ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটের বনপাড়া আদর্শ স্কুল অ্যান্ড কলেজকে ঘিরে বেরিয়ে এসেছে ভয়াবহ নিয়োগ জালিয়াতি, ভুয়া সনদ ও নজিরবিহীন স্বজনপ্রীতির এক চাঞ্চল্যকর চিত্র। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) তদন্তে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটির সাবেক অধ্যক্ষ মো. ইমদাদুল হক নিজেই নিয়োগ বোর্ডে থেকে তার স্ত্রী, ছেলে ও মেয়েকে চাকরি দিয়েছেন। এমনকি একই পদে মায়ের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হিসেবে পরীক্ষা দিয়েছেন ছেলে!
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, ‘ব্যাকডেট’ বা পেছনের তারিখ দেখিয়ে নিয়োগপত্র তৈরি, ভুয়া শিক্ষাগত সনদ ব্যবহার এবং বিধিবহির্ভূতভাবে এমপিওভুক্তির মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে সরকারি কোষাগার থেকে ৩ কোটি ৯৫ লাখ ৪৭ হাজার ৯১৭ টাকা বেতন-ভাতা হিসেবে উত্তোলন করা হয়েছে। এ ঘটনায় অভিযুক্তদের বেতন-ভাতা স্থায়ীভাবে বন্ধ করার পাশাপাশি আত্মসাৎ করা টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ডিআইএ কর্মকর্তারা সরেজমিন তদন্তে গিয়ে দেখতে পান, কলেজটিতে এমন ব্যক্তিদের নামেও এমপিও তোলা হয়েছে, যাদের বাস্তবে কোনো বৈধ নিয়োগপ্রক্রিয়াই ছিল না। নিয়োগসংক্রান্ত নথিপত্র, হাজিরা খাতা ও প্রশাসনিক কাগজপত্রের প্রায় সবকিছুই ছিল বানোয়াট ও জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, বছরের পর বছর ধরে অনিয়মিত নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের নামে এই সরকারি অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে।
জাল স্নাতকোত্তর সনদে চাকরি, অধ্যক্ষকে ফেরত দিতে হবে ৪১ লাখ টাকা
তদন্তের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অংশে উঠে এসেছে প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ মো. ইমদাদুল হকের নাম। তার বিরুদ্ধে জাল সনদ ব্যবহার, অবৈধ নিয়োগ, এমপিও অনিয়ম এবং সরকারি অর্থ আত্মসাতের অকাট্য প্রমাণ পাওয়া গেছে। পরিদর্শন ও নিরীক্ষা প্রতিবেদনে তার নিয়োগ ও এমপিওভুক্তিকে অবৈধ উল্লেখ করে সরকারি কোষাগারে ৪১ লাখ ২১ হাজার ২৬১ টাকা ফেরতের সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং প্রচলিত আইনে ফৌজদারি পদক্ষেপ নেওয়ারও সুপারিশ করা হয়েছে।
বনপাড়া কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মো. ইমদাদুল হক নিজেই নিয়োগ বোর্ডের সদস্যসচিব থেকে নিজের স্ত্রী, ছেলে ও মেয়েকে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে চাকরি দিয়েছেন। এমনকি এক পদের নিয়োগ পরীক্ষায় মায়ের সঙ্গে নিজের ছেলেও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ছিলেন। ভুয়া ও জাল স্নাতকোত্তর সনদ দিয়ে বছরের পর বছর চাকরি করা এই অধ্যক্ষকে সরকারি কোষাগারে ৪১ লাখ টাকা ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে
প্রতিবেদনে বলা হয়, মো. ইমদাদুল হক ২০০০ সালের ২১ আগস্ট নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। তার এমপিওভুক্তির তারিখ ২০১০ সালের ১ মে। পরে ২০১৪ সালের ১২ আগস্ট তিনি মাধ্যমিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ পদে যোগদান করেন এবং ২০২৩ সালের ১ জুলাই অধ্যক্ষ হিসেবে এমপিওভুক্ত হন। তবে, অধ্যক্ষ পদে এমপিওভুক্তির মূল কপি তিনি নিরীক্ষা কর্মকর্তাদের দেখাতে পারেননি।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০০০ সালের ২২ জুলাই দৈনিক স্বজন পত্রিকায় প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে শুধুমাত্র বিএ ও বিএসএস ডিগ্রিধারীদের আবেদন করার সুযোগ দেওয়া হয়। বিএসসি ও বি.কম ডিগ্রিধারীদের বাদ দেওয়ায় যোগ্য প্রার্থীরা আবেদন থেকে বঞ্চিত হন। এটি এমপিও নীতিমালা-১৯৯৫ এবং ১৯৮২ সালের নিয়োগ বিধিমালার চরম পরিপন্থী।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, তিনি নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদে কর্মরত থাকা অবস্থায় সরাসরি মাধ্যমিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ পদে উন্নীত হন। