Image description

গভীর সমুদ্রের ইলিশ ডাডি, ছুরি, পোয়াসহ বিভিন্ন প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ নিয়ে ঘাটে ভিড়ছে সারি সারি ট্রলার। আর সমুদ্র থেকে ফিরে আসা এসব ট্রলার থেকে ঘাটের আড়তগুলোতে মাছ তুলতে চলছে মৎস্যজীবীদের হাঁক ডাক।

দেখে বোঝার উপায় নেই মৎস্য শিকারে সরকারিভাবে নিষেধাজ্ঞা চলছে। আবার এসব মাছের মধ্যে কাঁচা রপ্তানির পাশাপাশি প্রকারভেদে নদীর তীরে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে চলছে শুঁটকি প্রক্রিয়াজাত করন। যা বঙ্গোপসাগর থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরত্বে স্থাপন করা হয়েছে এসব শুঁটকির তৈরির মাচা।

বলা চলে মৎস্য পয়েন্টজুড়েই এক মহাকর্মযজ্ঞ চলছে। যা নিষিদ্ধকালীন সময়ে যেন দেখার কেউ নেই। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়রীরা বলছেন, নৌ-পুলিশ, রাজনৈতিক নেতাসহ বিভিন্ন দপ্তর ম্যানেজ করেই চলেছে এমন রমরমা বাণিজ্য। তাই সেখানে সাংবাদিকরা করবে কি এমন প্রশ্ন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী মিজানুর প্যাদার।

পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার ধুলাসার ইউপির আশাখালী মৎস্য বাজার। উপকূলীয় ব্যবসায়ীসহ দূর-দূরান্ত থেকে আগত ব্যবসায়ীদের কাছে এই মাছ মার্কেটের বেশ পরিচিত। আশাখালী এই পয়েন্ট ঘিরেই দীর্ঘ এলাকাজুড়ে গড়ে উঠেছে একাধিক মৎস্য আড়ত ও শুঁটকি পল্লী। যেখানে নিয়মিত ঘাটে এসে নোঙর করে শত শত গভীর সমুদ্রগামী মাছধরা ট্রলার। আর সমুদ্র থেকে আহরণ করে নিয়ে আসা জেলেদের অসংখ্য মাছ এই ঘাট থেকেই পৌঁছে যায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তরে।

 

কিন্তু সামুদ্রিক মাছের প্রজনন মৌসুম হিসেবে ১৫ এপ্রিল থেকে ১১ জুন পর্যন্ত মৎস্য শিকারে ৫৮ দিনের কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরপ করে সরকার। এই সময়ে সামুদ্রিক মাছ ডিম ছাড়ার উপযোগী হিসেবেই আহরণ বন্ধের সিন্ধান্ত গ্রহণ করে বাংলাদেশ মৎস্য বিভাগ। আর সেই সরকারি নিষেধাজ্ঞাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েই এই ঘাটে চলছে রমরমা মৎস্য বাণিজ্য।

শুধু তাই নয়, আশাখালী মাছ মার্কেট লাগোয়া খালের পাড়েই গড়ে তোলা হয়েছে শুঁটকি তৈরির অনেক মাচা। সেখানে এই নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও দম ফেলার ফুসরত পাচ্ছেন না শুঁটকি শ্রমিকরা।

সরেজমিনে কথা হলে নারী শ্রমিক কুলসুম কালবেলাকে বলেন, দৈনিক কাজে আসেন তিনি। তার মতো অনেক নারীই শুঁটকি শুকানোর কাজে এখানে নিয়োজিত। তবে প্রশাসনের বাধা আসে কিনা জানতে চাইলে বলেন, কই এমন তো কোনো সময় দেখি নাই।

এই ঘাটের মাসুদ মাঝি বলেন, পেটের দায়ে সাগরে যাই, জাইল্লা চাউলডাও পাই না, তাই মাছ ধরি। সোমবারেও প্রায় ৭০ মণ কাঁচা মাছ নিয়ে এসেছি। যা শুকানোর পর অন্তত ৩০ মণ শুঁটকি হবে।

এই মার্কেটেই শুঁটকি কিনতে আসা আবদুস সালাম বলেন, সাগরের কাছে তো, আর রৌদটাও ভালো আছে। তাই দুই রৌদেই শুঁটকি হইয়া যায়। তিনি বলেন, টাটকা শুঁটকি এখানের। তাই ছুরি, পোয়া শুঁটকি কেনেন ৯ হাজার আর চেপাসহ অন্যান্য ১০/১২ হাজারে। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা সময়ে কিভাবে সম্ভব জানতে চাইলে বলেন, সব এখানে ম্যানেজে চলে।

স্থানীয় জেলে রাকিবুল জানান, নেতাদের সিস্টেম ভিন্ন আর নৌ-পুলিশেরে দাগমুলে টাহা দেয়। নাইলে এরহম কেমনে চলে বোঝেন না?

অনুসন্ধানে জানা যায়, আশাখালী ঘাটের আরতগুলোতে প্রতিদিন ডাক তুলে বাধাহীনভাবে বিভিন্ন প্রজাতির শত শত মণ মাছ বিক্রি করছেন জেলেরা। আর খালপাড় থেকে সরাসরি সামুদ্রিক মাছ নামিয়ে প্রক্রিয়াজাত করছেন অন্তত ২০ জন ব্যবসায়ী।

শুটকি পল্লীর নেতৃত্ব দিচ্ছেন মিজানুর প্যাদা। যিনি রাজনৈতিক নেতাসহ প্রশাসনের মাধ্যমগুলো ম্যানেজ করে থাকেন। তবে এই প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর কাছে জানতে চাইলে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, এখানে আপনাদের কাজ কি? পুলিশ, নেতা সব ম্যানেজ করে তারপর এখানে ব্যবসা করি।

সরকারি নিষেধাজ্ঞার মধ্যে কীভাবে সম্ভব জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাতে কিছু আসে যায় না। প্রতিদিন এখানে লাখ লাখ টাকার ব্যবসা চলে। গাইড করার লোক আছে। এমনকি ক্যামেরার সামনে কোনো কথা বলবেন না বলে উচ্চস্বরে সাংবাদিকদের চলে যেতে বলেন তিনি।

কুয়াকাটা নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মো. মনির কালবেলাকে বলেন, দায়িত্বে শুধু আমরা একা নই, পায়রা বন্দর নৌ-পুলিশও রয়েছে। আর আমাদের সঙ্গে কোনো আর্থিক লেনদেন হয়নি। আমি দূরে আছি। কর্মস্থলে ফিরে আশাখালী অভিযানে যাব।

কলাপাড়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, আপনার মাধ্যমে শোনার পর উপজেলা মিটিংয়ে এ বিষয় আলোচনা হয়েছে। আমাদের জনবল সম্পর্কে আপনারা তো জানেন। ইউএনও স্যারের নির্দেশনা পেয়েছি। অবশ্যই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।