দেশে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমল থেকেই দ্রব্যমূল্যের যাঁতাকলে পিষ্ট সাধারণ মানুষ। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কিছু পণ্যের দাম নাগালের মধ্যে এলেও বেশির ভাগ পণ্যের দামই ছিল বেশি। এর মধ্যে দায়িত্ব নিয়েছে বিএনপি সরকার। আর নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর ইরান যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি সরবরাহে বড় ঘাটতি দেখা দেয়। এ অবস্থায় সবধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় সরকার, যার প্রভাব পড়ে দ্রব্যমূল্যেও। এ অবস্থায় পণ্যের উর্ধ্বমুখিতা বহাল রয়েছে বাজারে। বেড়েছে মূল্যস্ফীতি। দ্রব্যমূল্যের চাপে জনগণের হিমশিম অবস্থার মধ্যেও সরকারের আসন্ন বাজেটে চাল-ডালসহ সবধরনের নিত্যপণ্যে বাড়তি করের বোঝা চাপানোর পরিকল্পনা করছে। এতে জীবনযাত্রার ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। বাড়তি ব্যয় মেটাতে গিয়ে বিপর্যন্ত হয়ে পড়বে সাধারণ মানুষ, যা ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ এর সামিল হবে।
আগামী ১১ জুন নতুন বাজেট পেশ করতে যাচ্ছে সরকার। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এই বাজেটের আকার ধরা হচ্ছে ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা বেশি। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটের আকার ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। জানা গেছে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এরই মধ্যে বাজেট প্রণয়ণের কাজ শেষ করে এনেছে। এখন চলছে কাটাছেঁড়া। আগামী বাজেটে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছয় লাখ চার হাজার কোটি টাকা ধরা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
জানা যায়, আসন্ন বাজেটে সরকারের অন্যতম লক্ষ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। যদিও এনবিআর জনগণের ওপর বাড়তি করের বোঝা চাপিয়ে দিতে যাচ্ছে। নতুন বাজেটে অন্যান্য পণ্যের পাশাপাশি নিত্যপণ্যেও বাড়তি কর আরোপের প্রস্তাব রাখা হচ্ছে, যা দ্বিগুণ করা হচ্ছে। ধান, ধানের কুড়া, চাল, গম, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, মটরশুঁটি, ছোলা, মসুর ডাল, আদা, হলুদ, শুকনা মরিচ, ডাল, ভুট্টা, আটা, মোটা আটা, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেল, কালো গোলমরিচ, দারুচিনি, বাদাম, লবঙ্গ, খেজুর, ক্যাসিয়া পাতা, কম্পিউটার ও কম্পিউটারের যন্ত্রাংশ এবং সব ধরনের ফল ক্রয়ের জন্য স্থানীয় ঋণপত্রের কমিশনের ওপর উৎসে কর ০.৫০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১ শতাংশ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল ব্যবহার করে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। বর্তমানে এসব বাহনের জন্য কোনো আয়কর দিতে হয় না। আগামী বাজেটে এসব যানবাহন থেকেও কর আদায়ের প্রস্তাব আসছে।
জানা গেছে, ১১০ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেল করমুক্ত। ১১১ থেকে ১২৫ সিসি হলে অগ্রিম আয়কর দুই হাজার টাকা। ১২৬ থেকে ১৬৫ সিসি পর্যন্ত পাঁচ হাজার টাকা। ১৬৫ সিসির বেশি হলে প্রতিবছর ১০ হাজার টাকা আদায়ের ছক করা হয়েছে।
এ ছাড়া ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকেও করের আওতায় আনা হচ্ছে। এর মধ্যে সিটি করপোরেশন এলাকার মধ্যে পাঁচ হাজার, পৌরসভায় দুই হাজার ও ইউনিয়নের ক্ষেত্রে প্রতিবছর এক হাজার টাকা কর দিতে হবে।
বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান ও সংস্থাটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। দিনভর অনুষ্ঠিত বৈঠকে বাজেট নিয়ে নানা দিকনির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বেশ কিছু বিষয় আবারও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে নির্দেশনা দেন বলে বৈঠক সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
জানা গেছে. বাজেট প্রস্তাবে বৈদ্যুতিক গাড়ি আমদানি ও উৎপাদনের ক্ষেত্রে কিছুটা সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। মোবাইল ফোন, এয়ার কন্ডিশনার, ফ্রিজ, এলইডি/এনার্জি সেভিং লাইট সিসি ক্যামেরা, ব্যাংকের বুথের জন্য এটিএম মেশিন— এসব পণ্য উৎপাদনের উপকরণ আমদানিতে শুল্ক-কর আগের তুলনায় অনেক বেড়ে যাবে। এনবিআর আসন্ন বাজেটে এসব পণ্য উৎপাদনের কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে রেয়াতি সুবিধা তুলে দিতে চায়। ফলে ঘরে ব্যবহারের উপকরণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিতেও গুনতে হবে বাড়তি টাকা।
