Image description

ঢাকার বুকে একের পর এক মানুষের টুকরো টুকরো লাশ উদ্ধারের ঘটনায় রাজধানীজুড়ে চরম আতঙ্ক ও উদ্বেগ বিরাজ করছে। পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে, এসব খণ্ডিত লাশ উদ্ধারের ঘটনার পেছনে পরকীয়া, অর্থ লেনদেনের বিরোধ ও ব্যক্তিগত ক্ষোভের মতো বিষয় জড়িত থাকতে পারে।

এরই মধ্যে আবার এক ব্যক্তির সাত খণ্ড লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরকীয়ার কারণে সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডগুলোর ভয়াবহতা তুলে ধরে এলাকাভিত্তিক প্রচারণা চালানো উচিত।

রোববার (১৭ মে) আবারও টুকরো টুকরো লাশ উদ্ধারের ঘটনায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। পরে পরিচয় মেলে সাত টুকরো করা সেই লাশের।

নিহতের নাম মোকাররম মিয়া (২৮)। র‍্যাব কর্মকর্তাদের দাবি, তিনি পরকীয়ার বলি হয়েছেন।
এ ঘটনায় দুই নারীকে (মা ও মেয়ে) আটক করা হয়েছে।

সোমবার (১৮ মে) বিকেলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে মোকাররমের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। পরে পরিবারের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হয়।

মোকাররমের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলার তালশহর গ্রামে। তার বাবার নাম সোহরাব মিয়া ও মা সামিনা বেগম।

তার চাচাতো ভাই মো. রিফাত জানান, মোকাররম গত তিন বছর ধরে সৌদি আরবে ছিলেন। তার স্ত্রী জোনাকি আক্তার গৃহিণী। দুই ছেলে মুজাহিদ (৪) ও বায়জিদ (৬) মায়ের সঙ্গে গ্রামের বাড়িতেই থাকেন।

তিনি জানান, মোকাররম সর্বশেষ ১৩ মে ছেলেদের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। তখন তিনি কাজে যাচ্ছেন, পরে বাসায় ফিরে কথা বলবেন বলে সন্তানদের জানান। এরপর আর তার সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। গত রোববার রাতে আশুগঞ্জ থানা পুলিশ গ্রাম পুলিশের মাধ্যমে তাদের বাড়িতে মোকাররমের লাশ উদ্ধারের খবর পাঠায়। এরপরই পরিবারের সদস্যরা ঢাকায় ছুটে আসেন এবং থানায় এসে বিষয়টি নিশ্চিত হন।

কারা এই ঘটনা ঘটিয়েছে, সেটি নিশ্চিত করে বলতে না পারলেও একই গ্রামের আরেক প্রবাসীর স্ত্রীর সঙ্গে মোকাররমের পরকীয়া সম্পর্ক ছিল বলে জানান চাচাতো ভাই রিফাত।

তিনি বলেন, মোকাররম যেদিন থেকে নিখোঁজ, সেদিন থেকেই ওই প্রবাসীর স্ত্রীর বাড়িতেও তালা ঝুলছে। তাকে যারা খুন করেছে, এটি খুবই পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। হত্যাকারীরাই তাকে দেশে ডেকে এনেছে। তবে তার দেশে আসার খবর পরিবারের কেউ জানতেন না।

রোববার দুপুরে মুগদার মান্ডার প্রথম গলির একটি বাড়ির বেজমেন্ট থেকে পলিথিনে মোড়ানো সাত টুকরো লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে মধ্যরাতে পূর্ব মানিকনগর এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয় মোকাররমের বিচ্ছিন্ন মাথা।

র‍্যাব ৭ টুকরো লাশের ঘটনায় যা জানালো
পরকীয়া, অর্থ লেনদেন ও আপত্তিকর ছবি-ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকিকে কেন্দ্র করে রাজধানীর মুগদার মান্ডায় সৌদিপ্রবাসী মোকাররম মিয়া হত্যা মামলায় হেলেনা বেগম (৪০) ও তার মেয়ে হালিমা আক্তারকে (১৩) গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

সোমবার র‍্যাব-৩ জানায়, নিহত মোকাররম সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরে তাসলিমা আক্তারের সঙ্গে মান্ডার একটি বাসায় ওঠেন। সেখানে বিয়ে ও টাকা ফেরত নিয়ে বিরোধের এক পর্যায়ে তাকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে হত্যা করা হয়। পরে লাশ সাত টুকরো করে বিভিন্ন স্থানে ফেলে দেওয়া হয়।

র‍্যাব জানায়, প্রথমে ফিঙ্গারপ্রিন্টের মাধ্যমে নিহতের পরিচয় শনাক্ত করা হয়। গ্রেপ্তারদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে লাশের মাথার অংশও উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় মূল পলাতক তাসলিমাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

২৬ টুকরো লাশের নেপথ্যে পরকীয়া ও ব্ল্যাকমেইল
গত বছরের নভেম্বরে রাজধানীর শাহবাগ জাতীয় ঈদগাহ মাঠসংলগ্ন এলাকা থেকে ড্রামের ভেতর ২৬ টুকরো খণ্ডিত লাশ উদ্ধার করা হয়। তদন্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানায়, রংপুরের কাঁচামাল ব্যবসায়ী আশরাফুল হক হত্যার পেছনে ছিল পরকীয়া, ব্ল্যাকমেইল ও অর্থ লেনদেন।

