Image description

কুরবানির ঈদ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে দেশের বিভিন্ন পশুর হাটে জমে উঠেছে বেচাকেনা। পরিবারে কুরবানির জন্য পছন্দের পশু কিনতে প্রতিদিন হাজারো মানুষ ভিড় করছেন হাটে। তবে বাহ্যিকভাবে বড় বা মোটা দেখালেই পশু সুস্থ—এমন ধারণা সবসময় সঠিক নয়। অনেক সময় অসাধু ব্যবসায়ীরা স্টেরয়েড, হরমোন বা ক্ষতিকর ইনজেকশন ব্যবহার করে অস্বাভাবিকভাবে পশু মোটাতাজা করে থাকেন, যা পশু ও মানুষের উভয়ের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

 

 

এ অবস্থায় হাট থেকে সুস্থ পশু নির্বাচন, কৃত্রিমভাবে মোটাতাজাকৃত পশু শনাক্ত করা এবং পশুকল্যাণ নিশ্চিত করার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) গবেষক, ভেটেরিনারিয়ান ও ভেটেরিনারি পাবলিক হেলথ বিশেষজ্ঞ মাইক্রোবায়োলজি অ্যান্ড হাইজিন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোছা. মিনারা খাতুন। তিনি সুস্থ পশু নির্বাচনের বেশ কিছু উপায় উল্লেখ করেছেন।

 

প্রথম উপায়
এই বিশেষজ্ঞের মতে, ‘পশু কেনার সময় প্রথমেই পশুর আচরণ ও শারীরিক অবস্থা ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। সুস্থ পশু কান ও লেজ নাড়াবে। সে এলার্ট থাকবে। সুস্থ পশুর চোখ উজ্জ্বল ও পরিষ্কার থাকে, নাক সামান্য ভেজা থাকে এবং কান সচলভাবে নড়াচড়া করে। পশুর শরীরে ঘা, চুলকানি, ক্ষত বা পোকা থাকা উচিত নয়। একই সঙ্গে লোম ও চামড়া মসৃণ ও চকচকে হওয়া ভালো স্বাস্থ্যের লক্ষণ। নাক ও চোখ দিয়ে কোনো তরল পড়বে না। পশু স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করবে এবং খাবারের প্রতি আগ্রহ দেখাবে-এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।’

 

 

দ্বিতীয় উপায়
‘দ্বিতীয়ত, গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়ার ক্ষেত্রে ‘জাবর কাটা’ সুস্থতার অন্যতম বড় লক্ষণ। নিয়মিত জাবর কাটলে বোঝা যায় পশুর হজম প্রক্রিয়া স্বাভাবিক রয়েছে। অসুস্থ পশু সাধারণত কম জাবর কাটে কিংবা একেবারেই কাটে না।’ তাই হাটে পশু দেখার সময় কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে পশুর স্বাভাবিক আচরণ পর্যবেক্ষণ করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

 

তৃতীয় উপায়
বর্তমানে কুরবানির বাজারকে কেন্দ্র করে কিছু ব্যবসায়ী দ্রুত লাভের আশায় স্টেরয়েড বা হরমোনজাতীয় ওষুধ ব্যবহার করে পশু মোটাতাজা করেন। এই বিশেষজ্ঞের ভাষ্য অনুযায়ী, এ ধরনের পশুর শরীর অস্বাভাবিক ফুলে থাকে, হাঁটাচলায় দুর্বলতা বা হাঁপানোর লক্ষণ দেখা যায়। অনেক সময় চামড়া অতিরিক্ত টানটান ও অস্বাভাবিক চকচকে দেখায়। পেট ফোলা থাকলেও মাংসপেশি স্বাভাবিক থাকে না। শরীরে ইনজেকশনের দাগও থাকতে পারে। তার মতে, এ ধরনের কৃত্রিমভাবে মোটাতাজাকৃত পশুর মাংস মানুষের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। দীর্ঘদিন এমন মাংস খেলে হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া, কিডনি ও লিভারের ক্ষতি, হজমের সমস্যা, অ্যালার্জিসহ বিভিন্ন জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

 

চতুর্থ উপায়
পশুকল্যাণের বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেছেন অধ্যাপক মিনারা। তিনি বলেন, ‘ট্রাক বা নৌকায় গাদাগাদি করে পশু পরিবহন করলে পশুর শরীরে আঘাত, শ্বাসকষ্ট, পানিশূন্যতা ও মানসিক চাপ তৈরি হয়। অনেক সময় অতিরিক্ত ক্লান্তি ও চাপের কারণে পশু অসুস্থ হয়ে পড়ে বা মারা যায়। বিশেষ করে বাসের ডিকি বা লোকাল বক্সে ছাগল-ভেড়া পরিবহনকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন তিনি। এতে পর্যাপ্ত বাতাস না পাওয়ায় শ্বাসরোধ কিংবা অতিরিক্ত গরমে পশুর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘হাটের মধ্যে দীর্ঘ সময় পশুকে দাঁড়িয়ে রাখলেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এতে পশু ক্লান্ত ও দুর্বল হয়ে পড়ে, পায়ে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট ও খাবারে অনীহা দেখা দেয়। এমনকি অতিরিক্ত মানসিক চাপের কারণে মাংসের গুণগত মানও কমে যেতে পারে। এতে মাংস শক্ত, শুষ্ক ও কম স্বাদযুক্ত হয়ে পড়ে।’

 

পশুকে সুস্থ রাখতে প্রথম পরামর্শ
কুরবানির আগে পশুর খাবারের দিকেও নজর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। পশুকে পরিষ্কার পানি, ঘাস, খড়, ভুসি ও স্বাভাবিক দানাদার খাবার দিতে হবে। হঠাৎ অতিরিক্ত খাবার বা অপরিচিত খাবার দেওয়া উচিত নয়। পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও পানি নিশ্চিত করলে পশু সুস্থ ও স্বাভাবিক থাকে। তিনি বলেন, ‘প্রাকৃতিক সুষম খাদ্য পশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। ঘাস, খড়, ভুসি ও শস্যজাত খাবার দীর্ঘমেয়াদে পশুর জন্য নিরাপদ। বিপরীতে অতিরিক্ত রাসায়নিকযুক্ত বা কৃত্রিম খাদ্য দ্রুত মোটাতাজা করলেও তা পশুর স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে এবং মাংসের গুণগত মান কমিয়ে দেয়।’

 

দ্বিতীয় পরামর্শ
এ ছাড়াও হাটে কোনো পশু হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে দ্রুত তাকে ভিড় ও রোদ থেকে সরিয়ে শান্ত জায়গায় রাখতে হবে বলেও পরামর্শ দেন তিনি। পরিষ্কার পানি দিতে হবে এবং জ্বর, শ্বাসকষ্ট বা আঘাত আছে কি না খেয়াল রাখতে হবে। নিজেরা ওষুধ প্রয়োগ না করে দ্রুত একজন বাংলাদেশ ভেটেরিনারি কাউন্সিল (বিভিসি) কর্তৃক নিবন্ধিত ভেটেরিনারি চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ বলে মত এই বিশেষজ্ঞ।

 

তৃতীয় পরামর্শ
আসন্ন কুরবানির ঈদে সুস্থ পশু নির্বাচন ও পশুর প্রতি মানবিক আচরণ নিশ্চিত করতে সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। তিনি বলেন, একটু সচেতন হলেই যেমন নিরাপদ মাংস নিশ্চিত করা সম্ভব, তেমনি পশুর অপ্রয়োজনীয় কষ্টও অনেকাংশে কমানো যায়।