বাজেটে বৈধ পথে স্বর্ণ আমদানিতে প্রতি ভরিতে পাঁচ হাজার টাকা ভ্যাট নির্ধারণের সুপারিশ করবে এনবিআর, বর্তমানে যা ৫ শতাংশ নির্ধারিত রয়েছে।
বিগত অন্তর্বর্তী সরকার ব্যক্তি শ্রেণির করমুক্ত সীমা তিন লাখ ৭৫ হাজার টাকা করেছিল। তবে স্ল্যাবে পরিবর্তন আনায় একজন ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাকে বার্ষিক আয় সাত লাখ ২০ হাজার টাকা হলে কর দিতে হতো আট হাজার টাকা। আসছে করবর্ষে এই করের পরিমাণ হবে ১০ হাজার ৫০০ টাকা। স্ল্যাব পরিবর্তন ও করহার বাড়ানোর ফলে করের জালে পিষ্ট হবে মধ্যবিত্ত শ্রেণি।
এদিকে বর্তমানে একজন করদাতার নিট পরিসম্পদের মূল্যমান চার কোটি টাকা অতিক্রম করলে ১০ শতাংশ এবং ৫০ কোটি টাকা অতিক্রম করলে সারচার্জের পরিমাণ ৩৫ শতাংশ নির্ধারিত রয়েছে। এ ছাড়া একাধিক গাড়ি থাকলে সিসিভেদে ২৫ হাজার থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা পরিবেশ সারচার্জ নেয়া হয়। নতুন বাজেটে বাজারমূল্যের ওপর ভিত্তি করে চার কোটির বেশি, তবে ১০ কোটির কম সম্পদ থাকলে তাকে সম্পদমূল্যের ০.৫০ শতাংশ ‘সম্পদ কর’ দিতে হবে। ১০ কোটির বেশি ২০ কোটি কম হলে ১ শতাংশ, ২০ কোটির বেশি অথচ ৫০ কোটির কম হলে ১.৫০ শতাংশ ও ৫০ কোটির বেশি হলে ২ শতাংশ ‘সম্পদ কর’ নির্ধারণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তবে এই সম্পদ কর কোনোভাবেই করদাতার প্রদেয় করের চেয়ে বেশি হবে না।
তৈরি পোশাক, চামড়া, পাট, কৃষিপণ্য ও তথ্য-প্রযুক্তি খাতে প্রণোদনার বিপরীতে ১০ শতাংশ উৎসের করের বদলে আগামী বাজেটে ২০ শতাংশ করার পট্রস্তাব রাখা হচ্ছে।
এদিকে বাজেটে সাধারণ মানুষের ঘাড়ে বাড়তি করের বোঝা না চাপিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবসা-বাণিজ্য সহায়ক বাজেট করতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। গতকাল বৈঠকে এই পরামর্শ দেন তিনি।
জানা গেছে, এবারের বাজেটে মূল্যস্ফীতি কমানোই সরকারের লক্ষ্য। তবে নিত্যপণ্যের স্থানীয় ঋণপত্রের কমিশনের উৎসে কর ০.৫০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১ শতাংশ করা হলে মূল্যস্ফীতি আরও বেড়ে যেতে পারে—এমন আশঙ্কায় বিষয়টি নিয়ে আরও পর্যালোচনার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী আগামী বাজেটে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলে প্রথমবারের মতো অগ্রিম আয়কর বসানোর প্রস্তাবে সায় দিয়েছেন। তবে আগের প্রস্তাবিত হারের তুলনায় তা কমানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার করহারও কমিয়ে আনতে বলেছেন বলে সূত্র জানিয়েছে।
জানা গেছে, মোবাইল ফোন, এয়ারকন্ডিশনার, ফ্রিজ, এলইডি/এনার্জি সেভিং লাইট, ঘর বা অফিসের নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য সিসি ক্যামেরা, ব্যাংকের বুথের জন্য এটিএম মেশিনের উপকরণ আমদানিতে শুল্ক-কর আগের তুলনায় বাড়ানোর প্রস্তাব আরও পর্যালোচনা করে দেখার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণের ভরিপ্রতি ভ্যাটের হারও আরও কমানোর পরামর্শ দিয়েছেন। এদিকে তিনি সিগারেটের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবে সায় দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, গত এপ্রিল মাসে দেশে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯.০৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, এর আগে মার্চ মাসে যা ছিল ৮.৭১ শতাংশ।
একদিকে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যদ্ধের প্রভাবে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও কঠিন অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে পড়েছে, তার ওপর নিত্যপণ্যের বাড়তি দামে সাধারণ মানুষের হিমশিম খাওয়া অবস্থার মধ্যেই চাল-ডালসহ নিত্যপণ্যের ওপর বসানো হচ্ছে বাড়তি কর। অথচ মানুষের আয় বাড়ছে না। এ অবস্থায় নতুন বাজেটে সবধরনের নিত্যপণ্যে বাড়তি কর আরোপ করা হলে জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে রীতিমতো কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যেতে হবে সাধারণ মানুষকে।
শীর্ষনিউজ