রাজধানীর ফুটপাত দখল, হকার নিয়ন্ত্রণ ও চাঁদাবাজি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সম্প্রতি বিভিন্ন এলাকায় নির্ধারিত ফি’র মাধ্যমে হকার বসানোর উদ্যোগ সামনে আসার পর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন হকার, পথচারী ও নগরবাসীর অনেকে।
হকারদের অভিযোগ, আগে ফুটপাতে বসতে স্থানীয় প্রভাবশালী বা চাঁদাবাজদের টাকা দিতে হতো, এখন সরকারি ফি চালু হলেও সেই চাঁদা বন্ধ হয়নি। ফলে ‘দুই দিকেই টাকা’ দিতে হচ্ছে।
নগরবাসীরা মনে করেন, সিটি করপোরেশনের এমন উদ্যোগ নগরীতে আবারও বিশৃঙ্খলা ও যানজট বাড়াতে পারে। তাদের মতে, হকারদের সড়ক বা ফুটপাতে নয়, বরং নির্দিষ্ট খোলা জায়গায় পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা উচিত।
হাঁটার জন্য তৈরি ফুটপাত এখন অনেক এলাকায় কার্যত হকার মার্কেটে পরিণত হয়েছে (ছবি: নাসিরুল ইসলাম)
পথচারীদের অভিযোগ, হাঁটার জন্য তৈরি ফুটপাত এখন অনেক এলাকায় কার্যত হকার মার্কেটে পরিণত হয়েছে। এতে স্বাভাবিকভাবে চলাচল ব্যাহত হচ্ছে এবং বাধ্য হয়ে অনেককে মূল সড়কে নামতে হচ্ছে। ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে।
অপরদিকে, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার হকাররা বলছেন, প্রতিদিন বা সাপ্তাহিক ভিত্তিতে তাদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়। এখন যদি নতুন করে নির্ধারিত ফিও দিতে হয়, তাহলে ছোট ব্যবসায়ীদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হবে। অনেকের প্রশ্ন—ফুটপাত আসলে কার নিয়ন্ত্রণে, সরকার নাকি চাঁদাবাজদের?
নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, হকারদের পুরোপুরি উচ্ছেদ নয়, বরং সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার মধ্যে আনতে হবে। তবে সেই ব্যবস্থাপনা যেন নতুন করে চাঁদাবাজির সুযোগ তৈরি না করে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে পথচারীদের জন্য ফুটপাত উন্মুক্ত রাখা এবং বিকল্প হকার জোন তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করেন তারা।
হাঁটার জন্য তৈরি ফুটপাত এখন অনেক এলাকায় কার্যত হকার মার্কেটে পরিণত হয়েছে (ছবি: নাসিরুল ইসলাম)
চাঁদাবাজি ও রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ
রাজধানীর যেসব এলাকায় উচ্ছেদ করা হকারদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেখানে সাদা দাগ কেটে নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণ করে দিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশন। এসব স্থানে ‘হকার কার্ড’-এর মাধ্যমে বসার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। তবে এই কার্ড পেতেও নানা ধরনের হয়রানির অভিযোগ তুলেছেন হকাররা।
‘হকার কার্ড’ প্রত্যাশী রিফাত হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত ফি নামমাত্র। কিন্তু রাজনৈতিক বড় ভাইদের রেফারেন্স ছাড়া কার্ড মিলছে না। আগেই বলা হয়েছে টাকা ছাড়া হবে না। ব্যবসা করে খেতে হয়, তাই টাকা দিয়েছি।”
হাঁটার জন্য তৈরি ফুটপাত এখন অনেক এলাকায় কার্যত হকার মার্কেটে পরিণত হয়েছে (ছবি: নাসিরুল ইসলাম)
আরেক হকার সাব্বির আহমেদ বলেন, “হকার কার্ড টাকা নেওয়ার বৈধ সিস্টেম হয়ে গেছে। কার্ড থাকলেও টাকা দিতে হয়, না থাকলেও দিতে হয়। গুলিস্তানেই হাজার হাজার হকার বসে, অথচ কার্ড দেওয়া হয়েছে খুব সীমিত সংখ্যক।”
গুলিস্তানে প্রায় দুই যুগ ধরে ব্যবসা করা সাত্তার মিয়া বলেন, “বিএনপি, স্বেচ্ছাসেবক দল বা শ্রমিক দলের নেতাদের সুপারিশ ছাড়া হকার কার্ড মিলছে না। কার্ড পেতে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। পাশাপাশি দৈনিক চাঁদার প্রতিশ্রুতিও দিতে হচ্ছে।”
