সকালটা শুরু হতো স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতি দিয়ে। দিন শেষে বিকেলে জমে উঠত সাথীদের নিয়ে আড্ডা। হৈ-হুল্লোড়ে মাতোয়ারা মেয়েটার নাম বনলতা হালদার। সেই সময় এখন কেবল স্মৃতির ফ্রেমে বন্দি। দুরন্ত মেয়েটাও নেই আগের মতো। তার জীবন ফুরিয়ে যাচ্ছে শিকলে বাঁধা অবস্থায়।
কিন্তু বনলতার কি স্মৃতিমাখা শৈশবে ফিরতে ইচ্ছে করে? হয়তো ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’। কারণ, তার পক্ষে অতীত মনে করতে পারাটা এখন বড় কঠিন। মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে তার দৃষ্টিতে সব কিছু হয়ে গেছে অস্বাভাবিক। তাকে দেড় যুগ ধরে শিকল দিয়ে বেঁধে রেখেছে পরিবার।
বনলতা হালদারের বয়স বর্তমানে ৪০ বছর। দেড় যুগের বেশি সময় আগে বাবা মারা যায়। পরিবারে নেমে আসে অর্থকষ্ট। তার সঙ্গে আছে বনলতার চিকিৎসা খরচ। সব মিলিয়ে পরিবারের অন্য সদস্যদের পক্ষে চাপ সামলানো ছিল কঠিন। বন্ধ হয়ে যায় বনলতার চিকিৎসা। ধীরে-ধীরে সম্পূর্ণ ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েন বনলতা।
মাদারীপুরের ডাসার উপজেলা নবগ্রাম ইউনিয়নের নয়াকান্দি গ্রামের মৃত কার্তিক হালদারের মেয়ে বনলতা হালদার। মা ও দুই ভাই অন্যের জমিতে কৃষিকাজ করে সংসার চালান। সেই সংসারে বনলতার চিকিৎসা ব্যয় মেটানো দুঃসাধ্য ব্যাপার।
পরিবার জানায়, জন্মের পর থেকে স্বাভাবিক ছিলেন বনলতা। বেড়ে ওঠার সময় তার আচরণ কখনও অস্বাভাবিক ছিল না। পড়াশোনায় ছিলেন মনোযোগী। ছিলেন বিদ্যালয়ের নিয়মিত ছাত্রী। প্রাথমিক শেষে ভর্তি করানো হয় মাধ্যমিকে। অস্টম শ্রেণিতে থেমে যায় তার এই পথচলা। অসুস্থ হয়ে পড়েন বনলতা।
বাবা জীবিত থাকা অবস্থায় বনলতার চিকিৎসা হয়েছিল। কয়েক মাস ভালো ছিলেন। দেড় যুগ ধরে তাকে শিকলে বেঁধে রাখা হয়েছে। পরিবারের সদস্যরা মাঠে কাজ করতে গেলে তাকে পুকুরপাড়ের একটি গাছের সঙ্গে বেঁধে রেখে যান। কখনও সকাল থেকে সন্ধ্যা, কখনও পুরো রাতও কাটে শিকলবন্দি অবস্থায়।
বনলতার বড় ভাই মিন্টু হালদার বলেন, আমার বোনের ১৮ বছর বয়সে মানসিক সমস্যা দেখা দেয়। টাকার অভাবে ঠিকমতো চিকিৎসা করাতে পারিনি। এখন মানুষ দেখলে গালিগালাজ করে। তাই বাধ্য হয়ে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখতে হয়। আমরা খুব গরিব মানুষ। কেউ সহযোগিতা করলে বোনের ভালো চিকিৎসা করাতে পারতাম।
নবগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান দুলাল তালুকদার বলেন, মেয়েটি একসময় স্বাভাবিক ছিল। টাকার অভাবে পরিবার চিকিৎসা করাতে পারেনি। তাকে প্রতিবন্ধী ভাতার আওতায় আনা হয়েছে। আর্থিক সহায়তা পেলে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা সম্ভব।
এ বিষয়ে ডাসার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জাকিয়া সুলতানা বলেন, বনলতার ব্যাপারে আমাদের জানা আছে। সমাজসেবা অফিস থেকে তার প্রতিবন্ধী কার্ড করা হয়েছে। পরিবারের সম্মতি পেলে সরকারিভাবে মানসিক হাসপাতালে ভর্তির বিষয়ে উপজেলা প্রশাসন সহযোগিতা করবে।