২০২৬-২৭ অর্থ বছরের বাজেটে কর আদায় না বাড়লে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে বাণিজ্য চুক্তি হয়েছে, সেটি অর্থনীতিতে চাপ বাড়াবে। উন্নয়ন বাজেট বাড়াতে হলে অবশ্যই সরকারের কর আদায়ও বাড়াতে হবে। তবে কর আদায় বাড়াতে রাজস্ব আহরণের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হচ্ছে, সেটি বাস্তবায়ন অযোগ্য। পাশাপাশি এটি পুরোনো সংস্কৃতির ধারায় নির্ধারণ করা হচ্ছে। গতকাল রাজধানীর গুলশানে একটি হোটেলে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম আয়োজিত ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ : রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও নাগরিক প্রত্যাশা’ শীর্ষক প্রাক-বাজেট সংলাপে বক্তারা এসব কথা বলেন।
নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ও সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের সভাপতিত্বে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান। সংলাপে প্রধান অতিথি ছিলেন সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী ডা. আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন। বিশেষ অতিথি ছিলেন সংসদ সদস্য মো. সাইফুল আলম খান মিলন ও মাহ্মুদা হাবীবা। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক অধ্যাপক এ কে এনামুল হক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক শরমিন্দ নীলোর্মি, নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক প্রমুখ। সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, ‘কর আদায় না বাড়িয়ে পরিচালন ব্যয় বাড়ালে সরকারের ওপর চাপ বাড়বে। উন্নয়ন বাজেট বাড়াতে হলে অবশ্যই সরকারের কর আদায়ও বাড়াতে হবে। কর আদায় না বাড়লে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে বাণিজ্য চুক্তিতে আমরা আবদ্ধ হয়েছি, সেটিও সরকারের ওপর চাপ বাড়াবে।’
অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘বাজেটে জনগণ কতটা দিচ্ছে এবং কতটা ফেরত পাচ্ছে, সেটির মূল্যায়ন হওয়া উচিত। এখানে জনগণের থেকে নিয়ে কতটা দুর্নীতি হচ্ছে তার মেজারমেন্ট হওয়া উচিত। আগামী বাজেটে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা ঋণের সুদ হিসেবে ব্যয় করতে হবে। এ রকম ঋণনির্ভরতা কমিয়ে আনতে হবে।’ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘অবাস্তব রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ও অতিরিক্ত উন্নয়ন ব্যয়ের পরিকল্পনা অর্থনীতিকে আরও চাপের মুখে ফেলতে পারে। দেশ বর্তমানে নানান অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে রয়েছে। অথচ বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার তিন মাস পার হলেও অর্থনীতিকে কী অবস্থায় পেয়েছে, তার কোনো প্রামাণ্য মূল্যায়ন প্রকাশ করেনি। সরকার ফ্যামিলি কার্ড, ফারমার্স কার্ড বা খাল খননের মতো কর্মসূচি নিয়ে বেশি আলোচনা করলেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সুদের হার কমানো, বিনিময়হার স্থিতিশীল রাখা কিংবা কর্মসংস্থান বাড়ানোর বিষয়গুলো মনোযোগে আসছে না।
’ সমাজকল্যাণমন্ত্রী মন্ত্রী ডা. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে একটি মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী, নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী ও দরিদ্র মানুষকে সামাজিক সুরক্ষার আওতায় এনে জীবনমান উন্নয়ন করা হবে। আগামী অর্থবছর থেকে পর্যায়ক্রমে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে।’ বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি মো. ফজলুল হক বলেন, ‘খাতভিত্তিক বরাদ্দ দুই-এক বছর না বাড়িয়ে কোয়ালিটিতে জোর দেওয়া উচিত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বরাদ্দ বাড়লেও লক্ষ্য ও বাস্তবায়নের মধ্যে বড় তফাত দেখা গেছে। মাঝখানে বড় অঙ্কের দুর্নীতি হয়। বস্তুত পক্ষে বরাদ্দ না বাড়িয়ে কোয়ালিটি বজায় রেখে ব্যয় হলে আমাদের বাজেট ঘাটতিও কমে আসবে।’ অনুষ্ঠানে উন্মুক্ত আলোচনায় কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, মানুষের কষ্ট বাড়ছে। এজন্য বাজেটে প্রয়োজনীয় দ্রব্যে আমদানি শুল্ক কমানো প্রয়োজন।’ এ ছাড়া জ্বালানির দাম আর না বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি। এ এইচ এম সফিকুজ্জামানের কথার সূত্র ধরে দ্রব্যমূল্য বাড়ার ক্ষেত্রে চাঁদাবাজির প্রভাব নিয়েও কথা বলার পরামর্শ দেন জামায়াতের সংসদ সদস্য মো. সাইফুল আলম খান মিলন।