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে ন্যূনতম অভিজ্ঞতা বা এমপিওভুক্ত না হয়ে সরাসরি উচ্চতর কলেজের অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ পাওয়া সম্পূর্ণ বিধিবহির্ভূত।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনের হিসাব অনুযায়ী, নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে ২০১০ সালের ১ মে থেকে ২০২৩ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত তিনি ২৬ লাখ ১৮ হাজার ৮৫৪ টাকা সরকারি বেতন-ভাতা গ্রহণ করেন। পরে অধ্যক্ষ হিসেবে ২০২৩ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আরও ১৬ লাখ ১০ হাজার ৪০৭ টাকা গ্রহণ করেন। সবমিলিয়ে ৪১ লাখ ২১ হাজার ২৬১ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়, অধ্যক্ষ পদে যোগদানের পরও তিনি দীর্ঘদিন প্রধান শিক্ষক পদের বেতন-ভাতা গ্রহণ করেছেন। ২০১৪ সালের ১২ আগস্ট থেকে ২০২৩ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত এ খাতে অন্যায়ভাবে নেওয়া প্রায় ১৯ লাখ ৬২ হাজার টাকাও ফেরতযোগ্য।
সনদে অসঙ্গতি ও দ্বৈত মাস্টার্স ডিগ্রির জালিয়াতি
নিরীক্ষায় ইমদাদুল হকের শিক্ষাগত সনদ নিয়ে গুরুতর জালিয়াতি ধরা পড়েছে। এমপিওভুক্তির আবেদনের সঙ্গে তিনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ঢাকা কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রির একটি সনদ জমা দেন। পরে সেই সনদ যাচাইয়ের জন্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো হলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানায়, সনদটি বৈধ হবে যদি তার পিতার নাম ‘মো. আসির উদ্দিন’ এবং মাতার নাম ‘আহমেদা খাতুন’ হয়। কিন্তু তার মূল নিয়োগপত্র, দাখিল ও আলিম পরীক্ষার সনদে পিতার নাম ‘মো. আজহার আলী’ এবং মাতার নাম ‘মমিরন নেছা’ উল্লেখ রয়েছে। এ কারণে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে তার স্নাতকোত্তর সনদটিকে ভুয়া ও জাল বলে প্রত্যয়ন করা হয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) তদন্তে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটির কলেজ শাখায় মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা মাত্র ৭০ জন। অথচ সেখানে সরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও কর্মচারী রয়েছেন ৭৬ জন। ডিআইএ মহাপরিচালক এই ঘটনাকে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার ইতিহাসে ‘অনিয়মের প্রকৃষ্টতম উদাহরণ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় এই সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছিল বলে জানান
এছাড়া, নিরীক্ষাকালে তিনি আমেরিকা বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি থেকে ২০০৫ সালে অর্জিত রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আরেকটি স্নাতকোত্তর সনদও দাখিল করেন। তবে, ইউজিসির বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ গ্রহণযোগ্য নয়। একই ব্যক্তির পক্ষ থেকে দুটি ভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর সনদ দাখিল করাকে বড় ধরনের জালিয়াতি হিসেবে গণ্য করেছে ডিআইএ।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বৈধ স্নাতকোত্তর সনদ না থাকায় তিনি অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ পাওয়ার যোগ্য ছিলেন না। ফলে তার অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ ও এমপিওভুক্তি অবৈধ। জাল বা ভুয়া সনদ দাখিলের কারণে জনবল কাঠামো-২০২১ অনুযায়ী তার বেতন-ভাতা বাতিলযোগ্য বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্ত্রী-ছেলে-মেয়েকে অবৈধভাবে নিয়োগ দেওয়ার মহোৎসব