তদন্তসংশ্লিষ্টরা গণমাধ্যমকে জানান, হানি ট্র্যাপের ফাঁদে ফেলে ১০ লাখ টাকা আদায়ের পরিকল্পনায় আশরাফুলকে ঢাকার কদমতলীতে ডেকে নেওয়া হয়। পরে তাকে হত্যা করে লাশ ২৬ টুকরো করে দুটি নীল ড্রামে ভরে শাহবাগ এলাকায় ফেলে দেওয়া হয়।

এ ঘটনায় নিহতের বন্ধু জরেজুল ইসলাম ও শামীমা আক্তারকে গ্রেপ্তার করা হয়। আগে থেকেই আশরাফুলের সঙ্গে মিথ্যা প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলেন শামীমা। নিয়মিত অডিও ও ভিডিওকলে কথা বলে তাকে আকৃষ্ট করা হয়। পরে ব্ল্যাকমেইল করে ১০ লাখ টাকা আদায়ের উদ্দেশ্যে বন্ধু জরেজুলের সঙ্গে মিলে এই ফাঁদ পাতা হয়েছিল।

যাত্রাবাড়ীতে তাসলিমা হত্যা
চলতি বছরের মার্চের শেষ দিকে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর দক্ষিণ সায়েদাবাদ এলাকায় তাসলিমা (৩৪) নামে এক নারীকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়।

পুলিশ জানায়, পূর্বপরিচিত আব্দুল্লাহ রাজু (৪১) জরুরি কথার কথা বলে তাকে ভবনের ছাদে ডেকে নেন। সেখানে বাগবিতণ্ডার একপর্যায়ে তাসলিমাকে ছুরিকাঘাত করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে উঠে আসে, পরকীয়া ও আর্থিক লেনদেনের জের ধরেই সংঘটিত হয় এ হত্যাকাণ্ড।

ওবায়দুল্লাহকে পাঁচ টুকরো করে বিভিন্ন স্থানে ফেলে রাখা হয়
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে রাজধানীর নয়াপল্টন, গুলিস্তান, কমলাপুর রেলস্টেশন ও যাত্রাবাড়ীর মাতুয়াইল এলাকা থেকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা এক ব্যক্তির পাঁচ টুকরো লাশ উদ্ধার করা হয়।

পরে আঙুলের ছাপের মাধ্যমে নিহতের পরিচয় শনাক্ত করা হয়। তিনি নরসিংদীর শিবপুরের বাসিন্দা মোহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ (৩০)। তিনি একটি প্রতিষ্ঠানের বিপণন কর্মকর্তা ছিলেন।

এ ঘটনায় শাহীন আলম (২১) নামে এক যুবককে আটক করে পুলিশ। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি ব্যক্তিগত ক্ষোভের জেরে ওবায়দুল্লাহকে শ্বাসরোধে হত্যার কথা স্বীকার করেন। পরে লাশ টুকরো করে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ফেলে দেন বলে জানায় পুলিশ।

সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে শাহীনকে শনাক্ত করা হয়। পরে মতিঝিলের হীরাঝিল হোটেল থেকে তাকে আটক করা হয়। এ সময় হত্যায় ব্যবহৃত চাপাতি ও সাইকেল জব্দ করা হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, পরকীয়ার কারণে দেশে বিবাহবিচ্ছেদ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। পরকীয়া শুধু সুখের সংসার ভাঙছে না, বরং এর জেরে খুন, আত্মহত্যা ও লাশ টুকরো করার মতো নৃশংস ঘটনাও বাড়ছে।

তার মতে, সাম্প্রতিক সময়ে ৭, ৫ ও ২৬ টুকরো করে হত্যার ঘটনাগুলো গোটা সমাজকে আতঙ্কিত করে তুলেছে। মোবাইল ও ইন্টারনেটের অবাধ ব্যবহার, মাদক এবং নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। অনেক সুখী পরিবারও একটি চক্রের টার্গেটে পরিণত হচ্ছে, যেখানে অর্থ ও অনৈতিক সম্পর্ককে কেন্দ্র করে সংসার ধ্বংস হচ্ছে।

তিনি বলেন, পরিবার থেকেই নৈতিক শিক্ষা, ধর্মীয় অনুশাসন ও সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো গেলে এ ধরনের ভয়াবহ অপরাধ অনেকাংশে কমে আসবে।

এ ছাড়া সামাজিক অবক্ষয় প্রতিরোধে এলাকাভিত্তিক ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালানো এবং পরকীয়া, মাদক ও নৈতিক অবক্ষয়ের ভয়াবহ পরিণতি মানুষের সামনে তুলে ধরার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এলাকাভিত্তিক সভা-সমাবেশ, উঠান বৈঠক, পোস্টার, লিফলেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো জরুরি। বিশেষ করে সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডগুলোর ভয়াবহতা তুলে ধরে মানুষকে সচেতন করার ওপর জোর দেওয়া উচিত।

তাদের মতে, কেন একটি মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করে ৭ বা ২৬ টুকরো করা হলো-এর পেছনের সামাজিক অবক্ষয়, মাদক ও মানবিক মূল্যবোধের সংকট সম্পর্কে প্রতিটি পরিবারকে জানানো জরুরি। পরিবার ও সমাজে নৈতিক শিক্ষা বাড়ানো গেলে এ ধরনের অপরাধ কমে আসবে বলেও মনে করছেন তারা।