হাট থেকে আয় প্রায় ৪৮ কোটি টাকা
চলতি বছর ডিএসসিসিতে ১১টি এবং ডিএনসিসিতে ১৫টি পশুর হাট বসবে। দুই সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ১৬টি হাটের ইজারা সম্পন্ন হয়েছে। এসব হাট থেকে মোট আয় হয়েছে ৪৭ কোটি ৯১ লাখ টাকা।
এর মধ্যে ডিএনসিসির আটটি হাট থেকে আয় হয়েছে ২৪ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। আর ডিএসসিসির আটটি হাট থেকে আয় হয়েছে ২৩ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। বাকি হাটগুলোর ইজারা কার্যক্রম এখনও চলমান।