অধ্যক্ষ মো. ইমদাদুল হকের বিরুদ্ধে স্ত্রী, ছেলে ও মেয়েকে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। পরিদর্শন ও নিরীক্ষা প্রতিবেদনে তাদের নিয়োগ ও এমপিওভুক্তিকে অবৈধ উল্লেখ করে সরকারি কোষাগারে কয়েক লাখ টাকা ফেরতের সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে চাকরিবিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মোসা. ইসমেতারা ২০২১ সালের ২৬ অক্টোবর অফিস সহায়ক পদে যোগদান করেন বলে দাবি করেছেন। তার এমপিও ইনডেক্স নম্বর এন৫৬৮১৩২৬৭। নিরীক্ষায় দেখা যায়, তার অষ্টম শ্রেণি পাসের সনদ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকেই দেওয়া হয়েছে এবং সনদটিতে তার স্বামী অধ্যক্ষ মো. ইমদাদুল হকের স্বাক্ষর রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোসা. ইসমেতারা ২০২২ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সরকারি বেতন-ভাতা হিসেবে ৫ লাখ ৬০ হাজার ৮১৫ টাকা গ্রহণ করেছেন। এ অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে নেওয়া বেতন-ভাতাও ফেরতযোগ্য বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, অধ্যক্ষের ছেলে ইমরুল হাসান কায়েস ২০২২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর ল্যাব সহকারী (আইসিটি) পদে যোগদান করেন বলে দাবি করেছেন। তার এমপিও ইনডেক্স নম্বর এন৫৬৮৫৪২৭৬। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়, তার নিয়োগেও মাউশি অধিদপ্তরের নির্ধারিত প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন না। বিধি অনুযায়ী ময়মনসিংহের আনন্দ মোহন কলেজ বা মুমিনুন্নিছা সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ কর্তৃক মনোনীত প্রতিনিধি থাকার কথা থাকলেও সেখানে ময়মনসিংহ সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রতিনিধির দায়িত্ব পালন করেন। ফলে ১৯৮২ সালের নিয়োগ বিধির গুরুত্বপূর্ণ শর্ত লঙ্ঘিত হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির মূল কপি পরিদর্শনকালে দেখানো হয়নি। এছাড়া, এসএসসি পরীক্ষার নম্বরপত্রও প্রদর্শন করা হয়নি। ফলে তিনি কম্পিউটার বা তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিসহ এসএসসি পাস ছিলেন কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এসব অনিয়মের কারণে তার নিয়োগ অবৈধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইমরুল হাসান কায়েস ২০২৩ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩ লাখ ৭০ হাজার ৭৯৬ টাকা সরকারি বেতন-ভাতা গ্রহণ করেছেন। এ টাকা ফেরত দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে জালিয়াতির মাধ্যমে চাকরি লাভের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে চাকরিবিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
এদিকে, অধ্যক্ষের মেয়ে ইসরাত জাহান ২০২৩ সালের ১ অক্টোবর ল্যাব সহকারী (পদার্থবিজ্ঞান) পদে যোগদান করেন বলে দাবি করেছেন। তার এমপিও ইনডেক্স নম্বর এন৫৬৮৭১৫৬৫। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তার নিয়োগেও মাউশি অধিদপ্তরের নির্ধারিত প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন না। এ কারণে নিয়োগ বিধির গুরুত্বপূর্ণ শর্ত পূরণ হয়নি এবং নিয়োগ অবৈধ হিসেবে গণ্য হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ইসরাত জাহানের জন্মতারিখ নিয়ে একাধিক নথিতে অসংগতি পাওয়া গেছে। চাকরির আবেদনপত্রে জন্মতারিখ ১৯ আগস্ট ২০০৫ উল্লেখ থাকলেও এসএসসি সনদ ও জাতীয় পরিচয়পত্রে জন্মতারিখ ১৯ আগস্ট ২০০৬ উল্লেখ রয়েছে। ফলে চাকরির আবেদনপত্র ও শিক্ষাসনদে জন্মতারিখ জালিয়াতির অভিযোগ আনা হয়েছে।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়, অধ্যক্ষ মো. ইমদাদুল হক নিজের ছেলে-মেয়েকে জালিয়াতি ও অনিয়মের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানে চাকরি দিয়ে স্বজনপ্রীতি ও পক্ষপাতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। প্রতিবেদনে ইসরাত জাহানের নিয়োগ ও এমপিও অবৈধ ঘোষণা করে ২০২৩ সালের ১ নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নেওয়া ৩ লাখ ৯ হাজার ৮৯৬ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে গ্রহণ করা বেতন-ভাতাও ফেরতযোগ্য বলে উল্লেখ করা হয়।
১৯ শিক্ষক-কর্মচারীর বিরুদ্ধে মামলা ও অর্থ ফেরতের নির্দেশ