ফুটপাতে হকার বসানোর বিরোধিতা
রাজধানীর অনেক বাসিন্দা মনে করছেন, সাম্প্রতিক উচ্ছেদ অভিযান ছিল ফুটপাতের নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তনের অংশমাত্র। তাদের অভিযোগ, আগে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ফুটপাত এখন বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের প্রভাবের মধ্যে চলে গেছে।
হাঁটার জন্য তৈরি ফুটপাত এখন অনেক এলাকায় কার্যত হকার মার্কেটে পরিণত হয়েছে (ছবি: নাসিরুল ইসলাম)
বংশাল এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ নাসিম মিয়া বলেন, “উচ্ছেদের পর কিছু দিন অন্তত স্বস্তিতে হাঁটতে পেরেছিলাম। এখন আবার যদি ফুটপাতে হকার বসানো হয়, তাহলে সেই ভোগান্তি ফিরে আসবে।”
ধানমন্ডির বাসিন্দা রিক্তা বেগম বলেন, “সরকার চাইলে পুরো শহরকে সুশৃঙ্খল রাখতে পারে, আমরা সেটার নমুনা দেখেছি। কিন্তু এখন আবার ফুটপাত দখলের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।”
স্থায়ীভাবে ফুটপাতে হকার বসানোর সিদ্ধান্ত হলে আন্দোলনে নামবেন বলেও জানিয়েছেন অনেক নগরবাসী।
‘পুনর্বাসন হোক, কিন্তু পরিকল্পনা নিয়ে’
নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, হকার পুনর্বাসনের ফলে নগরবাসী ও পথচারীদের যেন ভোগান্তি না হয়, সেদিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও নগর পরিকল্পনাবিদ শেখ মুহাম্মদ মেহেদী আহসান বলেন, “সঠিক পুনর্বাসন পরিকল্পনা ছাড়া উচ্ছেদ কার্যকর হয় না। হকারদের জীবিকা এবং নিম্নবিত্তের অধিকারের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে নীতিমালা করতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “হুট করে ফুটপাতে বসার অনুমতি দেওয়া অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত হতে পারে। সিটি করপোরেশনকে আগে নগরবাসীর সুবিধার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।”
হাঁটার জন্য তৈরি ফুটপাত এখন অনেক এলাকায় কার্যত হকার মার্কেটে পরিণত হয়েছে (ছবি: নাসিরুল ইসলাম)
সিটি করপোরেশনের বক্তব্য
হকারদের পুনর্বাসনে আপাতত ফুটপাত ও কিছু খালি জায়গা ব্যবহার করা হলেও ভবিষ্যতে বৃহত্তর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে দুই সিটি করপোরেশন। একই সঙ্গে পথচারীদের ভোগান্তি কমাতে পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও বলছে তারা।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম জানান, পথচারীদের চলাচলের জন্য ন্যূনতম ৫ থেকে ৬ ফুট জায়গা ফাঁকা রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এসব জায়গায় যেন কোনও স্থাপনা না গড়ে ওঠে, সেদিকেও নজরদারি করা হবে।
হকার পুনর্বাসন প্রসঙ্গে ডিএসসিসি প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম বলেন, “প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় হকার ব্যবস্থাপনা শুরু করেছি। এতে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরবে, প্রান্তিক মানুষের জীবনমান উন্নয়ন হবে এবং চাঁদাবাজিমুক্ত পরিবেশ তৈরি হবে। তবে নগরবাসীর ভোগান্তি যেন না হয়, সেটাই আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার।”
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, “আমরা হকারদের একটি সিস্টেমের মধ্যে আনতে চাই। ইতোমধ্যে ২০২ জন হকারকে পরিচয়পত্র দিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ধীরে ধীরে সবাইকে একটি নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে।”