Image description

ফেনী শহরের ব্যস্ত একাডেমি সড়ক। সময় তখন বেলা প্রায় ১১টা। ২০১৪ সালের ২০ নভেম্বর, মঙ্গলবার। ডায়াবেটিক হাসপাতাল থেকে নিজ এলাকায় ফিরছিলেন ফুলগাজী উপজেলা পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা একরামুল হক। সঙ্গে ছিলেন কয়েকজন সহযোগী। সাদা প্রাইভেট কারটি যখন বিলাসী সিনেমা হলের সামনে পৌঁছায়, ঠিক তখনই শুরু হয় এক ভয়াবহ হামলা—যা পরবর্তী সময়ে দেশের অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডে পরিণত হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা ও তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, প্রথমে একটি অটোরিকশা দিয়ে একরামের গাড়ির পথ আটকে দেওয়া হয়। মুহূর্তেই আশপাশ কেঁপে ওঠে ককটেল বিস্ফোরণে। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়তেই আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে সশস্ত্র হামলাকারীরা। তারা গাড়িটিকে ঘিরে ফেলে।

প্রাণ বাঁচাতে গাড়ি থেকে বেরিয়ে আসেন চালকসহ সঙ্গে থাকা চারজন। হামলাকারীরা তাঁদের ওপর ধারালো অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিন্তু গাড়ির ভেতরে আটকে পড়েন একরামুল হক। এরপর খুব কাছ থেকে তাঁকে লক্ষ্য করে একের পর এক গুলি ছোড়া হয়। তদন্তে উঠে আসে, প্রথম গুলিটি করেছিলেন আবিদুল ইসলাম আবিদ নামের এক ব্যক্তি, যিনি তৎকালীন সাংসদ নিজাম উদ্দিন হাজারীর ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ও অনুসারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

গুলিতে ঝাঁঝরা হওয়ার পরও থামেনি হামলাকারীরা। গাড়ির দরজা বন্ধ রেখেই পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। আগুনে পুড়ে যায় গাড়িসহ একরামের দেহ। দিনের আলোয় শহরের কেন্দ্রস্থলে ঘটে যাওয়া এই হত্যাকাণ্ড মুহূর্তেই দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন তোলে।

হত্যার পরপরই একরামের পরিবার অভিযোগ তোলে, উপজেলা নির্বাচনে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী মিনার এই হত্যার জন্য তিন কোটি টাকা দিয়েছিলেন। যদিও অভিযুক্ত পক্ষ শুরু থেকেই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

তদন্তে র‌্যাব ও পুলিশ যেসব ব্যক্তির নাম সামনে আনে, তাঁদের বড় অংশ তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় প্রভাবশালী বলয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। বিশেষ করে সাবেক সংসদ সদস্য নিজাম হাজারীর অনুসারীদের নাম তদন্তে উঠে আসায় রাজনৈতিক অঙ্গনেও ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।

ঘটনার পর নিহতের বড় ভাই জসিম উদ্দিন বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন। তদন্ত শেষে ৫৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ।

নিম্ন আদালত মামলার রায়ে ৩৯ আসামির মৃত্যুদণ্ড দেন। আদালতের পর্যবেক্ষণে হত্যাকাণ্ডটিকে “পরিকল্পিত ও নৃশংস” বলে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু সেই রায়ের পর কেটে গেছে দীর্ঘ এক যুগ। এখনো উচ্চ আদালতে ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানি শুরুই হয়নি।

২০২৪ সালে বিচারপতি মো. হাবিবুল গনি ও আহমেদ সোহেলের বেঞ্চে মামলাটি শুনানির জন্য তালিকাভুক্ত হয়েছিল। পরে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও বেঞ্চ পুনর্গঠনের কারণে তা আর এগোয়নি।

২০২৫ সালেও নতুন বেঞ্চ গঠন করা হলেও শুনানি শুরু হয়নি। আইনজীবীরা বলছেন, নতুন বেঞ্চ গঠন না হওয়ায় মামলাটি কার্যত স্থবির হয়ে আছে।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৬ আসামি এখনো গ্রেপ্তারের বাইরে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সূত্র বলছে, তাঁদের কয়েকজন বিদেশে পালিয়ে গেছেন। এদের মধ্যে রয়েছেন আবিদুল ইসলাম আবিদ, জাহিদ হোসেন, আরমান হোসেন, নাফিজ উদ্দিনসহ আরও অনেকে।

পুলিশের ভাষ্য, আসামিদের ধরতে অভিযান অব্যাহত আছে। তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ায় তাঁদের অবস্থান শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

মামলার রায়ে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া বেশ কয়েকজন এখন বিভিন্ন কারাগারের কনডেম সেলে আছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির আদেল, কাউন্সিলর আবদুল্লাহিল মাহমুদ শিবলু, সাজ্জাদুল ইসলাম সিফাতসহ আরও অনেকে।

ফেনী জেলা কারাগার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে কয়েকজন ফেনী কারাগারে এবং বাকিরা দেশের বিভিন্ন কারাগারে বন্দী আছেন।

এক যুগ পার হলেও এখনো প্রকাশ্যে কথা বলতে ভয় পান একরামের পরিবারের সদস্যরা। পরিবারের একটি সূত্র জানায়, হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই একরামের স্ত্রী ও তিন সন্তান ঢাকায় অবস্থান করছেন। নিরাপত্তা শঙ্কা এখনো তাঁদের তাড়া করে বেড়ায়।

নিহতের বড় ভাই মোজাম্মেল হক বলেন, ‘ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করতে হবে। বিচার কার্যকর না হলে ন্যায়বিচার থেমে যাবে। একরামের সন্তানরা যেন তাদের বাবার হত্যাকারীদের শাস্তি দেখতে পারে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।’