ডিআইএ প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, কলেজ শাখার বাংলা বিভাগের প্রভাষক তানজিলা ইসলাম লিজা, ইংরেজির প্রভাষক মো. আবু রায়হান, আইসিটির প্রভাষক মোস্তাফিজুর, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রভাষক লুৎফা তালুকদার, সমাজকর্মের প্রভাষক মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন, ইসলাম শিক্ষার প্রভাষক তৌহিদা বেগম, ইসলামের ইতিহাসের প্রভাষক মো. শহীদুল আলম এবং ফিন্যান্সের প্রভাষক মো. কামরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ব্যাকডেটে নিয়োগ, ভুয়া রেকর্ড তৈরি, ব্যানবেইস তালিকায় নাম না থাকা এবং সনদে অসঙ্গতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। তাদের প্রত্যেককে ১২ লাখ ১২ হাজার ৯৯ টাকা করে সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
একইভাবে প্রভাষক মোছা. রেহেনা পারভীন, কামাল হোসেন, মো. নূরে আলম ও মো. হাসিবুর রহমানের বিরুদ্ধেও জাল নিয়োগ রেকর্ড ও বিভিন্ন অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে হাসিবুর রহমানকে ৩৬ লাখ ৭৫ হাজার ৫৮ টাকা এবং অন্যদের ১২ লাখ ১২ হাজার ৯৯ টাকা করে ফেরতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, প্রভাষক মো. শাহজাহান আলীর বিরুদ্ধে জাল সনদ দাখিলের অভিযোগে ২ লাখ ৩২ হাজার ৫৮ টাকা ফেরত চাওয়া হয়েছে।
ডিআইএ প্রতিবেদনে অভিযুক্ত এই ১৯ জনকে অযোগ্য ঘোষণা করে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং প্রচলিত আইনে মামলা দায়েরের সুপারিশ করা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আত্মসাৎ করা অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা না দিলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হবে। তবে, ইতোমধ্যে মূল অভিযুক্ত সাবেক অধ্যক্ষ মো. ইমদাদুল হক পুলিশ হেফাজতে রয়েছেন এবং তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির মোট ৭৬ জন শিক্ষকের মধ্যে ৭৩ জনের নিয়োগেই কোনো সরকারি বিধিমালা বা ফরমালিটি মানা হয়নি। ‘ব্যাকডেট’ বা পেছনের তারিখ দেখিয়ে এবং ভুয়া বিএড ও জাল শিক্ষাগত সনদ ব্যবহার করে তারা প্রায় ৪ কোটি টাকা সরকারি বেতন-ভাতা হাতিয়ে নিয়েছেন। অভিযুক্ত ১৯ জন শিক্ষক-কর্মচারীকে অযোগ্য ঘোষণা করে তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ও বিভাগীয় মামলা দায়েরের সুপারিশ করা হয়েছে
নিয়ম মেনে নিয়োগ পাননি ৭৬ শিক্ষকের ৭৩ জনই: ডিআইএ মহাপরিচালক
প্রতিষ্ঠানটিতে এমপিওভুক্ত ৭৬ জন শিক্ষকের মধ্যে ৭৩ জনই নিয়ম মেনে নিয়োগ পাননি বলে জানিয়েছেন ডিআইএর মহাপরিচালক অধ্যাপক এম এম সহিদুল ইসলাম।
তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়ে শিক্ষা ব্যবস্থায় যে ব্যাপক দুর্নীতি ও সীমাহীন অনিয়ম হয়েছে, বনপাড়া স্কুল অ্যান্ড কলেজ তার জলজ্যান্ত উদাহরণ। রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এসব অবাস্তব ঘটনা ঘটেছে। আমাদের তদন্তে উঠে এসেছে, এমপিওভুক্ত অধিকাংশ শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় বিধি-বিধান একেবারেই অনুসরণ করা হয়নি। অনেকেই জাল সনদ ও ব্যাকডেটের কাগজপত্র ব্যবহার করে নিয়োগ পেয়েছেন। এমনকি কয়েকজনের কলেজ শিক্ষক হওয়ার ন্যূনতম যোগ্যতাও ছিল না।’
সহিদুল ইসলাম বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন,“৭৬ জন শিক্ষককে এমপিওভুক্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে ৭৩ জনেরই শিক্ষক হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কোনো ফরমালিটি মানা হয়নি। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই কলেজ শাখায় মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা মাত্র ৭০ জন! অথচ সেখানে সরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষক রয়েছেন ৭৬ জন! বিষয়টিকে আমি বাংলাদেশের শিক্ষা ইতিহাসের ‘অনিয়মের প্রকৃষ্টতম উদাহরণ’ হিসেবে মনে করছি।”
তিনি বলেন, পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন ইতোমধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে এবং এই জালিয়াতির সঙ্গে যুক্ত সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা ও শিক্ষকদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।